পদ্মা সেতুতে এসব কী হচ্ছে
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২ । আপডেট ১১:২০
স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে এখন চলছে যানবাহন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ নিজেদের সবচেয়ে সেরা সময়টা এখন পার করছে। কিন্তুপদ্মা সেতু ঘিরে বেশ ক’টি অপ্রীতিকর ঘটনা নতুন করে আলোচনার জš§ দিলো। যার মধ্যে অন্যতম হলো পদ্মা সেতুর নাট-বল্টু খুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা। ইতিমধ্যে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এই ধরণের কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে কী লুকিয়ে আছে তা বের করে নিয়ে আসতে হবে। অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কেননা, পদ্মা সেতু প্রশ্নে কোন ছাড় নয়। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস
স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ও মেগা প্রকল্প আমাদের পদ্মা সেতু। এই সেতু শুধু ইস্পাতের ইমারত নয়, এ সেতু প্রতিটি বাংলাদেশির আবেগ, অহংকার ও মর্যাদার প্রতিক। এই সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি গল্প, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ২৫ জুন বিশ্ববাসীকে বিস্ময় জাগিয়ে উদ্বোধন করা হয় দেশের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত এই স্থাপনা। উদ্বোধনের পরদিন (২৬ জুন) যানচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয় পদ্মা সেতু। কিন্তু ওইদিনই নানা ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ সেতু কর্তৃপক্ষের নিয়ম-কানুন না মেনে সেতুতে অবস্থান নেয়া শুরু করে, ছবি তোলা, ভিডিও করা সহ নানা ধরণের কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। তবে, সবকিছু ছাপিয়ে যায় পদ্মা সেতুর নাট-বল্টু খুলে দেশের এত বড় স্থাপনা নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ভিডিও প্রকাশ করে এক যুবক। পরবর্তীতে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে সে। প্রশ্ন হলো এত বড় স্থাপনার নাট-বল্টু কী হাত দিয়েই খুলে ফেলা সম্ভব? কর্তৃপক্ষ বলছে মোটেও না।

এমন অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে: এই ধরণের রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধকে মোটেও সাধারণ ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়া যাবে না। এই ধরণের কর্মকাণ্ড ঘটানোর নেপথ্যে কী বিশেষ কোন পরিকল্পনা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। জাতির এত বড় এক ইস্যুতে কোনো ভাবেই এই ঘৃণিত কাজকে তুচ্ছ করে দেখআর সুযোগ নেই। এর পেছনে কি কি রয়েছে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তুলে নিয়ে জাতির সামনে প্রকাশ করতে হবে। ইতোমধ্যেই ৭ দিনের রিমাণ্ডে সেই ‘অপরাধী’। আর তার অপরাধ প্রমাণিত হলে এমন শাস্তি দিতে হবে যেন ভবিষ্যতে কারো এই ধরণের রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করার সাহস না হয়। সিআইডি বলছে, অপরাধীরা অপরাধ করার পর যেসব কর্মকাø করে এই যুবকও তাই করেছে। তার গিল্টি মাইন্ড রয়েছে।সোমবার (২৭ জুন) দুপুরে সিআইডি সদর দফতরে পুলিশ সুপার রেজাউল মাসুদ এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান। পদ্মা সেতুতে দাঁড়ানো বা ছবি তোলা নিষিদ্ধ হলেও প্রথম দিনে (২৬ জুন) শিথিলতার সুযোগে বায়েজিদ তালহা নামের এক যুবক পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের দুটি নাট-বল্টু খুলে ফেলেন। সেটার চিত্র মোবাইল ফোনে ধারণ করে নিজেই তার টিকটক আইডিতে শেয়ারও করে। পরে তাকে আটক করে সিআইডি। আটক বায়েজিদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে। সিআইডি মামলাটির তদন্ত করবে বলেও জানান পুলিশ সুপার রেজাউল মাসুদ। রেজাউল মাসুদ ওই যুবকের পরিচয় তুলে ধরে বলেন, গ্রেফতার যুবকের নাম বায়েজিদ তালহা। তার বাড়ি পটুয়াখালীতে। বর্তমানে ঢাকার শান্তিনগরে থাকে। তার টিকটক আইডি প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, সে নাট-বল্টু খুলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে মন্তব্য করছে। আমরা তাকে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় শান্তিনগর এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছি। সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, তার অতীত অপরাধ-কর্মকাণ্ডসহ সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সবকিছু তদন্ত করা হবে।’

কী আছে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫ ধারায়: বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫ ধারায় ‘অন্তর্ঘাতমূলক’ (স্যাবোটাজ) কর্মকাøের ব্যাখ্যা ও শাস্তির উল্লেখ রয়েছে। এই আইনের ১৫(খ) ধারায় বলা হয়, কোনো রেলপথ, রোপওয়ে, রাস্তা, খাল, সেতু, কালভার্ট, বন্দর, ডকইয়ার্ড, লাইটহাউস, বিমানবন্দর, টেলিগ্রাফ বা টেলিফোনের লাইন অথবা টেলিভিশন বা বেতার স্থাপনার দক্ষতা বিনষ্ট বা ক্ষতিসাধনের মতো কাজ করা যাবে না। এ ধরনের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ ছাড়া যাবজ্জীবন বা ১৪ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে আইনে।
হাত দিয়ে নাট-বল্টু খোলা অসম্ভব : এই নাট-বল্টু কোনোভাবেই হাত দিয়ে খোলার কথা নয় উল্লেখ করে রেজাউল মাসুদ বলেন, এটি অবশ্যই কোনও ইনস্ট্রুমেন্ট (যন্ত্র) ব্যবহার করে খোলা হয়েছে, তাদের কোনও পরিকল্পনা আছে। তবে আমরা এখনই এ বিষয়ে বলতে পারবো না। তদন্ত করেই সবকিছু জানানো হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থাপনা পদ্মা সেতু। তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বড় ধরনের কোনও দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। সেতুতে কোনও ঘটনা ঘটলে তার উচিৎ ছিল সেতু কর্তৃপক্ষ বা ওখানে থাকা পুলিশকে জানানো। কিন্তু সে সেটা করেনি। এটা অনেক বড় অপরাধ।
পদ্মা সেতু নিয়ে যড়যন্ত্রকারীরা জাতি ও দেশের শত্রু: হাইকোর্ট
পদ্মা সেতু নিয়ে বিরোধিতাকারীদের খুঁজে বের করতে হবে বলে অভিমত প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেছেন পদ্মা সেতু নিয়ে যড়যন্ত্রকারীরা জাতি ও দেশের শত্রু, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এ ছাড়া ষড়যন্ত্র না থাকলে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ কেন হলো এমন প্রশ্নও রেখেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার (২৭ জুন) এ মন্তব্য করেন। উচ্চআদালত বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটি আমাদের অহংকার। এ ধরনের জাতীয় স্বার্থ ও উন্নয়নের বিরুদ্ধে যারা থাকে, তারা জাতির শত্রু, দেশের শত্রু। তাদের চিহ্নিত করা দরকার।
একই সঙ্গে পদ্মা সেতু নির্মাণ চুক্তি নিয়ে দুর্নীতির মিথ্যা গল্প সৃষ্টির নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করতে কমিশন গঠন প্রশ্নে জারি করা রুলের আদেশের জন্য আজ মঙ্গলবার (২৮ জুন) দিন ধার্য করেন আদালত। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক।এর আগে গত রবিবার (২৬ জুন) পদ্মা সেতু নির্মাণ চুক্তি নিয়ে দুর্নীতির মিথ্যা গল্প সৃষ্টির নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করতে কমিশন গঠন প্রশ্নে জারি করা রুল শুনানির জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পদ্মা সেতু নির্মাণ চুক্তি এবং দুর্নীতির মিথ্যা গল্প সৃষ্টির নেপথ্যে প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিশন গঠন করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং দোষীদের কেন বিচারের মুখোমুখি করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। মন্ত্রিপরিষদ, স্বরাষ্ট্র, আইন ও যোগাযোগ সচিব এবং দুদকের চেয়ারম্যানকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘ইউনূসের বিচার দাবি : আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো একাট্টা’ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদের কথা নজরে নিয়ে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।
রাষ্ট্রের ভাবমূতি তে আঘাত পড়েছে: এই ঘটনায় ওই যুবক তিনটি অপরাধ করেছে উল্লেখ করে বলেন, সে মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে এবং অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করেছে। এখানে তার একটি গিল্টি মাইন্ড আছে। এটা অপরাধ। ঘটনার সময় তার সঙ্গে আরও একজন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের কাছে অনেক তথ্য আসছে, এখন পর্যন্ত আমরা দুজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। হয়তো আরও সম্পৃক্ততা আসতে পারে। তাই আমরা এখনই নির্দিষ্ট করে বলতে পারি না কতজন জড়িত। ভিডিওটি আপলোড হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে আমাদের মনিটরিংয়ে চলে আসে। আমরা এসব মনিটরিং করছি।
রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে অপরাধই গুরুত্বপূর্ণ: এক প্রশ্নের জবাবে সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, অনেক তথ্য আছে, তা সবসময় পাবলিকলি বলা যায় না। তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে এখনই মন্তব্য করা ঠিক না। অপরাধী এখন কী বলছে, তা বিবেচ্য বিষয় না। তার মোবাইলটি জব্দ করা হয়েছে। একজন অপরাধী অপরাধ করার পরে যা করে, সেই সব কাজ সে করেছে।তার কোনও রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে। কিন্তু আমরা তার অপরাধটাকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।
সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর: এদিকে, বায়েজিদ তালহার সাত দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার বিকেলে শরীয়তপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. সালেহুজ্জামান এই আদেশ দেন। আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সোমবার শরীয়তপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বায়েজিদ তালহাকে হাজির করে সাত দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক এই আদেশ দেন।

যাত্রীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান: পদ্মা সেতু পারাপারে যাত্রী সাধারণকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সোমবার (২৭ জুন) এক বিবৃতিতে মন্ত্রী এ আহ্বান জানান বলে সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়। মন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু অবকাঠামো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা এবং দেশের এক বড় সম্পদ। এর নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। বিবৃতিতে সেতু পারাপারে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ যেসব নির্দেশনা জারি করেছে, তা যথাযথভাবে পালন করে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যও তিনি আহ্বান জানান বলে তথ্যবিবরণীতে বলা হয়। পদ্মা সেতুতে সোমবার (২৭ জুন) ভোর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয় সেতু বিভাগ। তথ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিবরণীতে সেতু বিভাগ জানায়, ২৭ জুন ২০২২, সোমবার ভোর ৬টা থেকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার।
সেতুতে টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী: সাধারণ মানুষ যেন পদ্মা সেতুতে চলাচলের সময় নির্ধারিত আইন মেনে চলে, তা নিশ্চিত করতে সোমবার থেকে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপ করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিন সকাল থেকে সেতুতে মোটরসাইকেল প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। হেঁটেও উঠতে দেয়া হয়নি মানুষকে। কেউ যেন অনিয়ম না করে সেজন্য নিয়মিত টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী। যান চলাচল উন্মুক্তের দিন গত রবিবার (২৬ জুন) সেতুর ওপর যেমন চিত্র দেখা গেছে, সোমবার পরিস্থিতি তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। রবিবার বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়া ভিডিওতে সেতুর ওপর রাস্তার পাশে মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলেও সোমবার বলতে গেলে খালি ছিল রাস্তা। সোমবার সেতুর ওপর কোথাও কোথাও গাড়ি থামিয়ে মানুষজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাবাহিনীর টহল গাড়ি তাদের সরিয়ে দিচ্ছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
ইউডি/সুপ্ত

