গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই

গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই

রমজান শিকদার । মঙ্গলবার, ০৭ জুন ২০২২ । আপডেট ০৯:৩০

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্নাতক প্রথমবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধ নিয়ে অনেক লেখা ও তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। সম্মুখ সমরের প্রধান যোদ্ধা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী এবং তাদের পেছনে অভিভাবকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষকদের পক্ষ কোনটি তা স্পষ্ট নয়। এ যুগের অসহায় অভিভাবক আর উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশীদের বড় অংশ এ অবস্থার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই দায়ী করেন। সাধারণ অভিভাবক আর শিক্ষার্থী যতই করুণ দশায় নিপতিত হোক না কেন, অনেকের মতে আমরা শিক্ষকরা কল্পতরু আর সুবিধার বৃক্ষ থেকে নিচে নামতে চাই না। অনেক শিক্ষক আবার মনে করেন, প্রতিটি পরীক্ষার্থীর নাড়ি টিপে টিপে যোগ্যজনকে খুঁজে বের করবেন।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। শিক্ষকরা তাদের প্রয়োজন অনুসারে মেধাবী শিক্ষার্থী বেছে নেবেন। গুচ্ছভর্তি পরীক্ষায় সেই সুযোগ থাকবে না। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের কারও কারও যুক্তি আছে। ভর্তিযুদ্ধের নানা ক্ষতিকর দিক থাকলেও তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ গ্রহণ করে নিজ পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু সমন্বিত বা গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় সে সুযোগ থাকবে না। ভর্তি পরীক্ষায় ফরম তোলার যোগ্যতা যাদের আছে, আমি বিশ্বাস করি তাদের যে কাউকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দিলে সে সাফল্যের সঙ্গে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে পারবে। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নাড়িনক্ষত্র জেনে ভর্তি করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এর ভেতর বাস্তব চিন্তা যতটা না আছে, তার চেয়ে বেশি আছে অমানবিক বাণিজ্যচিন্তা। এখন শিক্ষার নীতিনির্ধারণে যেন সবাই রাজা। তাই ইচ্ছামতো পালটে যাচ্ছে পরীক্ষা পদ্ধতি।

পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে চকচকে গ্রেডের নেশায় আমাদের মেধাবী সন্তানরা ওদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারছে না। ফলে শতকরা চার পাঁচ ভাগের বেশি শিক্ষার্থীর পক্ষে এই বৈতরণী পাড়ি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই বলি যে, স্কুল থেকে প্রচলিত শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগেই শিক্ষার্থীদের এক ধরনের বিকলাঙ্গ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হাতেগোনা কয়েকটি আসনের বিপরীতে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ছুটে বেড়ানোর অসহায় শাস্তি থেকে উদ্ধারের জন্য গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষার উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। তবে একে বাস্তবায়ন করাটা অত সহজ নয়। এ বিশাল কর্মযজ্ঞকে কার্যকর করতে হলে অনেক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। অবশ্য কী কী পদ্ধতিতে গুচ্ছভর্তি পরীক্ষা কার্যকর করা হবে, সে ব্যাপারে আমাদের অনেকের ধারণা খুব স্পষ্ট নয়। সাধারণ্যে এসব ধারণা আরও স্পষ্ট করতে হবে। চলমান প্রক্রিয়ায় যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় তারা নিজেদের পছন্দের বিভাগে ভর্তি হতে পারে। পাশ করার সুবাদে কখনো যেমন করে ভাবেনি, তেমন বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী। এটিই বাস্তবতা। আর যেসব সম্মানিত সহকর্মী ভাবেন আমরা বেছে বেছে মেধাবী প্রার্থীদের ভর্তি করব, তাদের সঙ্গে আমি একমত নই। শিক্ষার্থীকে তৈরি করার দায়িত্ব শিক্ষকের-বিশ্ববিদ্যালয়ের।

গুচ্ছ পদ্ধতির পরীক্ষা নেওয়ার বিরোধিতা করার পেছনে অনেকে শিক্ষক বাণিজ্যবুদ্ধির কথা বলেন। এ অভিযোগ অনেকাংশে যে সত্য নয়, তা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত সত্যকে কি কেউ অস্বীকার করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারি আমলাদের একটি বড় আর্থিক বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে অনেক আগে। বেতন কাঠামোর বিচারে শিক্ষকরা যে খারাপ আছেন তা বলা যাবে না। এই ভালোটি কিন্তু দুবেলা ভালো খেয়েপরে চলার মতো। শতকরা দু-চার ভাগ শিক্ষক যারা বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন পড়ানোর সুযোগ পান বা বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করেন, তাদের বাদে বৃহত্তর সংখ্যক শিক্ষকের অবস্থা যে খুব ভালো তা নয়। বৃহত্তর কল্যাণের কথা বিবেচনা করে শিক্ষকদের অধিকাংশ গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে মত দেবেন বলেই আমার বিশ্বাস। আমরা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অমানুষিক কষ্ট লাঘব করতে চাই। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষকই এক্ষেত্রে আর্থিক লাভ প্রত্যাশা করেন না। এ অবস্থায় গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।

লেখক: সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading