গর্ভপাত নিয়ে আমেরিকার আদালতের রায়: নারীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে

গর্ভপাত নিয়ে আমেরিকার আদালতের রায়: নারীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে
উত্তরদক্ষিণ । ২৭ জুন ২০২২

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৭ জুন ২০২২ । আপডেট ১১:২৫

গর্ভপাত নারীর নিজস্ব অধিকার। গর্ভধারণ করা নারীই এই সিদ্ধান্ত নেবে। এই গর্ভপাত ইস্যু নিয়েই এখন গোটা আমেরিকা উত্তাল। প্রায় ৫০ বছর আগে ‘রো বনাম ওয়েড’ মামলার রায়ের কারণে এতদিন দেশটির নারীরা গর্ভধারণের ৬ মাস পর্যন্ত তুলনামূলক সহজেই গর্ভপাত করতে পারতেন। কিন্তু গত শুক্রবার দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ওই রায় পাল্টে দিয়েছেন। এমন সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলবে বিশ্বের বহু দেশে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির

গর্ভপাতের অধিকার দেয়া প্রায় পাঁচ দশকের একটি পুরোনো আইন গত শুক্রবার বাতিল করে দিয়েছেন আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট। এ পরিস্থিতিতে দেশটির বেশ কিছু রাজ্যে ইতোমধ্যে গর্ভপাত করানোর ক্লিনিক বন্ধ হওয়া শুরু হয়েছে। এ আদেশের প্রতিক্রিয়ায় দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, এতে তিনি স্তম্ভিত। আমেরিকার জন্য দিনটিকে এক দুঃখের দিন হিসেবেই আখ্যায়িত করেন তিনি। বাইডেন আরও বলেছেন, দেশ এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপজ্জনক পথে পা রাখল। এদিকে, মার্কিন নারীদের গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার হারানোর এমন ঘটনা বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই একে নারীর অধিকারের ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখছেন, আমেরিকা বিশ্বের অনেক দেশের কাছে ‘মডেল’ হওয়ায় এখন অন্যান্য দেশেও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে বলে কেউ কেউ আশঙ্কাও করছেন। আমেরিকার বেশকিছু রাজ্য বলছে, সর্বোচ্চ আদালত কেড়ে নিলেও তারা নারীর গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষেই থাকবেন। এ সুবিধা থাকলে অন্য রাজ্যের তুলনামূলক ধনী নারীরা চাইলেই যেসব রাজ্যে গর্ভপাত বৈধ সেখানে যেতে পারলেও দরিদ্ররা বিপাকে পড়বেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

‘রো বনাম ওয়েড’ কী: ১৯৬৯ সালে ২৫ বছরের নরমা ম্যাককরভি নামের এক নারী, যার ছদ্মনাম ছিল ‘জ্যান রো’, টেক্সাসে গর্ভপাত নিষিদ্ধ আইনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। টেক্সাসে তখন গর্ভপাত অসাংবিধানিক বলে নিষিদ্ধ ছিল। কেবলমাত্র মায়ের জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরি হলে গর্ভপাতের অনুমোদন ছিল। গর্ভপাত নিষিদ্ধ আইনের পক্ষে সে সময় লড়েছিলেন ডালাস কাউন্টির জেলা এটর্নি হেনরি ওয়েড। সেই থেকেই রো এর মামলাটির নাম হয় ‘রো বনাম ওয়েড’। রো তার তৃতীয় সন্তান হওয়ার সময় গর্ভপাতের অধিকার চেয়ে ওই মামলা করেছিলেন। তার দাবি ছিল, তিনি ধর্ষিত হয়েছেন। কিন্তু সেই মামলা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং রো সন্তান জš§ দিতে বাধ্য হন। ১৯৭৩ সালে রো আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টে আপীল করেন। সেখানে তার মামলার সঙ্গে ২০ বছর বয়সী এক জর্জিয়ান নারীর মামলারও শুনানি হয়। তারা যুক্তি দেখিয়ে বলেছিলেন, টেক্সাসের গর্ভপাত আইন আমেরিকার সংবিধান পরিপন্থি। কারণ, এতে একজন নারীর ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। আদালতের বিচারপতিরা তখন ঐতিহাসিক রায় দিয়ে বলেছিল, সরকারের গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা নেই। আর একজন নারীর গর্ভপাতের অধিকার সংবিধানে সুরক্ষিত আছে। আদালতের ওই সিদ্ধান্তের ফলে গর্ভধারণের পর থেকে ত্রৈমাসিক হিসাবে নারীদের গর্ভপাতের ওপর কড়াকড়ি আরোপ এবং তা নিষিদ্ধের ব্যবস্থা চালু হয়। গর্ভধারণের প্রথম তিনমাসে আমেরিকার নারীদের গর্ভপাতের অধিকার পুরোপুরিভাবে থাকা। পরের তিনমাসে গর্ভপাত করাতে গেলে সরকারি কিছু নিয়মবিধির আওতায় পড়া। আর শেষ তিনমাসে ভ্রুণ আরও পরিণত অবস্থায় চলে যাওয়ার কারণে গর্ভপাতে কড়াকড়ি কিংবা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া।

