আমাদের আশার ক্ষেত্রটিকে আরও উর্বর করবে পদ্মা সেতু

আমাদের আশার ক্ষেত্রটিকে আরও উর্বর করবে পদ্মা সেতু

অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান । রবিবার, ২৬ জুন ২০২২ । আপডেট ১৩:৫৫

এক সাগর রক্ত পেরিয়ে বাঙালি বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় উদযাপন করেছিল। তখনো আমাদের বিজয় অসমাপ্ত। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই তা পূর্ণতা পায় বন্দিদশা থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে পা ফেলার পর। ১৯৭২ সালের দশই জানুয়ারি দেশে ফেরার পর তিনি প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের অঙ্গিকার করেছিলেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সংগ্রামী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।

মনে রাখা চাই, তখন তার রিজার্ভে এক ডলারও নেই। কোটি শরণার্থী পুনর্বাসনের অপেক্ষায়। সড়ক, রেল, সেতু, বন্দর, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত। কোথাও ফেরি নেই। আশি শতাংশ মানুষ গরিব। খাদ্যাভাব তীব্র। এমনি বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতেও তিনি মানুষের অফুরান প্রাণশক্তির ওপর ভরসা করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলার ডাক দিয়েছিলেন।

প্রতিকূল পরিবেশে বড় আশা করার এই যে শিক্ষা তিনি জাতিকে দিয়ে গেছেন সেটিই সবচেয়ে বড় পুঁজি হিসেবে আজও আমাদের চলার পথে সবচেয়ে বড় পাথেয় হিসেবে কাজ করছে। সেই আশার ভিত্তি ও ক্ষেত্র বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়ে গেছেন। তার সেই আশাবাদী নেতৃত্বের পরম্পরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মাঝেও সম্প্রসারিত হতে পেরেছে বলেই আজকের বাংলাদেশ এতটা সাহসী এবং সফল হতে পেরেছে।

শুধু পদ্মা সেতু নয় আরও অনেকগুলো মেগা-প্রকল্প এখন দৃশ্যমান। বিশেষ করে মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, বঙ্গবন্ধু শিল্প পার্কের মতো প্রকল্পগুলোও এখন চারদিকে আলো ছড়াচ্ছে। এসব চালু হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির পুরো চেহারাই বদলে যাবে। বড় আশা নিয়ে বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রথম পরীক্ষা বঙ্গবন্ধুকন্যা পদ্মা সেতুর মতো চ্যালেঞ্জিং মেগা-প্রকল্প স্বদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই শুরু করেছিলেন। আমাজনের পর সবচেয়ে খরস্রোতা পদ্মা সেতুর বুক চিরে ১২৮ মিটারের বিশ্বের গভীরতম পিলার গাড়া খুব সহজ কাজ ছিল না। এর জন্য বিশেষ হ্যামার জার্মানি থেকে ‘কাস্টমাইজ’ করে সংগ্রহ করতে হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের কারণে সেতু নির্মাণের সময় খানিকটা বেশি লাগতেই পারে। আশেপাশের জনগণ সর্বদাই দেখেছেন বাস্তবায়নকারী অংশীজনেরা কি নিষ্ঠার সাথে দিনরাত কাজ করেছেন।

পদ্মা সেতু শুধু দক্ষিণ বাংলার একুশ জেলাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার সাথে যুক্ত করবে তাই নয়, ট্রান্স-এশীয় হাইওয়ে ও রেলওয়ের সাথে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনকেও সমৃদ্ধ করবে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য সংযোগ বাড়বে। আর দক্ষিণ বাংলার কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন ও ডিজিটাল সেবায় বিপ্লব ঘটাবে। আগে পণ্যবাহী যে ট্রাকগুলো দিনের পর দিন মাওয়া-জাজিয়া ঘাটে অপেক্ষা করত তা নিমিষেই পারি দেবে। পচনশীল কৃষি পণ্যের দ্রুত পরিবহনের সুফল দক্ষিণ বাংলার কৃষক ও ঢাকার ভোক্তারা পাবেন। দক্ষিণ বাংলায় এসএমই ও বড় শিল্প গড়ে উঠবে।

বিসিক জানিয়েছে, এরই মধ্যে বরিশালে প্রায় হাজার খানিক ছোট ও মাঝারি শিল্প ইউনিট স্থাপনের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। সেখানে জমির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। হাইওয়ের দু’পাশে জমির দাম তিনগুণের বেশি হয়ে গেছে। সেতুর ওপারে চরে রিসোর্ট হতে যাচ্ছে। সরকারের উদ্যোগে বিরাট কনভেনশন সেন্টার, বিমানবন্দর ও অন্যান্য স্থাপনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। খুলনা ও বরিশালে জাহাজ শিল্প ছাড়াও পর্যটন শিল্প প্রসারের বিরাট সুযোগ তৈরি হবে। কুয়াকাটা এরই মধ্যে নুতন রূপে সাজতে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু সমাধিস্থল, ষাট গম্বুজ মসজিদ, সুন্দরবন, নড়াইলের সুলতান আর্ট কেন্দ্র ঢাকার ও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য দিন গুনছে।

দক্ষিণ বাংলায় আরও বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপিত হবে। সেতুর ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইন্টারনেটে পাইপলাইন যাবে। ফলে অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি সুলভে ডিজিটাল সেবাভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং-এর প্রসার এবং হাইটেক পার্কের প্রসার ঘটবে। এরই মধ্যে যশোরে হাইটেক পার্ক চালু হয়ে গেছে। মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে রেলে বা গাড়িতে কলকাতা পৌঁছে যাওয়া যাবে।

নেপাল, ভুটান ও ইন্ডিয়া সাথে পায়রা ও মংলা বন্দরের সেবা এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগের সুযোগে আঞ্চলিক বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ বাংলার জিডিপি ৩.৫ শতাংশ হারে বাড়বে। আর জাতীয় জিডিপি বাড়বে ১.২৬ শতাংশ হারে। রেল চালু হলে আরও এক শতাংশ। বছরে দুই লাখের মতো তরুণের কর্মসংস্থান হবে। এই এলাকার দারিদ্র্য কমবে ১.০১ শতাংশ হারে। দেশের দারিদ্র্য কমবে বাড়তি ০.৮৪ শতাংশ হারে। সব মিলে এক বিশাল অর্থনৈতিক উল্লম্ফনের অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ। আমরা জয়ধ্বনি করি স্বদেশি উন্নয়নের এই সাফল্যে। রবীন্দ্রনাথ তার ‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘আশা করিবার অধিকারই মানুষের শক্তিকে প্রবল করিয়া তোলে। আশা করিবার ক্ষেত্র বড় হলেই মানুষের শক্তিও বড় হইয়া বাড়িয়া ওঠে। কোনো সমাজ সকলের চেয়ে বড় জিনিস যাহা মানুষকে দিতে পারে তাহা সকলের চেয়ে বড় আশা।’ পদ্মা সেতু আমাদের সেই ‘বড় আশা’ করার ক্ষেত্রটিকে আরও উর্বর করে তুলবে।

লেখক: সাবেক গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading