আশুতোষ মুখোপাধ্যায়: উপমহাদেশের অন্যতম ছাত্রদরদী শিক্ষাবিদ

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়: উপমহাদেশের অন্যতম ছাত্রদরদী শিক্ষাবিদ

উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন ২০২২ । আপডেট ১৩:০৫

স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একজন সুবিখ্যাত ইন্ডিয়ান বাঙালি শিক্ষাবিদ যিনি একাধারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য ও কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন প্রথম ছাত্র যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯১১ সালে তাকে নাইটহুড সম্মানে ভূষিত করা হয়। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

ইংরেজ গভর্নমেন্ট আশুতোষকে শিক্ষা বিভাগে উচ্চপদে চাকরি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা ইন্ডিয়ানদের না বলে তিনি সে চাকরি গ্রহণ করেন নি। শিক্ষাব্রতী আশুতোষের জীবনের প্রধান কীর্তি দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার করা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেছিলেন।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কে ছিলেন?
আশুতোয় মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন খাটি বাঙালি। তিনি একাধারে বাঙালি শিক্ষাবিদ, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তিনিই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে এম.এ পড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে তৎকালীন বাংলার বাঘ বলেও ডাকা হতো।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম
প্রসিদ্ধ শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক স্যার আশুতোষের জন্ম হয় কলকাতার বউবাজার পল্লীতে ২৯ শে জুন ১৮৬৪ সালে। তার বাবা গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একজন বিখ্যাত ডাক্তার ছিলেন। মা জগত্তারিণী ছিলেন একজন আদর্শ ইন্ডিয়ান মহিলা। আশুতোষের জন্মের পর গঙ্গাপ্রসাদ ভবানীপুরে এসে বসবাস করতে থাকেন।

অসাধারণ মেধাবী ও শ্রুতিধর ছাত্র ছিলেন তিনি
ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়ার পাঠশালায় আশুতোষের বাল্যশিক্ষা শুরু হয়। তিনি একজন অসাধারণ মেধাবী ও শ্রুতিধর ছাত্র ছিলেন। কোনও জটিল বিষয়ও একবার শুনে তিনি তা হুবহু মনে করে রাখতে পারতেন। ছোটবেলা থেকেই আশুতোষ গণিতের কঠিন কঠিন সমস্যা সহজে সমাধান করে দিতে পারতেন। তিনি দিনরাত পড়াশোনা করতে ও অঙ্ক কষতে ভালোবাসতেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তার বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। এজন্য তার ঘর থেকেই খাতা কলম পেনসিল সরিয়ে রাখা হয়েছিল। আশুতোষ তখন এক টুকরো কাঠ–কয়লা পেয়ে তাই দিয়ে ঘরের চার দেওয়াল জুড়ে গণিতের অনেক প্রশ্ন সমাধান করে রেখেছিলেন।

তিনি গণিতে প্রথম হয়ে এম.এ পাশ করেন। পরের বছর তিনি পদার্থ বিদ্যায় এম.এ. পাশ করেন। তারপর তিনি আইনের পরীক্ষা পাশ করেন। ইংরেজ গভর্নমেন্ট আশুতোষকে শিক্ষা বিভাগে উচ্চপদে চাকরি দিতে চেয়েছিলেন। তবে তখন চাকরিতে ইন্ডিয়ানদের ইংরেজদের সমান মর্যাদা ও সুযোগ দেওয়া হত না। এজন্য তেজস্বী আশুতোষ এই চাকরি গ্রহণ করেননি। একবার বড়লাট সাহেব তাকে বিদেশ যাবার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মা রাজি ছিলেন না বলে মাতৃভক্ত আশুতোষ বিদেশ যাননি।

কর্মজীবনে ছিলেন দক্ষ আইনজীবী
আশুতোষ কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করতেন। দক্ষ আইনজীবী হিসাবে তিনি যেমন সুনাম অর্জন করেছিলেন তেমনই প্রচুর অর্থও উপার্জন করেছিলেন। পরে তিনি হাইকোর্টের একজন বিচারপতি হয়েছিলেন।

বাংলা সাহিত্যে এম.এ পড়ার ব্যাবস্থা
শিক্ষাব্রতী আশুতোষের জীবনের প্রধান কীর্তি দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার করা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেছিলেন। তিনি দেশ–বিদেশ থেকে শ্রেষ্ঠ অধ্যাপকদের এনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক নতুন বিষয় পড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে এম.এ পড়ার ব্যবস্থাও তিনিই করেছিলেন। আশুতোয় ছিলেন একজন খাটি বাঙালি।

ছাত্রদরদী শিক্ষক
একদিন গণিতের পণ্ডিত অধ্যাপক গৌরীশঙ্কর দে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করে নিয়ে গেলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি। গৌরীশঙ্কর দে তার কাছে গিয়ে বললেন, ‘স্যার, অঙ্ক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি, যদি একটু দেখে দেন।’ আশুতোষ তার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চোখ বুলিয়ে একটু গম্ভীর হলেন। তারপর বললেন, ‘আমি স্নানটা সেরে আসি, আপনি ততক্ষণে যে প্রশ্নপত্রটি তৈরি করেছেন তার অঙ্কগুলো বরং কষে ফেলুন। তারপরই আশুতোষ কাঁধে গামছা ফেলে চলে গেলেন স্নানে।’ কথা শুনে গৌরীশঙ্কর দে’ও অঙ্ক কষতে বসে গেলেন।

আড়াই ঘন্টা বাদে তার সামনে এলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। তখন পরীক্ষা হত আড়াইঘন্টার। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাকে বললেন, আড়াই ঘন্টা কিন্তু ওভার গৌরীবাবু। আপনার প্রশ্নপত্রের সব অঙ্ক কষে ফেলেছেন তো? গৌরীশঙ্কর দে বললেন, ‘না স্যার, দু’তিনটে এখনো বাকি আছে।’ এবার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় হেসে বললেন, ‘তাহলেই বুঝুন, নিজের তৈরি প্রশ্নপত্র আপনার মতো পণ্ডিত মানুষের যদি আড়াই ঘন্টা পার হয়ে যায়, অল্পমেধার ছাত্রছাত্রীরা পারবে কেমন করে? যান, বাড়ি গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তাদের কথা মাথায় রেখে নতুন করে একখানা প্রশ্নপত্র তৈরি করুন।’

বিজ্ঞান চর্চা সমিতির সভাপতি
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় পরে ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানচর্চা সমিতির সভাপতি নিযুক্ত হন। তিনি প্রবন্ধ সাহিত্য রচনা করেছেন। জাতীয় সাহিত্য নামে তার প্রবন্ধ সংগ্রহ সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার বিশেষ অবদান হিসাবে স্বীকৃত। তিনি কয়েকটি বিদেশী ভাষা যেমন পালী, ফরাসী এবং রুশ ভাষায়ও অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি বিধবা বিবাহের একজন জোরালো সমর্থক ছিলেন।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উপাধি
সিংহলের মহাবোধি সোসাইটি তাকে ‘সন্ধুগম চক্রবর্তী’ উপাধি দেয়। ব্রিটিশ সরকার তাকে স্যার উপাধিতে ভূষিত করে। দেশীয় পন্ডিতগণ কর্তৃক তিনি সরস্বতী এবং শাস্ত্ৰবাচস্পতি উপাধিতে বিভূষিত হন। মায়ের নামে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ প্রবর্তন করেন।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু
আশুতোষ মুখার্জী ১৯২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২৫ শে মে ১৯২৪ সালে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই শিক্ষাবিদ ৬০ বছর বয়সে কলকাতায় পরলোক গমন করেন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading