সক্ষমতার প্রতীক পদ্মা সেতু
সরদার সিরাজ । সোমবার, ২৭ জুন ২০২২ । আপডেট ১৩:১০
নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর উদ্বোধন হয়ে গেছ। এই সেতু নির্মাণের ফলে দেশের অবহেলিত ও দারিদ্রপীড়িত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের উন্নতির নব দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। মানুষ ও পণ্য চলাচলের ব্যাপক সুবিধা হয়েছে। আর লাইন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। ফেরি পার হতে কয়েক ঘণ্টা লাগবে না। এখন ৬ মিনিটেই পার হওয়া যাবে পদ্মা। এডিবির সমীক্ষা রিপোর্ট মতে, ২০২২ সালে পদ্মাসেতু দিয়ে প্রতিদিন যানবাহন চলাচল করবে প্রায় ২৪ হাজার। সংখ্যাটি প্রতিবছর বৃদ্ধি পেয়ে ২০৫০ সালে দাঁড়াবে প্রায় ৬৭ হাজার। এতে ২১ জেলায় যেতে বাসের ক্ষেত্রে গড়ে দুই ঘণ্টা এবং ট্রাকের ক্ষেত্রে ১০ ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে। জাইকার সমীক্ষা অনুসারে, পদ্মাসেতুতে ইকোনমিক রেট অব রিটার্ন হবে বছরে ১৮-২২%, যা পরবর্তী সময়ে বাড়তে পারে।
তথ্য মতে, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক খরস্রোতা নদী পদ্মা। তাতে সেতু নির্মাণের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হওয়ায় সমগ্র অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন হবে। ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, বীমা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেতুর দুইপাশে গড়ে তোলা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক। তাতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বছরে দুই লাখ মানুষের নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। আর দশ বছর পর এ সংখ্যা তিনগুণ হবে বলে এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে। অপরদিকে, পদ্মাসেতুর কারণে মংলা বন্দর, পায়রা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরেরও পণ্য আনা-নেওয়া সহজতর হবে, যার প্রভাব পড়বে সমগ্র দেশের উন্নতিতে। ফলে মোট জিডিপির পরিমাণ ১.২৩% বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। কলকাতা থেকে ঢাকার দূরত্ব দেড়শ’ কিলোমিটার কমছে! আগে কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছতে ৪০০ কিলোমিটার রাস্তা পেরোতে হতো। জুন মাসের শেষদিকে ২৫০ কিলোমিটার গেলেই চলবে। তাতে সময় লাগবে বড়জোর ৬-৬.৫ ঘণ্টা। এখন কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস কলকাতা স্টেশন থেকে নদীয়া পেরিয়ে যায় গেদে। সেখান থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত স্টেশন দর্শনা পার করে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে পৌঁছায় ১০ ঘণ্টায়। আর পদ্মাসেতুর রেললাইন ধরে ঢাকা পৌঁছাতে হলে কলকাতা থেকে বনগাঁ জংশন হয়ে হরিদাসপুর সীমান্ত দিয়ে বেনিয়াপোল, যশোর, নড়াইল, ফরিদপুরের ভাঙ্গা হয়ে শুধু ২৫১ কিলোমিটার পথ যেতে হবে।
পদ্মাসেতুর (মূল সেতু) দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার ও প্রস্থ ১৮.১০ মিটার। দুই প্রান্তের উড়াল পথ (ভায়াডাক্ট) ৩.৬৮ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য ৯.৮৩ কিলোমিটার। পদ্মাসেতুটি দোতলা। এর একতলায় চলবে ট্রেন। সামান্য উপরে চার লেনের চওড়া রাস্তায় চলবে সব রকম গাড়ি। রেল ব্রিজ থেকে পানির দূরত্ব থাকবে অন্তত ১৮ মিটারের। পানির স্তর বাড়লেও ব্রিজের তলা দিয়ে পাঁচতলা সমান জাহাজের যাতায়াতে অসুবিধা হবে না। এই সেতুতে রয়েছে ৪১টি পিলার । প্রত্যেকটিই তৈরি হয়েছে মজবুত পাইল ইস্পাত দিয়ে। পানির নিচে ১২২ মিটার পর্যন্ত গভীরে গেছে এ পিলারের ভিত। উপরন্তু পদ্মাসেতুর ভূমিকম্প প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’ প্রায় ১০ হাজার টন, যা রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পেও অনায়াসে টিকে যাবে। উদ্বোধনের পরের দিন সকাল থেকে যান চলাচল শুরু হলেও রেল পথ চালু হবে না। শত বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে নিজস্ব অর্থে দেশের বৃহৎ, ব্যয়বহুল ও বহুমুখী পদ্মাসেতু নির্মাণ করায় দেশ ও জাতির মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেতুটি গৌরবের ও সক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। জাতির মধ্যে এ আশা সঞ্চারিত হয়েছে যে, আমরা উদ্যোগ নিলে, আন্তরিক হলে ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করলে যে কোনো বড় ও কঠিন কাজ করতে সক্ষম।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

