পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য চরমে
খলিলুর রহমান খান । মঙ্গলবার, ০৭ জুন ২০২২ । আপডেট ০৯:২৫
পাসপোর্ট করতে গেলে ভোগান্তির শেষ নেই। নিজে নিজে পাসপোর্ট করাটা খুবই কষ্টকর। পাসপোর্ট অফিসের আশেপাশে দালালের অভাব নেই। জোঁকের মতো পিছনে লেগেই থাকে। অফিসের কর্মকর্তাদের কী বলব-তারাও নাকি দালালের সঙ্গে জড়িত। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও ভুল আছে বলে অফিস থেকে বের করে দেয় তা ঠিক করে আনার জন্য। সকাল থেকে সিরিয়ালে থেকে শেষ সময়ে যদি বাইরে চলে যেতে হয়, কার না খারাপ লাগে।
যদি ভুলগুলো ঠিক করে আনা হয় তারপরও তারা বলবে, ভুল আছে। আসলে ভুল থাকার মতো কিছুই নেই। হয়তো কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির স্বাক্ষর লাগবে। স্বাক্ষরটি তাদের মনের মতো ব্যক্তির হয়নি। হয়তো বা কোনো একটি ডকুমেন্ট জমা দেওয়া হয়নি, যা পাসপোর্ট করতে তেমন জরুরি নয়। নয়তো কোনো এ-কার, আ-কার, উ-কার বা কোনো অক্ষরে ভুল আছে। এক কথায় বলতে গেলে, তারা ভুল ধরবেই। দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করতেই হবে। ইতোমধ্যে পাসপোর্ট যারা করেছে, তারাই বলতে পারবে পাসপোর্ট অফিসে কতটা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। শুধু পাসপোর্ট করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হওয়া নয়, পাসপোর্ট করার পরও পায়ের জুতা ক্ষয় করতে হয়। কারণ, পাসপোর্টে কোনো একটি ভুল এসেছে; হয়তো কোনো নামের অক্ষর, জন্মতারিখ বা অন্য কিছুতে, যা কর্তৃপক্ষের ‘টাইপিং মিসটেক’। এর দায়ভারও চাপানো হয় পাসপোর্ট প্রত্যাশীর ওপর।
পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্র জানায়, পাসপোর্টের বিভিন্ন বিভাগীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের কিছু কর্মচারীর যোগসাজশে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এরা পাসপোর্ট গ্রহীতাদের ভুল বুঝিয়ে কর্মকর্তাদের কাছেই যেতে দেয় না। পেশাদার কিছু দালাল বিভাগীয় কার্যালয়গুলোতে সক্রিয় থাকলেও বিভিন্ন জেলা কার্যালয় নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় নেতাদের হাতে। বেশির ভাগ জেলায় প্রভাবশালী নেতারা তাদের লোকজন দিয়ে পাসপোর্ট অফিসে অবৈধভাবে টেবিল পেতে ফরম যাচাইয়ের নামে টাকা নিয়ে নেন। এর দায় পড়ে পাসপোর্ট অফিসের ওপর। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের পাসপোর্ট অফিসগুলোতে দালালের দৌরাত্ম্য কমছে না। বিভিন্ন সময় র্যাবের অভিযানে দালালেরা ধরা পড়লেও জামিনে বের হয়ে আগের কাজই করছেন। শুধু তাই নয়, দালাল ছাড়া যদি আবেদন জমা দেয়া হয় তা হলে; সার্ভার নষ্ট, অফিসার আসেননি, ছবিতে সমস্যা, জন্ম তারিখ ভুল এমন হাজারও সমস্যা তুলে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয় পাসপোর্ট ডেলিভারি। সূত্র আরো জানায়, আগারগাঁও বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে বেশির ভাগ আবেদন জমা হয় ঘুস চ্যানেলে। আবেদনপ্রতি নূনতম ঘুস নেওয়া হয় ২ হাজার টাকা। এ হিসাবে দৈনিক ঘুসের পরিমাণ দাঁড়ায় নিদেনপক্ষে ১০ লাখ টাকা। মাসে আসে প্রায় ৩ কোটি টাকা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দেশের প্রতিটি পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে তৈরি হয় পাসপোর্ট। বাইরে থেকে দালালরা নিয়ন্ত্রণ করে পাসপোর্ট অফিসগুলো। দালাল ছাড়া পাসপোর্ট করতে গেলে পড়তে হয় হয়রানিতে। শুধু ঢাকার পাসপোর্ট অফিস নয়, দেশের ৬৪টি জেলার পাসপোর্ট অফিসেই আছে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য। ঘুস না দিলে পদে পদে হয়রানি আর চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। নানাবিধ উদ্যোগ সত্তেও পাসপোর্ট সেবা অনেকটাই যেন আটকে গেছে দুর্নীতির দুষ্টচক্রে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, চাঁদপুর, যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও চাঁন্দগাঁও পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য এখন চরমে।
দেশের পাসপোর্ট অফিসগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য কমছে না কোনোভাবেই। বিভিন্ন সময়ে পুলিশের অভিযানে দালালরা ধরা পড়লেও জামিনে বের হয়ে একই কাজ করছে। দালাল ছাড়া পাসপোর্টের আবেদন করলে আবেদনকারীকে নানা বাহানার সম্মুখীন হতে হয়। পাসপোর্ট অফিসের অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী সার্ভার নষ্ট, ছবিতে সমস্যা, জন্ম তারিখে ভুলসহ নানা কারণ দেখিয়ে টালবাহানা করতে থাকেন। এভাবে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয় পাসপোর্ট ডেলিভারি। আর দালালদের হাত ধরে পাসপোর্ট আবেদন করলে অফিস থেকে এ ধরনের কোনো বাহানা শুনতে হয় না। দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ঠিকই সঠিক সময়ে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যায়। তাই পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা ও দালালদের মধ্যে যোগসাজশের প্রশ্ন ওঠে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে স্থায়ীভাবে পাসপোর্ট অফিসগুলো দালালমুক্ত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

