প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার: উপমহাদেশের বিপ্লব ও মুক্তির অগ্নিকন্যা
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৫ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:৩৫
বাঙালি নারীকে তিনি শিখিয়েছিলেন নারীরাও দেশের জন্য লড়াই করতে পারে, শিখিয়েছেন বিপ্লবের জন্য স্বাধীনতার জন্য কী করে হার না মেনে চালিয়ে যেতে হয় এক জীবন। এক জন্মের কর্মে কেমন করে থেকে যেতে হয় মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়। নারীকে তিনি চিনিয়েছেন দেশের জন্য, বিপ্লবের জন্য একটি জীবনকে কতোখানি মহিমান্বিত করা যায়। কী করে গর্জে ওঠা যায় শোষকের বিরুদ্ধে। তাই তো তিনি অগ্নিকন্যা। বিপ্লব ও মুক্তির অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল ইসলাম অনিক।
মাষ্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী দলেরই অন্যতমা ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। মাষ্টারদা ধলঘাটে আত্মগোপন করলে প্রীতিলতা তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ভার পান। মাষ্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতার নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র তরুণ ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে। আক্রমণের পরে প্রত্যেকটি সহকর্মীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে পুলিশের অবরোধে সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন প্রীতিলতা।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কে ছিলেন?
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার যিনি প্রীতিলতা ওয়াদ্দের নামেও পরিচিত। তার ডাকনাম রাণী, ছদ্মনাম ফুলতারা। তিনি একজন বাঙালি ছিলেন, যিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী শহীদ ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন পূর্ববঙ্গে জন্ম নেয়া এই বাঙালি বিপ্লবী সূর্য সেনের নেতৃত্বে তখনকার ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং জীবন বিসর্জন করেন।
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব দখলের সময় তিনি ১৫ জনের একটি বিপ্লবী দল পরিচালনা করেন। এই ক্লাবটিতে একটি সাইনবোর্ড লাগানো ছিলো যাতে লেখা ছিলো “কুকুর এবং ইন্ডিয়ানদের প্রবেশ নিষেধ”। প্রীতিলতার দলটি ক্লাবটি আক্রমণ করে এবং পরবর্তীতে পুলিশ তাদেরকে আটক করে। পুলিশের হাতে আটক এড়াতে প্রীতিলতা সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
উপমহাদেশের প্রথম বিপ্লবী মহিলা শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তার জন্ম চট্টগ্রামে ১৯১১ খ্রিঃ ৫ই মে। পিতার নাম জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার। প্রীতিলতার ছাত্রজীবন কাটে প্রথমে ঢাকায় ও পরে কলকাতায়। ঢাকায় থাকার সময়েই সেখানকার বিপ্লবী সংগঠন দীপালী সংঘ সংস্পর্শে আসেন। কলকাতায়ও ছাত্রীসংঘের উৎসাহী কর্মী ছিলেন।
আই.এ. পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডে মহিলাদের মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. পরীক্ষায় ডিস্টিংসন সহ পাস করেন। এরপর চট্টগ্রামে ফিরে এসে নন্দনকানন স্কুলে প্রধান শিক্ষিকার পদে যোগ দেন। ইতিপূর্বে বহরমপুর কলেজ থেকে বি.এ. পাস করার পর মাষ্টারদা সূর্যসেন চট্টগ্রামে এসে উমাতারা উচ্চ ইংরাজি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন।
কর্মজীবন ও বিপ্লবী জীবন
চট্টগ্রামে একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই মাষ্টারদা শিক্ষকতার বৃত্তি নিয়েছিলেন। এই সময়ে তিনি সমাজ সেবার কাজের সঙ্গে সঙ্গে তার ছাত্রদের স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। বিপ্লবীদের সফল তৎপরতায় চট্টগ্রাম সারা উপমহাদেশের বিপ্লবতীর্থ বলে পরিচিত হয়। সর্বাধিনায়ক মাষ্টারদার নেতৃত্বে ৬৫ জন অসমসাহসী যুবক ২ টি অস্ত্রাগার ও পুলিস লাইন এবং ডাক ও তার অফিস একযোগে আক্রমণ করে দখল করেন। চট্টগ্রামে মাষ্টারদার দলই উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে ইউনিফর্ম পরে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। মাষ্টারদার বিপ্লবী দলেরই অন্যতমা ছিলেন প্রীতিলতা।
অস্ত্রাগার দখলের পূর্বে মাষ্টারদার নির্দেশে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাকে পালন করতে হয়। অস্ত্রাগার দখলের পরে মাষ্টারদা তার ৬০ জন অনুগামী যোদ্ধাকে নিয়ে শহর ছেড়ে পাহাড় অঞ্চলে চলে যান। আক্রমণে ব্যর্থ হয়ে মাষ্টারদা আত্মগোপন করেন। অস্ত্রাগার আক্রমণে অংশ গ্রহণের পর প্রীতিলতা প্রত্যক্ষ বৈপ্লবিক কাজের ভার পান। মাষ্টারদা ধলঘাটে আত্মগোপন করলে প্রীতিলতা তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ভার পান।
১৯৩২ খ্রিঃ জুন মাসে ধলঘাটে বিপ্লবী দলের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে সরকার পক্ষের ক্যাপ্টেন ক্যামেরুন এবং বিপ্লবীদলের নির্মল সেন ও অপূর্ব সেনের মৃত্যু হয়। মাষ্টারদা ও প্রীতিলতা পালিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করে গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন। এরপরই সরকার থেকে প্রীতিলতাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। বিপ্লবীদলের লক্ষ্য ছিল পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ। কিন্তু প্রস্তুতি শুরু করেও এই কাজ সম্পূর্ণ করা যায় নি।
মাষ্টারদা এই আরব্ধ কাজ সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব দেন প্রীতিলতাকে। চট্টগ্রামের সাহেব মেমদের ক্লাব সম্পর্কে প্রীতিলতাই প্রথম মাষ্টারদার কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। দেশের মানুষদের সঙ্গে সাহেবরা যে দুর্ব্যবহার করে, তার উপযুক্ত জবাব দেবার জন্য তিনি উন্মুখ হয়েছিলেন। মাষ্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতার নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র তরুণ ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
দিন স্থির হয় ১৯৩২ খ্রিঃ ২৪ শে সেপ্টেম্বর শনিবার। তীব্র আক্রোশে দাঁতে দাঁত পেষেণ প্রীতিলতা। অপেক্ষা করে থাকেন উপযুক্ত সময়ের। নানা দিকে ছড়িয়ে আছেন অপর সহযোদ্ধারা। নেত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় তারাও প্রহর গুণছেন। সহসা গর্জন করে উঠল প্রীতিলতার হাতের অস্ত্র ক্লাবের ভেতরে লুটিয়ে পড়ল একজন। সঙ্কেত পেয়ে অন্যান্য বিপ্লবীরাও ক্লাব ঘিরে গুলিবর্ষণ আরম্ভ করলেন। মুহূর্তে চতুর্দিক লন্ডভন্ড। প্রীতিলতার নির্দেশে তার সহযোদ্ধারা এবারে স্থানত্যাগ করলেন।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার-এর মৃত্যু
নিজের জায়গায় স্থির থেকে প্রত্যেকটি সহকর্মীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিলেন প্রীতিলতা। তার তো আগে গেলে চলে না, তিনি যে নেত্রী। প্রীতিলতা স্থানত্যাগ করবার আগেই ইতিমধ্যে খবর পেয়ে পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলেছে ক্লাব চত্বর। নির্ভীক প্রীতিলতা কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। দেখতে পেলেন তাকে দেখে পুলিশ ছুটে আসছে। কিন্তু তার জীবিত দেহ স্পর্শ করার সুযোগও তারা পেল না। মৃত্যুকে তো নিজের সঙ্গেই বেঁধে রেখেছিলেন প্রীতিলতা। সাক্ষাৎ মৃত্যু পটাসিয়াম সায়ানাইড সঙ্গেই রেখেছিলেন। পুলিশ নিকটে এগিয়ে আসার আগেই প্রীতিলতা কালান্তক বিষ সায়ানাইড পুরে দিলেন মুখে। প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ব্রিটিশ শাসকের পুলিশবাহিনী প্রীতিলতার প্রাণহীন দেহটাই নিয়ে গেল।
ইউডি/অনিক

