হঠাৎ মেঘে ঢাকা সূর্য

হঠাৎ মেঘে ঢাকা সূর্য
Hand-drawn vector drawing of a Comforable Sun in a Calm Landscape. Black-and-White sketch on a transparent background (.eps-file). Included files are EPS (v10) and Hi-Res JPG.

সুমন সরকার । রবিবার, ১২ জুন ২০২২ । আপডেট ১৪:২০

ঘরে ফিরে দেখল স্ত্রীর মুখ ভার। ছেলের গাল ফোলা। ফোলা গালের ওপর চোখের জলের রেখা। ফরসা গায়ের উপর হাতের আঙুলের ছাপ। কালি লেগে আছে। হাঁড়ি পাতিল উপুড় করে রোদে ছড়ানো। স্ত্রী সন্তানের হাসি মুখ দেখা ছাড়া যাদের দিন কাটে মজনু মাস্টার তাদের একজন। তবু সে আশা ছাড়ে না। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে গায়ের জামা খুলতে খুলতে এক দমে বলে- জানো খোকার মা, খবর নিয়ে এলাম। সপ্তাহ দুইয়ের মধ্যে শিক্ষা বোর্ডের বিলটা পাবো। কথা শেষ হতে না হতে মুখ খুলল দুই সন্তানের জননী লায়লা বেগম। তুমি থাক তোমার ঐ বিল নিয়ে- কতবার বললাম, আমার বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে একটা মুদির দোকান দাও। সেই কথায় কান নেই। উনি আছেন উনার পাঠশালা নিয়ে! কী হবে শুনি বনের মোষ তাড়িয়ে। ওদের তো পড়িয়ে পড়িয়ে এক একজনে জজ ব্যারিস্টার বানাও অথচ নিজের ছেলে মেয়ের ভাগ্যে খাবার জোটে না। বেদনার্ত হয়ে চৌকির কোণে বসে পড়ল মজনু মাস্টার। হাত বাড়িয়ে ছেলেকে কাছে টানল। ঠিকই বলেছ খোকার মা। শিক্ষকের কাজই তো তা-ই। বনের বাঁশ কেটে বাঁশের বাঁশিতে সুর তোলা। আমাদের সমাজের লোকজন শুধু শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষাটাই আশা করে; কিন্তু তারও জীবন আছে,সংসার আছে, ছেলে মেয়ে আছে, সেটা তারা ভাবে না।… আমরাই সমাজে আলো জ্বালি অথচ আমাদের ঘরেই আলো জ্বলে না। আমরা মানুষ তৈরি করি, অথচ আমরাই মানুষের মর্যাদা পাই না।… এসব বলে আর কী হবে! এদ্দিন যা করবার তা করেছ। এখন ওসব ছেড়ে শহরে গিয়ে দেখ কোনো একটা কাজ জোগাড় করতে পারো কি না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মজনু মাস্টার বলল – কোথায় গিয়ে কী কাজ করব বল? বিদ্যা বিতরণ ছাড়া তেমন কোন কাজ জানা নেই। ছোটবেলায় পাদটীকা গল্পে পন্ডিত মশাইয়ের কথা পড়েছিলাম। রাজ্জাক স্যার তালেভ মাস্টার কবিতা পড়িয়েছিলেন। তাদের সেই জীবন যে আমিও লাভ করব ভাবিনি কখনও।

ছেলেটি বাবার হাতের বেষ্টনী ছেড়ে মায়ের কাছে এগিয়ে গেল। মা পরম আদরে আঁচলে মুখ মুছে দিল। তারপর বলল- যাও বাবা, মধুদের আমতলে খেল গিয়ে। না মা, আমি যাব না, খেলতে ভাল্লাগে না, খিদা লাগছে, ভাত দাও। ছেঁড়া পাঞ্জাবিটা গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বের হলো মজনু মাস্টার। দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল। কিন্তু রোদের তেজ কমেনি। রোদের তেজের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে ক্ষুধার তেজ। বড় রাস্তা পার হয়ে মিনিট পাঁচের পথ পেরুরে বয়াতির বাড়ি। বিপদের দিনে বহুবার গিয়ে সেখানে কখনো খালি হাতে ফেরেনি। বড় রাস্তার কাছাকাছি চলে এসেছে মজনু মাস্টার। ডানে বামে দৃষ্টি নেই। দৃষ্টি কেবল রাস্তার ঐপাড়ে পরান বয়াতির বাড়ির দিকে। পেছন থেকে একজন চিৎকার করে ডাকল – থামো মাস্টার থামো… সেই ডাক মাস্টারের কানে পৌঁছল না, পৌঁছল না গাড়ির হর্নের শব্দও। তার কানে ক্রমাগত বেজে চলছে- না মা, আমি যাব না, খেলতে ভাল্লাগে না, খিদা লাগছে। ভাত দাও, মা ভাত…। লোকটি দৌড়ে এসে দেখল চশমার গ্লাস দুটো নেই, ফ্রেমটা খোলা ভাঙা পড়ে আছে। ততক্ষণে কোথা থেকে এক খন্ড মেঘ এসে ঢেকে দিন বৈশাখ সূর্যের মুখ।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading