খেলাপি ঋণ আদায়ে আরও কঠোরতা কাম্য
মুস্তাফিজুর রহমান । শনিবার, ২৫ জুন ২০২২ । আপডেট ১৫:০০
বিদেশে পলাতক ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে যখন কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক, তখনই জানা গেল নিয়মিত ঋণকে খেলাপি করার প্রচলিত নীতিমালায় বড় ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে ঋণের কিস্তির আকার ও পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে কোনো গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করলেও তাকে খেলাপি করা যাবে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করা হয়। বস্তুত এটি ঋণখেলাপিদের জন্য আরও একটি ছাড়, যার ফলে উৎসাহিত হবে ঋণখেলাপিরা।
বলা হচ্ছে, করোনার নেতিবাচক প্রভাব, বন্যায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখতে দেওয়া হয়েছে এ ছাড়। উল্লেখ্য, করোনার কারণে গত বছরও ঋণ পরিশোধে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। সে বছর যে অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করার কথা ছিল, তার মাত্র ১৫ শতাংশ পরিশোধ করার পর কাউকে খেলাপি করা হয়নি। অথচ এরপরও খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সুযোগ দিয়ে লাভ নেই। তারা ঋণ পরিশোধ করবেন না, উলটো একের পর এক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পার পেয়ে যাবেন। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের কেস-টু-কেস সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা যেহেতু কেউ মানছে না, তাই এসব নির্দেশনা দিয়ে লাভ নেই। নির্দেশনা না দিয়ে বরং ভালো হয় ব্যাংকগুলোকে ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হলে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। তার এসব কথা আমলে নেওয়া দরকার বলে মনে করি আমরা।
খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবসায়, আরো বৃহত্তর পরিসর বিবেচনায় স্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছে। সরকার আসে সরকার যায়, খেলাপি ঋণসমস্যা অবসানের নানামাত্রিক প্রতিশ্রুতি ঘোষিত হয়। অর্থমন্ত্রীরা যখন দায়িত্বে আসেন নতুন এসব প্রতিশ্রুতির নবায়ন হয়। বলা হয়, যেকোনো মূল্যে ঋণখেলাপি সংস্কৃতির অবসান ঘটানো হবে; কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই সেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অর্থমন্ত্রীকেও নেতিয়ে পড়তে দেখা যায়। বলা হয়, এই কারণে ওই কারণে ঋণখেলাপি সমস্যার সমাধান হচ্ছে না বা করা যাচ্ছে না। ফলে দেখা যায়, সময়ের সাথে ঋণখেলাপি সমস্যার তীব্রতা শুধু বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে নয়া অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ঋণখেলাপি সমস্যা সমাধান করতে হলে আইন সংশোধন করতে হবে। যদি তাই হয়, তবে যথাসম্ভব দ্রুত প্রয়োজনীয় সে আইন বা আইনগুলো করতে হবে। বর্তমানে যে সংসদকাঠামো, তাতে সরকার চাইলেই অতি সহজে সে আইন প্রণয়ন করতে পারবে। তা ছাড়া, দেশের সাধারণ মানুষও চায় ঋণখেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রণয়ন হোক। আইনটি হওয়া দরকার এমন, যাতে ঋণখেলাপিরা সে আইনের ফাঁক গলাতে না পারে।
ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলোর সাথে ক্ষমতাসীনদের অযাচিত হস্তক্ষেপ ব্যাপকভাবে সংশ্লিষ্ট। এ অভিযোগ আমরা অতীতে বহুবার শুনেছি। এ অভিযোগ যে ভিত্তিহীন নয়, তা-ও আমাদের জানা। এ কারণে প্রতিটি সরকারের আমলেই ঋণখেলাপি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করা যায়নি। আমরা আশা করব, নতুন অর্থমন্ত্রী এবার ঋণখেলাপি অবসানের বিভিন্ন পদক্ষেপে সে উপসর্গের বিষয়টি সচেতনভাবে মনে রাখবেন। নতুবা তার এই অভিযান আগের মতোই ব্যর্থ হতে বাধ্য। ঋণখেলাপি সমস্যাকে আর্থিক খাতের একটি বড় মাপের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করলেই এ সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হবে। দেশের সচেতন মানুষ তেমনটিই চায়। বস্তুত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে অগ্রণী ব্যাংকের উদ্যোগটি একটি ভালো পদক্ষেপ হতে পারে। জানা গেছে, এ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন বড় খেলাপি কানাডায় সপরিবারে অবস্থান করছেন। বিদেশে পলাতক এই ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ঋণের টাকা আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকাস্থ কানাডার হাইকমিশনে চিঠি দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। উল্লেখ্য, গবেষণায় দেখা গেছে, খেলাপি ঋণের অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, খেলাপি ঋণ আদায়ে অন্যান্য ব্যাংকেরও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককেই সবার আগে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

