সহিংসতামুক্ত জাতীয় নির্বাচনের পথ দেখাবে কুসিক নির্বাচন
দেলোয়ার জাহিদ । বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২২ । আপডেট ১৮:০০
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দোলাচলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীন গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত হলো বহুল আলোচিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) নির্বাচন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত। আরফানুল হক রিফাত নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৫০ হাজার ৩১০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি থেকে বহিস্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী, সদ্য বিদায়ী মেয়র মনিরুল হক সাক্কু টেবিল ঘড়ি প্রতীকে পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৯৬৭ ভোট। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল সাংবাদিকদের ভোট গ্রহণ শেষে জানান, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনসহ পাঁচটি পৌরসভা ও ১৭৬টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হয়েছে।
কুসিক নির্বাচনকে ঘিরে একটি নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিতে সংসদ সদস্য এর এখতিয়ার, দায়িত্ব ও আচরণ নিয়ে অনভিপ্রেত এক বিতর্কে জড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন। যার কারণে প্রার্থীদের হার-জিতের ফলাফলের চেয়ে ও দেশজুড়ে আলোচনা ও অগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নতুন নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও আস্থা অর্জনের পরীক্ষায় উত্তীর্ন্ন হওয়া। কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশনের এটাই স্থানীয় সরকার সংস্থার প্রথম বড় নির্বাচন। কুমিল্লা তো বটেই, সারা দেশের মানুষ দেখতে চাইবে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে কি না। সিইসির ভাষায় ভোট জালিয়াতদের ‘ব্ল্যাকআউট’ করে দিতে পেরেছে কি না। আর নির্বাচনের প্রতি ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে ক্ষমতাসীনদের জন্য কঠিনতর পরীক্ষা। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোতে যে একতরফা ও জবরদস্তির ভোট হয়েছে, তাতে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতিই মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। আমরা যদি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের আগে দুটি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করি, দেখা যাবে সেখানে দলীয় প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর ইমেজ জয়ে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
একটি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বহুপ্রতীক্ষিত গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে সর্বাগ্রে যে আস্থা তৈরির পরিবেশ গঠন সরকারের অগ্রাধিকার ছিল তা শুরুতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। নির্বাচনী আইন প্রয়োগের জন্য ভোটার, প্রার্থী এবং অন্যদের প্রক্রিয়ার সন্দেহজনক অংশগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য এবং তাদের অভিযোগগুলি তদন্ত ও সমাধান করার জন্য একটি ব্যবস্থার প্রয়োজন। অনেক নির্বাচনী বিরোধ জালিয়াতি বা নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের উপর ভিত্তি করে। প্রতিটি সিস্টেম নির্বাচনী বিরোধগুলো পরিচালনা করা এবং সেই বিরোধগুলো সমাধানের সময় পাওয়া যে কোনও অবৈধ পদক্ষেপ প্রক্রিয়াকরণের নিজস্ব উপায় তৈরি করেছে। বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের প্রয়োগকারী শাসন ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে মিলগুলো লক্ষণীয়। তাদের একই মৌলিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং বৃহৎ পরিমাপে, একই মৌলিক কাজগুলো অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করে। তারা প্রায় উচ্চ চার্জযুক্ত এবং রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে নিরপেক্ষ, সময়োপযোগী এবং কার্যকর প্রয়োগ প্রদানের একই সমস্যার সম্মুখীন হয়। পার্থক্যগুলো প্রতিটি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তারা সবচেয়ে প্রত্যক্ষ হুমকি হিসাবে তা বিবেচনা করে। ঐতিহাসিক এবং সম্ভাব্য হুমকির উপর এই ফোকাস প্রতিষ্ঠানের পছন্দ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ক্ষমতার পরিমাণ এবং নিষেধাজ্ঞার তীব্রতা প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি চ্যালেঞ্জ স্বরূপ, এ চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে বর্তমান নির্বাচন কমিশন কুমিল্লায় যে নির্বাচনটি সম্পন্ন করেছে তার জন্য তাদের সর্বোচ্চ নম্বর দেওয়া না গেলেও সম্পূর্ন্ন ব্যর্থতার দায়ভার চাপানোর কোনো সুযোগ নেই। এ নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে যদিও অংশ নেয়নি তারপর ও বিএনপি থেকে বহিস্কৃত দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর সম্মিলিত ফলাফল তাদের শক্তির জানান দেয়। ইভিএম মেশিনের ধীরগতির পর ও ৬০% ভোট পড়েছে এবং কোথাও কোনো সন্ত্রাস সহিংসতা ঘটেনি। নির্বাচনের ফল প্রকাশের সময় কিছু ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান সেখানে আইনের কোনো বত্যয় ঘটেছে কিনা এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সিইসির অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার অব্যাহত চেষ্টার অংশ হিসেবে প্রয়োজনে কিছু নির্বাচনী আইনের সংস্কার করতে হবে। সন্ত্রাস ও সহিংসতামুক্ত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন আগামী জাতীয় নির্বাচনের পথ দেখাবে- এ প্রত্যাশা আমাদের দেশের আপামর জনগণের সবার।
লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

