তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে : আরও একটি যুদ্ধ কী আসন্ন?
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১২ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:৪৫
তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা দিনকে দিন বাড়ছেই। বেইজিং স্বায়ত্বশাসিত গণতান্ত্রিক এ দ্বীপকে চীন তাদের ভূখণ্ডের অংশ বিবেচনা করে। অন্যদিকে, তাইওয়ানকে সামরিক শক্তিতে সাহায্য করতে মরিয়া আমেরিকা। তাইওয়ানকে কেউ যদি বিভক্ত করার চেষ্টা করে তবে যুদ্ধে করতে দ্বিধা করবে না চীন। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে এশিয়ান নিরাপত্তা সম্মেলনে তাইওয়ান নিয়ে এমন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে চীন। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে চীনের এমন বক্তব্য বিশ্বে আরও একটি যুদ্ধেরই কী বার্তা দিচ্ছে? বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান
তাইওয়ান নিয়ে আমেরিকা ও চীনের দ্বন্দ্বের নতুন বার্তা পেলো বিশ্ব। আর এই বার্তা যদি সত্যিই কার্যকর হয় তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে। ইতোমধ্যেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে স্থবির হয়ে পরছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থান। এর ওপর তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের কড়া বার্তা বিশ্বকে আদতে কোন পথে ঠেলে দিচ্ছে তা নিয়েই ভাবছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ। তাইওয়ান নিয়ে চীনের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ লড়ে যাচ্ছে আমেরিকা। আর তাই চীন এবার সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে তাইওয়ানকে বিভক্ত করা হলে যুদ্ধ শুরু করতে দ্বিধা করবে না চীন। চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেঙ্গহি গত শুক্রবার আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সঙ্গে সাক্ষাতে এই সতর্কবার্তা দেন। সিঙ্গাপুরে নিরাপত্তা সম্মেলন ‘সাংগ্রিলা ডায়ালগের’ ফাঁকে চীন ও আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বৈঠকে বসেন। গণতান্ত্রিক, স্বশাসিত তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে মার্কিন-চীন উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। বেইজিংয়ের ক্রমাগত আক্রমণের হুমকির মধ্যে রয়েছে তাইপে। বেইজিং দ্বীপটিকে তার এলাকা হিসেবে দেখে এবং প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে একদিন এটি দখল করার কথাও বলেছে।
স্বায়ত্তশাসিত তাইওয়ানকে চীন তাদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। তাই তাইওয়ানের কাছে আমেরিকার অস্ত্র বিক্রিকে সবসময়ই নিন্দা জানায় চীন। সিঙ্গাপুরের ওই নিরাপত্তা সম্মেলনে চীন ও আমেরিকার প্রতিরক্ষাপ্রধান পর্যায়ের প্রথম বৈঠক ছিল এটি, যা প্রায় একঘণ্টা ধরে চলে। উভয়পক্ষই এই আলোচনাকে ‘মসৃণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছে। তাইওয়ানকে স্বাধীন করার যেকোনো চেষ্টা যুদ্ধ ডেকে আনবে বলে আমেরিকাকে সতর্ক করেছে চীন। ওয়েই বলেন, তাইওয়ানকে বিভক্তের চেষ্টা করা হলে চীনের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না। এ সময় অস্টিন চাইনিজ সামরিক কার্যকলাপকে ‘উস্কানিমূলক ও অস্থিতিশীল’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিনই চীনের রেকর্ড সংখ্যক বিমান উড়াউড়ি করেছে। এতে ওই এলাকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে।
যুদ্ধ শুরু করতে দ্বিধা করবে না চীন: চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেংহে বলেছেন, যদি কেউ চীন থেকে তাইওয়ানকে বিভক্ত করার সাহস করে, তবে চীনা সেনাবাহিনী অবশ্যই যুদ্ধ শুরু করতে দ্বিধা করবে না, তাতে খরচ যাই হোক না কেন। চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অস্টিনকে চীনা মন্ত্রী বলেছেন বেইজিং ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দেবে এবং মাতৃভূমির একীকরণকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করবে। ফেংহে জোর দিয়ে বলেছেন, তাইওয়ান চীনের তাইওয়ান… তাইওয়ানকে ব্যবহার করে চীনকে কখনোই ধরে রাখা যাবে না। স্বশাসিত তাইওয়ানকে বেইজিং তার এলাকা হিসাবে দেখে এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে একদিন এটি দখল করে নেওয়া হবে বলে বহুবার ঘোষণা দিয়েছে।

উস্কানিমূলক সামরিক কর্মকাণ্ড দেখছে আমেরিকা: আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়ড অস্টিন শনিবার (১১ জুন) তাইওয়ান ভূখন্ডের কাছে চীনের ‘উস্কানি ও অস্থিতিশীলতামূলক’ সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। এ দ্বীপ স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বেইজিং ‘যুদ্ধ শুরু করতে দ্বিধা করবে না’- চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাকে এভাবে সতর্ক করার এক দিন পর তিনি এ সমালোচনা করেন। সিঙ্গাপুরে সানগ্রি-লা ডায়ালগ নিরাপত্তা সম্মেলনে অস্টিন বলেন, আমরা বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান বলপ্রয়োগ লক্ষ্য করছি। আমরা তাইওয়ানের কাছে ক্রমবর্ধমান উস্কানি ও অস্থিতিশীলতামূলক সামরিক কর্মকাø দেখতে পাচ্ছি। তিনি বলেন, এসব উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম চীনের বিমানবাহিনীর মহড়া। দেশটির সামরিক বিমানকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাইওয়ানের কাছ দিয়ে রেকর্ড সংখ্যকবার চক্কর দিতে দেখা যায় এবং প্রায় প্রতিদিন তারা এমন সামরিক কর্মকাণ্ড চালায়। তাইওয়ান প্রশ্নে সম্পর্কের অবনতি ঘটার পর এ সম্মেলনের ফাঁকে গত শুক্রবার এই প্রথম অস্টিন ও চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী উয়ি ফেনগি সরাসরি কথা বলেন।

দক্ষিণ চীন সাগরে কী বার্তা দিচ্ছে চীন?: অস্টিন বলেন অন্যান্য দেশের সাথে চীনের প্লেন এবং জাহাজগুলোর মধ্যে অনিরাপদ এবং পেশাগতভাবে সংঘর্ষের সংখ্যা ‘উদ্বেগজনক’ ভাবে বেড়েছে। গত মে মাসে দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলে একটি চীনা ফাইটার এয়ারক্রাফ্ট বিপজ্জনকভাবে একটি অস্ট্রেলিয়ান সামরিক নজরদারি বিমানকে বাধা দেয় এবং কানাডার সামরিক বাহিনী উত্তর কোরিয়ার নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি পর্যবেক্ষণ করার সময় চীনা যুদ্ধবিমানকে তার টহল বিমানকে হয়রানি করার অভিযোগ করেছে। তাইওয়ান বছরের পর বছর ধরে তার আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলে বারবার চীনা বিমান বাহিনীর অভিযানের অভিযোগ করেছে, যা আঞ্চলিক আকাশসীমা নয় বরং একটি বিস্তৃত এলাকা যা হুমকি মোকাবিলায় পর্যবেক্ষণ করা হয়। অস্টিন বলে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই অনুপ্রবেশ বেড়েছে। গত ৩০ মে তাইওয়ানের আকাশসীমায় চীনের ৩০ যুদ্ধবিমান অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগ করে তাইওয়ান। এটি চলতি বছরে চীনের দ্বিতীয় বৃহৎ যুদ্ধবিমানের বহরের অনুপ্রবেশ। তাইপে বলছে, এই বহরে থাকা ৩০টি যুদ্ধবিমানের ২০টি ছিল জঙ্গিবিমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের অসন্তোষের বিষয়টি জানাতে তাইওয়ানের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমানের বড় বহর পাঠাচ্ছে চীন। এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি ৩৯টি যুদ্ধবিমান তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্ত অঞ্চলে (এডিআইজেড) প্রবেশ করেছিল। তবে দাবি করা এডিআইজেড অঞ্চলের মধ্যে চীনের নিজস্ব এডিআইজেডের অনেক বড় একটি অংশ পড়ে। এমনকি এর মধ্যে চীনের মূল ভূখøেরও কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত। চলতি বছর এ পর্যন্ত তাইওয়ানে ৪৬৫ বার চীনের যুদ্ধবিমানের অনুপ্রবেশের কথা বলা হচ্ছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালে এডিআইজেডে ৯৬৯ বার চীনের যুদ্ধবিমান অনুপ্রবেশের ঘটনা নথিভুক্ত করে তাইওয়ান।

বাইডেনের সেই বক্তব্য ও চীনের বাড়তি নজর: এদিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সাম্প্রতিক এশিয়া সফরে এসে জাপানে গত মে মাসে তাইওয়ান ইস্যুতে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন। বাইডেন তখন বলেছিলেন তাইওয়ানে চীন সামরিক হামলা চালালে আমেরিকা চুপ করে বসে থাকবে না। তাইওয়ানকে রক্ষায় প্রয়োজনে চীনের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেবে আমেরিকা। তাইওয়ান ইস্যুতে তার ওই বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছিলো চীনের স্টেট কাউন্সিলের তাইওয়ান বিষয়ক কার্যালয়। তারা বলেছিলো, আমেরিকা আগুন নিয়ে খেলছে। কার্যালয়ের মুখপাত্র ঝু ফেংলিয়ান বলেন, চীনকে আটকাতে আমেরিকা তাইওয়ান কার্ড ব্যবহার করছে। আমেরিকা নিজেই আগুনে পুড়ে যাবে। তাইওয়ান ইস্যুতে বাইডেনের মন্তব্যের বিষয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। ১৯৪০ সালের গৃহযুদ্ধে চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয় তাইওয়ান। তারপর থেকে তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থী রাজনীতিকরা নিজেদের স্বাধীন ও সার্বভৌম বলে দাবি করলেও চীন এই দ্বীপ ভূখণ্ডকে এখনও নিজেদের অংশ বলে দাবি করে। ৩৬ হাজার ১৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ ভূখøের রয়েছে নিজস্ব সংবিধান, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতৃত্ব এবং প্রায় ৩ লাখ সক্রিয় সেনা সদস্যের একটি সেনাবাহিনী। এখন পর্যন্ত অবশ্য খুবই অল্প কয়েকটি দেশ তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকলেও তাইওয়ানে এখন পর্যন্ত নিজেদের কোনো দূতাবাস খোলেনি দেশটি। তবে তাইওয়ান বিষয়ক একটি আইনের আওতায় এই স্বাধীনতাকামী দ্বীপভূখণ্ড গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকেই সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক সহায়তা দিয়ে আসছে আমেরিকা। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, চীন যদি তাইওয়ানে আগ্রাসন চালায়, সেক্ষেত্রে তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা দেবে আমেরিকা। বাইডেনের এই বক্তব্যের পর থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

নিজেদের নীতিতে অনড় চীন-আমেরিকা: এদিকে, চলতি বছর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে চীন এ ইস্যুতে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ায় অস্বস্তিতে পড়েছে আমেরিকা। সেই অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছে চীন ও রাশিয়ার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কগত ঘনিষ্টতা। গত মার্চে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিন পিংয়ের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। তখন তাইওয়ান ইস্যুতে ‘সঠিক ভূমিকা’ নিতে আমেরিকাকে আহ্বান জানায় চীন। বাইডেনকে চীনা প্রেসিডেন্ট তখন বলেছেলেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থী শক্তিকে ভুল বার্তা দিচ্ছে আমেরিকার কিছু ব্যক্তি। এটা খুবই বিপজ্জনক। তিনি বলেন, যদি তাইওয়ান ইস্যুতে সঠিক ভূমিকা নেওয়া না হয়, তাহলে এটি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলবে। এদিকে হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, তাইওয়ান ইস্যুতে আমেরিকার নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্থিতাবস্থা ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি তাইওয়ানের নিরাপত্তার প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানানোয় বাইডেনকে ধন্যবাদ জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ইউডি/সুপ্ত