আদালতের বাইরে রো বনাম ওয়েড মামলার বাদী নরমা ম্যাককর্ভি, ১৯৮৯ সালের ছবি

প্রভাব পড়তে পারে ইতালিতেও: ১৯৭৮ সালে ইতালিতে ‘ল ১৯৪’ পাস হলে গর্ভপাত বৈধ হয়। গর্ভপাত ইস্যুটি আমেরিকার মতো ইতালিতে এতটা গুরুত্ব না পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাথলিক গির্জাসংশ্লিষ্ট কট্টর-ডানপন্থি কিছু গোষ্ঠী বিষয়টি সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সে কারণে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে ইতালিকেও নড়েচড়ে বসতে হচ্ছে। দেশটির বাম ও মধ্যপন্থি ঘরানার রাজনীতিকরা সমস্বরে মার্কিন আদালতের আদেশের নিন্দা জানাচ্ছেন। বামপন্থি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমা বনিনো বলছেন, ইতালিও যে পেছন পানে হাঁটা শুরু করতে পারে এবং ‘স্থায়ী মনে হওয়া অনেক অর্জনই যে হাতছাড়া হতে পারে’ আমেরিকার আদালতের সিদ্ধান্ত তাই দেখাচ্ছে। কট্টর ডানপন্থি লেগা নর্দের সিমন পিলন বলছেন, ‘অসাধারণ বিজয়’। তার চাওয়া, ইতালি ও ইউরোপও এখন আমেরিকার পথ অনুসরণ করুক। তবে তার দলের নেতা মাতিও সালভিনি, যিনি আরও গোঁড়া রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত, তার সুর অন্যরকম। জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেও গর্ভপাতের ক্ষেত্রে শেষ কথা নারীদেরই থাকা উচিত,বলেছেন তিনি। এ কারণে শিগগিরই ইতালিতে গর্ভপাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসার সম্ভাবনা কম মনে হলেও ‘ল ১৯৪’ তে চিকিৎসকদের গর্ভপাতে আপত্তি জানানোর অধিকার দেওয়া রয়েছে। আর এ অধিকারকে কাজে লাগিয়ে দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ, কোথাও কোথাও ৯০ শতাংশ চিকিৎসকই এখন গর্ভপাতে আপত্তি জানাচ্ছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা।

উদ্বেগ প্রকাশ করছে আইরিশরা: আয়ারল্যান্ডে ক’বছর আগেই গর্ভপাত বৈধতা পেয়েছিল। আমেরিকার এমন সিদ্ধান্তে তাই উদ্বেগ প্রকাশ করছে আইরিশরা। তারা ২০১৮ সালে গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষে আইরিশ জনগণের দেয়া গণরায়ের স্মৃতি শেয়ার করছেন, অনেকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন এক ইন্ডিয়ান নারী সবিতা হলপ্পনবারের করুণ মৃত্যুর কথাও। অনেকে এখন আগামী দিনে আমেরিকার পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, দেশটিকে এখন হয়তো সবিতার মতো অসংখ্য ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে। কেবল আয়ারল্যান্ডেই নয়, প্রতিবেশী নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের অনেকেও আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে হতাশ। ‘লজ্জাজনক সিদ্ধান্ত,’ বলেছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গ্রেইনি টাগার্ট, যিনি নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে গর্ভপাতের অধিকারের সমর্থনে লড়াই করেছেন। মুদ্রার অন্য পিঠও আছে।

লাতিন আমেরিকার রক্ষণশীলদের উৎসাহিত করার রায়: সাম্প্রতিক সময়ে গর্ভপাত নিয়ে আগের কট্টর অবস্থান থেকে খানিকটা সরতে দেখা যাচ্ছিল লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে, কিন্তু আমেরিকার আদালতে ‘রো বনাম ওয়েড’ মামলার রায় উল্টে যাওয়ায় পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতির আশঙ্কা করছেন অধিকার কর্মীরা। সালভাদরে গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া মারিয়ান মোইসা বলেছেন, আমাদের দেশের যে রক্ষণশীলরা নারীর অধিকার দিতে নারাজ তারা এই আদেশে উৎসাহিত হবে। মধ্য আমেরিকার এ দেশটিতে গর্ভপাত পুরোপুরি নিষিদ্ধ; ধর্ষণ বা নারীর জীবন বিপন্ন হলেও সেখানে গর্ভপাত করানো যায় না।এল সালভাদরের পার্লামেন্টের যে সদস্যরা গর্ভপাতবিরোধী তারা আমেরিকার আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে বেশিরভাগ মানুষ যে গর্ভপাতের বিরোধী সেই কথাই জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করছেন তারা।

কানাডা বলছে ‘নারীর জন্য ভয়ানক’: কানাডা সাধারণত তার প্রতিবেশী এবং সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপরে নাক গলায় না। কিন্তু শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘রো বনাম ওয়েড’ মামলার রায় পাল্টে দেওয়ার পর জাস্টিন ট্রুডো চুপ করে থাকতে পারেননি। তিনি আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে ‘ভয়াবহ ধাক্কা’ ও ‘নারীর জন্য ভয়ানক’ বলে অভিহিত করেছেন। সত্যি কথা বলতে, এটি প্রত্যেকের স্বাধীনতা ও অধিকারের ওপর আঘাত, রুয়ান্ডায় কমনওয়েলথ সম্মেলনে বলেন কানাডার এ প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮৩ সাল থেকে বৈধ হলেও কানাডায় গর্ভপাতের সুযোগ সুবিধা তেমন নেই। দেশটির একটি প্রদেশ নিউ ব্রুনসউইকে কোনো গর্ভপাত ক্লিনিক নেই; অনেক এলাকার নারীদের গর্ভপাত করাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে নির্ধারিত হাসপাতালে যাওয়া লাগে। কানাডায় গর্ভপাতবিরোধীর সংখ্যাও কম নয়, তবে এই ইস্যুটি আমেরিকার মতো এত গুরুত্ব পায় না।

উত্তরদক্ষিণ । ২৭ জুন ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

প্রসঙ্গত, আমেরিকার ১৩টি অঙ্গরাজ্য আগে থেকেই গর্ভপাতকে অপরাধ হিসাবে গণ্য করতে আইন ও সংবিধান সংশোধনের মতো পদক্ষেপ নিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের শুক্রবারের আদেশের ফলে সেগুলো অটোমেটিক কার্যকর হয়ে যাবে। সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর কেন্টাকি, লুইজিয়ানা, আরকানসো, সাউথ ডাকোটা, মিসৌরি, ওকলাহোমা ও অ্যালাবামায় গর্ভপাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়ে গেছে। মিসিসিপি ও নর্থ ডাকোটায় এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে তাদের অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুমোদনের পর। উয়োমিংয়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে পাঁচ দিনের ভেতর; উটাহ-র নিষেধাজ্ঞা তাদের আইনপরিষদে স্বীকৃত হতে হবে। আইডাহো, টেনেসি ও টেক্সাসে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে ৩০ দিনের মধ্যে।
আরকানসোর লিটল রকে একটি গর্ভপাত ক্লিনিক সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনলাইনে আসার পরপরই রোগীরা যেখানে থাকে সেখানকার দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়। সেখানকার কর্মীরা ফোন করে বিভিন্ন নারীদেরকে তাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল হয়েছে বলেও জানায়। লুইজিয়ানায় যে তিনটি প্রতিষ্ঠানে গর্ভপাতের সেবা মেলে তার একটি নিউ অরলিন্সের উইমেনস হেলথ কেয়ার সেন্টার সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পরপরই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; কর্মীদেরও তৎক্ষণাৎ বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading