ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি: ইন্ডিয়ায় হচ্ছেটা কী
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৪ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:৫০
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তাল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইন্ডিয়া। নিজেদের নবীকে নিয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দলের নেত্রী কটাক্ষ করায় সে দেশের সংখ্যালঘু মুসলিমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্ব বিশেষকরে মধ্যপ্রাচ্যের আরব অধ্যুষিত দেশগুলো এই ঘটনায় সরব হয়েছে এবং তারা তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিজেপি অভিযুক্ত নুপুর শর্মাকে বরখাস্ত করে। কিন্তু সেই রেশ গোটা ইন্ডিয়াজুড়ে এখনও চলছে। রাজ্যে রাজ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে আর প্রশাসন বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হচ্ছে। বিস্তারিত লিখেছেন সাদাত কবির
দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ইন্ডিয়া। বিশাল এই দেশে রয়েছে নানা মতের, নানা ধর্মের মানুষ। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বন্ধন নিয়েই দেড়শ কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস দেশটিতে। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয়ভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় সেখানে। তাতে অভ্যন্তরীণ ভাবেই তা সমাধান হয়। কিন্তু সম্প্রতি দেশটির ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দলের একজন মুখপাত্রের প্রকাশ্যে করা এক উক্তি ইন্ডিয়াতো বটে গোটা বিশ্বেই আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতাধর ওই দল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি বেশি আবেগপ্রবণ বলছেন অনেকেই। সাম্প্রতিক সময়ে সে দেশের ধর্মীয় বেশকিছু সিদ্ধান্তেই তাদের এ মত।
এদিকে, এ ঘটনায় বাংলাদেশেও প্রতিবাদ হয়েছে এবং হচ্ছে। গত শুক্রবার বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক দল এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করে প্রতিবাদ করেছে। তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ ঘটনায় ইন্ডিয়ার প্রতি নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপনের দাবি করছে। এ ঘটনায় কৌশলগত কারনে প্রতিক্রিয়া জানায়নি বাংলাদেশ সরকার।

‘বিচ্ছিন্ন কয়েকজনের দৃষ্টিভঙ্গি’ বলছে ইন্ডিয়া: বিজেপি’র সদ্য বরখাস্ত মুখপাত্র নুপুর শর্মা এক টেলিভিশন শোতে অংশ নিয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বিতর্কিত এক মন্তব্য করেছিলেন। পরে দলটির নয়াদিল্লি শাখার গণমাধ্যম প্রধান নবীন জিন্দালও নুপুর শর্মার ওই মন্তব্যের সমর্থনে টুইট করেন। তাদের এই মন্তব্য দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এমনকি অভিযুক্তদের মন্তব্যের জেরে ইন্ডিয়ার কয়েকটি রাজ্যের মুসলিমরা বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেন। আর এর রেশ দেশের গøি ছাড়িয়ে বাইরের বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিজেপি গত রবিবার অভিযুক্ত নুপুর শর্মাকে বরখাস্ত এবং জিন্দালকে বহিষ্কার করা করে। ইন্ডিয়ান সরকার এই বিতর্ককে ঠাøা করতে চেষ্টা করছে; মহানবী (সা.) কে নিয়ে মন্তব্যকে ‘বিচ্ছিন্ন কয়েকজনের দৃষ্টিভঙ্গি’ অ্যাখ্যা দিয়েছে তারা। পরে বিজেপির এই দুই নেতা প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি দেয়। এরই মধ্যে সমাজের শান্তি বিনষ্ট, অস্থিতিশীলতা তৈরি এবং বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে বিজেপির এই দুই নেতা ছাড়াও আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে গত সপ্তাহে দিল্লি, মুম্বাই, পুনেসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে মামলা হয়েছে।
বিক্ষোভ বন্ধ করতে বলছেন মুসলিম নেতারা: এদিকে, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির ইসলামি দলের নেতা ও আলেমরা। গত সপ্তাহে ইন্ডিয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। এমন প্রেক্ষাপটে ইসলামি শীর্ষ নেতারা এ আহ্বান জানান। সহিংসতার ঘটনায় দুজন নিহত, পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। ইন্ডিয়ার ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াত-ই-ইসলামি হিন্দের জ্যেষ্ঠ নেতা মালিক আসলাম বলেছেন, কেউ যখন ইসলাম নিয়ে সমালোচনা ও হেয় মন্তব্য করেন, তখন প্রত্যেক মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ ধরনের সংকটময় মুহূর্তে শান্তি বজায় রাখাও দরকার।

মুসলীম বিশ্বে নিন্দার ঝড়: নূপুর বিজেপির মুখপাত্র ছিলেন। মহানবী (সাঃ) নিয়ে তার করা মন্তব্যের জেরেই ইন্ডিয়াজুড়ে ও মুসলিম দেশগুলোতে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ ওই বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য ইন্ডিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে বলেছে, অনেকে ইন্ডিয়ান রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। কোথাও কোথাও ইন্ডিয়ান পণ্য বর্জনের আওয়াজও উঠেছে।
উসকানি দেয়ার অভিযোগে চলছে ধরপাকড়: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে ইন্ডিয়ার ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এক নেত্রীর কটূক্তিকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার সন্দেহে উত্তরপ্রদেশে কয়েকজনের বাড়িঘর স্থানীয় প্রশাসন ভেঙে দিয়েছে। চলছে জোর ধরপাকড়ও। এছাড়াও কাশ্মীরে এক তরুণকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। সেই তরুণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। ভিডিওতে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটুক্তি করার কারণে বহিষ্কার হওয়া বিজেপিনেত্রী নূপুর শর্মাকে শিরচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়। ওই ভিডিও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ে। পরে অবশ্য ইউটিউব কর্তৃপক্ষ ভিডিওটি সরিয়ে নেয়।
প্রতিবাদকারীদের বাড়ি ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে: ইন্ডিয়ার উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের প্রয়াগরাজ, সাহারানপুর ও কানপুর জেলায় গত কয়েকদিনে বেশ কিছু বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে এগুলো অবৈধভাবে নির্মিত। কিন্তু স্থানীয়রা, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মুসলিমদের টার্গেট করেই এ অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রয়াগরাজ জেলা শহরে, যার আগেকার নাম ছিল এলাহাবাদ। এ শহরেরই করেলি এলাকায় ওয়েলফেয়ার পার্টির একজন নেতা জাভেদ মোহাম্মদের বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। বলা হচ্ছে, তিনি ছিলেন গত শুক্রবার এ শহরে জুম্মার নামাজের পর বিক্ষোভের প্রধান পরিকল্পনাকারী। এর আগে মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে অন্তত ৪৫টি মুসলিম বাড়িঘর একইভাবে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়।
ইন্ডিয়ার বার্তা সংস্থা এএনআই এক টুইট বার্তায় জানায়, প্রয়াগরাজ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি জাভেদ মোহাম্মদের বাড়ি ভেঙে ফেলা হবে বলে একটি নোটিশ দেয়। রবিবার সকাল ১১টার মধ্যে তাকে বাড়িটি খালি করে দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, বাড়িটি অবৈধভাবে নির্মিত। এরপর রবিবারই বুলডোজার এসে বাড়িটি ভেঙে দেয়। পুলিশের একজন কর্মকর্তা আনন্দ প্রকাশ তিওয়ারি বলেন, ‘নিয়মনীতি অনুসরণ করেই ভবনটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, এবং ভূমিদস্যুদের অবৈধভাবে নির্মিত বাড়িঘরের বিরুদ্ধে তারা পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
নুপুর শর্মাকে কলকাতা পুলিশের তলব: বিজেপি’র বরখাস্তকৃত মুখপাত্র নুপুর শর্মাকে তলব করেছে কলকাতা পুলিশ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে তলব করা হয়েছে। খবর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার। এতে বলা হয়েছে, জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য নুপুর শর্মাকে আগামী ২০ জুন সেন্ট্রাল কলকাতার নারকেলডাঙ্গা থানায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সংখ্যালঘু সেলের সাধারণ সম্পাদক আবুল সোহেলও বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগে নুপুর শর্মার বিরুদ্ধে কনতাই থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেছেন।
বিক্ষোভকারী প্রবাসীদের ফেরত পাঠাবে কুয়েত: মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে কুয়েতের ফাহাহিল এলাকায় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া প্রবাসীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। গত শুক্রবার (১০ জুন) জুমার নামাজের পর বিক্ষোভে অংশ নেওয়া প্রবাসীদের গ্রেফতারের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া প্রবাসীরা কুয়েতের আইন ও বিধি ভঙ্গ করেছেন। দেশটির আইন অনুসারে, প্রবাসীরা কুয়েতে কোনও ধরনের অবস্থান বা বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করতে পারেন না। সব প্রবাসীদের কোনও ধরনের বিক্ষোভে অংশগ্রহণ না করার কুয়েতি আইন অবশ্যই মেনে চলতে হবে। ইতোমধ্যেই বিক্ষোভে অংশ নেওয়াদের গ্রেফতার এবং নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। তাদের ভিসা বাতিল করা হবে। এছাড়া পুনরায় তাদের কুয়েত প্রবেশে আজীবন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে।
সরকারি-বেসরকারি ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা: বিজেপির জ্যেষ্ঠ দুই নেতার বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটগুলোতে সাইবার হামলা শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত সাইবার হামলার শিকার হয়েছে দেশটির ৭০টি ওয়েবসাইট। হামলার শিকার এসব ওয়েবসাইটের মধ্যে দেশটির সরকারি ও বেসরকারি ওয়েবসাইটও রয়েছে। সোমবার (১৩ জুন) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ার সরকারি ও বেসরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে হামলার ঘটনার পেছনে রয়েছে হ্যাকার গ্রুপ ড্রাগনফোর্স মালয়েশিয়া। তাদের চালানো সিরিজ এসব হামলায় অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ইসরায়েলে ইন্ডিয়ান দূতাবাসের ওয়েবসাইট, ইন্ডিয়ার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এগ্রিকালচার এক্সটেনশন ম্যানেজমেন্টের ওবেসাইট এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচার রিসার্চের ই-পোর্টালও রয়েছে।

পরিবারের নিয়ে জিন্দালের আকুতি: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে দল থেকে বহিষ্কৃত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপি’র জ্যেষ্ঠ নেতা নবীন কুমার জিন্দাল জানিয়েছেন, তার পরিবার বিপদে আছে এবং ইসলামিক মৌলবাদীদের হামলার আশঙ্কায় রয়েছে। আর তাই তার ও তার পরিবারের তথ্য কাউকে না জানানোর আকুতি জানিয়েছেন তিনি। দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত এই বিজেপি নেতা হিন্দিতে করা এক টুইটে বলেন, আমি বিনীতভাবে সকলকে আমার এবং আমার পরিবার সম্পর্কে কোনো তথ্য কারও সাথে শেয়ার না করার জন্য অনুরোধ করছি। আমার অনুরোধ সত্ত্বেও অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার আবাসিক ঠিকানা পোস্ট করছেন। আমার পরিবার ইসলামিক মৌলবাদীদের হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে জিন্দাল বেশ কিছু স্ক্রিনশটও শেয়ার করেছেন যেখান থেকে তিনি হুমকি পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন এবং দিল্লি পুলিশকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জিন্দাল নিজেকে একজন ‘গর্বিত হিন্দু’ হিসাবে উল্লেখ করে বলেছেন, এই মুহুর্তে তার মূল মনোযোগ হলো- নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

