সহজে ড্রাগ লাইসেন্স প্রাপ্তি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের নতুন সূচনা
মোহাইমিন হাওলাদার । সোমবার, ০৬ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:৫৫
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ওষুধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ওষুধের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বেড়েই চলেছে। ওষুধ কিনতে আমরা প্রতিনিয়তই শরণাপন্ন হই কোনো-না-কোনো ওষুধের দোকানের। জীবন রক্ষাকারী এই ওষুধ অবশ্যই হতে হবে নকল ও ভেজালমুক্ত। অন্যথায় এই ওষুধই হতে পারে অনেক বড় ক্ষতির কারণ। আমাদের দেশে অনেক মানুষ ওষুধ ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বৈধভাবে ওষুধের ব্যবসা করতে হলে অবশ্যই ড্রাগ লাইসেন্স থাকতে হবে। ড্রাগ লাইসেন্সের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। দ্য বেঙ্গল ড্রাগ রুলস, ১৯৪৬ অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি, মজুত, বিক্রির জন্য প্রদর্শন ও বিতরণে ড্রাগ লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য একটি নির্ধারিত ছকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করতে হয়। এই আবেদন ফরম ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কার্যালয় অথবা ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা যায়।
কাগজপত্রের সঠিকতা যাচাই সাপেক্ষে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ এবং দোকান সরেজমিনে পরিদর্শন করে পরিদর্শন প্রতিবেদনসহ ঔষধ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আবেদনপত্রটি সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে গঠিত জেলা ড্রাগ লাইসেন্সিং কমিটিতে উপস্থাপন করেন এবং উক্ত কমিটির সুপারিশপ্রাপ্তি সাপেক্ষে মহাপরিচালক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর আবেদনপত্রটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। মহাপরিচালক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদনের পর মহাপরিচালকের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু করেন । উক্ত প্রক্রিয়া সম্পাদন করতে আবেদনকারী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উভয়ের জন্য ঝামেলাপূর্ণ ও সময় সাপেক্ষ। বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশ (বিএইচবি) ব্রিটিশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্প, যা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে বাংলাদেশের ওষুধের দোকানের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ওষুধ ব্যবসায়ীরা মানুষকে নিরলসভাবে ওষুধসেবা দিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ করলে দেখা যায় যে, আমাদের আশপাশেই কিছুসংখ্যক ওষুধের দোকান রয়েছে, যাদের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিবন্ধন নেই। আইনত এই দোকানগুলো অবৈধ। এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সর্বদা তৎপর এবং বিভিন্ন সময়ে এইসব অবৈধ দোকানে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা, দোকান সিলগালা করা, আদালতে মামলা করা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সোপর্দ করার মতো বিভিন্ন আইনগত ব্যবস্থা ঔষধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে।
বিএইচবি প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিবৃন্দ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে অটোমেটেড ড্রাগ লাইসেন্সিং অ্যান্ড রিনিউয়াল সিস্টেম তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে গুলশান ও মিরপুর থানায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় এবং পরীক্ষার ভিত্তিতে যেসব সুপারিশ পাওয়া যায়, সে বিষয়সমূহ আমলে নিয়ে সফটওয়্যারটিতে প্রয়োজনীয় আপডেট করা হয়। এর পরই এই সফটওয়্যার চূড়ান্ত করা হয়। গত ১৮ নভেম্বর ২০২১ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি মহোদয় এই সফটওয়্যারের শুভ উদ্বোধন করেন এবং উক্ত উদ্বোধনীতে অউখজঝ-এর মাধ্যমে দুই জন নতুন আবেদনকারী ও দুই জন নবায়নের জন্য আবেদনকারীকে সিস্টেম থেকে তৈরিকৃত ড্রাগ লাইসেন্স হস্তান্তর করেন।
এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ড্রাগ লাইসেন্সের আবেদন করার জন্য প্রথমেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্ত্ততের পর স্ক্যান করে কম্পিউটারে সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে ঙঞচ পাওয়ার পর প্রোফাইল ভেরিফিকেশন করতে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে এবং স্ক্যানকৃত কাগজপত্র আপলোড করে আবেদন সাবমিট করতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রদত্ত তথ্য ও আপলোডকৃত কাগজপত্র যাচাইবাছাই করেন। এরপর দোকান পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সিস্টেমে একটি প্রতিবেদন আপলোড করেন। আবেদনপত্রটি আপলোডকৃত কাগজপত্র ও পরিদর্শন প্রতিবেদনসহ জেলা ড্রাগ লাইসেন্সিং কমিটিতে পাঠানো হয়। উক্ত কমিটির সুপারিশপত্রটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সিস্টেমে আপলোড করলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহোদয় আবেদনপত্রটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রত্যেক আবেদনকারী তার নিজস্ব ড্রাশবোর্ডে প্রবেশ করে তার আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারেন এবং প্রতিটি ধাপে মোবাইলে বার্তা পেয়ে থাকেন।
ড্রাগ লাইসেন্স পেলে প্রতি দুই বছর পরপর এটি নবায়ন করা যেমন জরুরি, দোকানে একজন ফার্মাসিস্ট/ ফার্মেসি টেকনিশিয়ানের উপস্থিতির মাধ্যমে ওষুধসেবা নিশ্চিত করাও তেমনি জরুরি। এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এ (অ), (ই) ও সি (ঈ) এই তিন ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট-ফার্মেসি টেকনিশিয়ান বিদ্যমান। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ফার্মাসিস্টের নিবন্ধন দিয়ে একাধিক ড্রাগ লাইসেন্সের আবেদন করা হতো, যা অনেক সময় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্তৃক শনাক্ত করা সম্ভব হতো না। একজন ফার্মাসিস্টের নিবন্ধন নম্বর শুধু একটি ড্রাগ লাইসেন্সের আবেদনেই ব্যবহার করা যাবে। অতএব প্রতিটি ওষুধের দোকানেই ফার্মাসিস্টের মাধ্যমে ওষুধসেবা প্রদান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সর্বোপরি ওষুধের দোকান থেকে একটি গুণগত ওষুধসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা আশা করি, অনলাইনে ড্রাগ লাইসেন্স সেবাপ্রাপ্তির যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল পূর্বতন মহাপরিচালক মহোদয়ের নেতৃত্বে, তা বর্তমান মহাপরিচালক মহোদয়ের নেতৃত্বে আরো গতিশীল হবে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন পূরণে ভূমিকা রাখবে।
ইউডি/সুস্মিত

