স্বাস্থ্যসেবা খাতের সঙ্কট নিরসনে প্রয়োজন জনবল

স্বাস্থ্যসেবা খাতের সঙ্কট নিরসনে প্রয়োজন জনবল

জাকারিয়া সেলিম । মঙ্গলবার, ০৭ জুন ২০২২ । আপডেট ০৯:২০

দেশের স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা জনবল সংকট। হাসপাতালগুলোতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, ভবন, আইসিইউ, সিসিইউ- সবই আছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একের পর এক নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান হচ্ছে। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত জনবল। এদেশে কর্মরত নার্স রয়েছেন ৩৬ হাজার। ২৮ হাজার ক্যাডারভুক্তসহ মোট ডাক্তার আছেন ৩৩ হাজার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, এক জন ডাক্তারের বিপরীতে তিন জন নার্স থাকতে হয়। সে হিসাবে সরকারি পর্যায়ে এক লাখ নার্স প্রয়োজন। বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে আরো অনেক নার্স প্রয়োজন। কিন্তু ডাক্তার-নার্সের অভাবে রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশে চিকিৎসক-নার্সদের সেবার মান অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে খারাপ নয়, এ কথা স্বীকার করতেই হয়। চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না। কোনো কোনো বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও রয়েছে। দেশ-বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রিধারী কয়েক হাজার নার্সও রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী পদ না থাকায় তাদের পদোন্নতি দেওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মানের বেশ কিছু চিকিৎসকও রয়েছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাদের সুনাম রয়েছে। তাদের মান নিয়েও কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। অনেক কঠিন ও জটিল রোগের চিকিৎসা ও অপারেশন এখানে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এমন নজিরও রয়েছে। দেশে তীব্র নার্স সংকট বিরাজ করছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দুই লাখ নার্স প্রয়োজন। প্রতি বছর মেডিক্যাল কলেজ থেকে যেসব ডাক্তার পাশ করে বের হচ্ছেন তাদের সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগ দেওয়া উচিত। উপজেলা পর্যায়ে অপারেশন থিয়েটার থাকলেও বেশির ভাগ হাসপাতালেই অপারেশন হয় না। কারণ সার্জন আছে, অজ্ঞানকারী চিকিৎসক নাই। বিএমএ’র হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে অজ্ঞানকারী চিকিৎসক আছে মাত্র দুই হাজার।

ঐতিহাসিকভাবে পৃথিবীজুড়ে সরকারি চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিসে যুক্ত। এই দ্বৈত প্র্যাকটিসের বাস্তবতার মধ্যে একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্রের ডাক্তার হয়ে ওঠা। স্বাস্থ্য খাতে নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাব দূর করতে দ্বৈত প্র্যাকটিসের অবসান ঘটানোর সময় এসেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে একটি শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সক্ষম কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করতে হবে। সকল জরুরি সেবা ও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সেবার ২৪ ঘণ্টা প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও বরাদ্দ বাড়াতে হবে। যেসব অত্যাবশ্যকীয় বিষয়ে জোর দিলে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা উপজেলা স্তরে থাকে তার সবই গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে দিয়ে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির অগ্রযাত্রায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে। স্বাস্থ্যেসেবায় শৃঙ্খলা ফিরে একটা রেফারেল সিস্টেম গড়ে উঠবে। সরকার ৮টি বিভাগের ৮টি উপজেলাকে প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলট প্রকল্পের মধ্যে এনে নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে শিক্ষা নিতে পারে। দুর্বলতা ও সবলতার জায়গা চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ে এগিয়ে যেতে পারে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সক্ষমতা ও মান তৈরিতে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে নগরে সম্প্রসারণ করতে হবে।

এর ফলে রোগীর চাপ কমে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ও শিক্ষার মান বাড়াতে সুযোগ পাবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোয় পরিবর্তন ও কারিক্যুলামকে সময়োপযোগী করে দক্ষ জনবল তৈরির বিশ্বমানে উন্নীত করতে হবে। এটা লজ্জার, বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা ভারতীয় নাগরিকদের ৮৩-৮৭ শতাংশই মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার রেজিস্ট্রেশন পরীক্ষায় ফেল করেছে। উচ্চ মেধাবী ও নিবেদিতরা যাতে জ্যেষ্ঠতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে রাজনীতি ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও সঠিক পদে পদোন্নতি পায় তার প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মেডিক্যাল শিক্ষাকে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে বের করে এনে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালনা করা যেতে পারে। একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত কার্যক্রম নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবল তৈরি ও জনবল সংকট সমস্যার সহনীয় সমধান আনতে পারবে। জেলা সরকারি হাসপাতালের জনবল ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন মেটানোর উপযোগী করে গড়তে হবে। চিকিৎসাসেবার প্রতিদিনের কাজের মধ্যে একটি শক্তিশালী প্রশিক্ষণ পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে।

করোনাকালে শত চিকিৎসক জীবন দেওয়ার পরও কি জনগণ চিকিৎসকদের এত কষ্টের কিছু অংশ অনুধাবন করতে পেরেছে? জনগণ সেই অবস্থায় নেই। করোনাকালে অবর্ণনীয় দুর্দশা, অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় ও চিকিৎসা পেতে অসহায়ত্ব জনসাধারণকে চিকিৎসকদের প্রতি আরও ক্ষুব্ধ ও বীতশ্রদ্ধ করে তুলছে। জনগণের এই অসন্তোষকে পুঁজি করে সমস্যার মূল কারণ থেকে দৃষ্টি সরাতে সরকার, মিডিয়া, হাসপাতাল মালিক, ওষুধ কোম্পানি, ল্যাব মালিক, প্রশাসন-পুলিশ সকলেরই আঙুল ডাক্তারদের দিকে। চিকিৎসকদের সম্মান ও নিরাপত্তা জনগণের জন্যই। জীবন-মৃত্যুর সংকটময় মুহূর্তে একজন ডাক্তারই হলেন স্নেহময়ী মা। সেভ দ্য মাদার ফাস্ট। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন, মোটিভেটেড স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের মূল শক্তি। স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনে প্রয়োজনীয় সমস্ত শর্তের মধ্যে যা পূরণ করা সবচেয়ে কঠিনতম। কঠিন হলেও ১৬ কোটি মানুষের দেশে জনবলের সংকট বা দক্ষ জনশক্তির অভাব একটি কৃত্রিম সংকট। সংকটের প্রকৃত কারণকে অনুধাবন করার মধ্যেই উত্তরণ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading