মাইক টাইসন: জীবনের মোড় ঘুরিয়ে ছিনতাইকারী থেকে বিশ্বসেরা বক্সার
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:১৭
বক্সিং সম্রাট মাইক টাইসন শহর নিউইয়র্ক -এ জন্মগ্রহণ করেন। নিউইয়র্কের একটি ছোট্ট গলির গল্পকথা। সাধের পায়রা চুরি করার জন্য এগারো বছর বয়সী মাইক টাইসন একটা বড়োসড়ো চেহারার লোকের মুখে ঘুষি মেরে দিলেন। আচমকা এমন একটা ঘুষি খেয়ে অবাক হয়ে গেল সে। এগারো বছরের মাইক বুঝতে পারলেন, শুধু একটা ঘুষি আর তাতেই অর্থ উপার্জনের নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। এরপর থেকে মাইক টাইসন তাই করতে শুরু করলেন। এই ভাবে লোককে আঘাত করে অর্থ উপার্জন করতে লাগলেন মাইক টাইসন। বক্সিং সম্রাট মাইক টাইসনের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন সাইফুল অনিক।
সবকিছু রূপকথার গল্পের মতোই মনে হচ্ছিল মাইক টাইসনের। কিন্তু কী আশ্চর্য! তিনি কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে গেলেন। মনে হল, এই বক্সিং রিং এর মধ্যেই তার আসল জীবন লুকিয়ে আছে। এবার তাকে আরও ভালোভাবে অনুশীলন করতে হবে।
মাইক টাইসন কে?
মাইক টাইসন একজন পেশাদার বক্সিং খেলোয়াড়। ব্যক্তিজীবনে মাইক টাইসন বহু বিতর্ক-বিবাদে জড়িয়েছেন। বর্তমানে তিনি অবসর নিয়েছেন। তার জাতীয় ডাক নাম আয়রন মাইক।
মাইক টাইসনের জন্ম ও শিক্ষাজীবন
মাইক টাইসনের জন্ম আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের ব্রুকলিন অঞ্চলে ১৯৬৬ সালের ৩০ জুন। মাইক টাইসনের ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার এই অসামান্য বক্সারের ওজন ছিল ১০৮ কেজি। লোককে আঘাত করে অর্থ উপার্জন করতে লাগলেন মাইক টাইসন। এই ভাবেই মাইকের জীবন তখন ঘুরপাক খাচ্ছে এক অন্ধকার নরকের মধ্যে। যে কোনো সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হবে, এমন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত একদিন মাইক টাইসন ধরা পড়লেন পুলিশের হাতে। মাইককে পাঠানো হল কিশোরদের উদ্ধার আশ্রম ডাইরার স্কুলে। সেখানকার শান্ত পরিবেশের সাথে মাইক নিজেকে মানাতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ওই স্কুল থেকে ছাড়া পেলেন মাইক। এখন যাবেন কোথায়? আবার হয়তো রাস্তায় নেমে ছিনতাই করতে হবে। আবার জেল, আবার বেরিয়ে আসা। এভাবেই এক অন্ধকার বৃত্তের মধ্যে কেটে যাবে মাইক টাইসনের জীবন।
ভগবান বোধহয় মাইক টাইসনের জন্য অন্য কিছু ভেবেছিলেন । মাইক টাইসন এর সঙ্গে অপ্রত্যাশিতভাবে কাস ডি আমাতোর দেখা হল। কাস ছিলেন বিখ্যাত বক্সিং কোচ। ফ্লয়েড প্যাটারসন নামে এক বিশ্ববিখ্যাত বক্সারকে তিনি উপহার দিয়েছেন। ফ্লয়েড হয়েছিলেন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ ‘চ্যাম্পিয়ান। মাইককে দেখে আমাতো বুঝতে পারলেন, এই ছেলেটির মধ্যে অনন্ত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। এর চোখের দৃষ্টিতে কে যেন লাসের রশ্মি ফিট করে দিয়েছে। একজন বক্সারের সব থেকে বড়ো সম্পদ হল তার দুই চোখে৷ সে বুঝে যাবে বিপক্ষ বক্সার কখন কীভাবে পাঞ্চ করতে এগিয়ে আসবে, সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে তৈরি করবে সে।
মাইক টাইসনের কোচ
মাইক টাইসনের ঘাড়ের গঠনও ওই অভিজ্ঞ কোচকে অবাক করে দিয়েছিল। উনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিশ্ব হেভিওয়েট খেতাবের দায়িত্ব একদিন এই ছেলেটির ঘাড়েই এসে পড়বে। মনে হয়, এই জন্যই ভগবান বোধহয় তাকে তৈরী করেছেন। কোচ আমাতো এই ভাবে রাস্তার এক ছিনতাইবাজের মধ্যে ভবিষ্যৎ বিশ্বচ্যাম্পিয়ানের ছায়া দেখতে পেলেন। মাইককে সোজা নিয়ে এলেন নিজের জিমনাসিয়ামে। তারপর বললেন— “না, ওই নোংরা গলিতে তুমি আর কখনো যাবে না। লোকের ঘাড়ে রড মেরে ছিনতাই করবে না। তোমার পৌরুষ দেখাবার আসল জায়গা হল বক্সিং এর এই রিং।” এর আগে মাইক টাইসনের কাছে এমন কথা কেউ কখনো বলেননি। টাইসন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন ওই কোচের মুখের দিকে। নিজেকে পরখ করলেন। মনে হল অন্ধকার রাত্রির অবসান ঘটে গেছে, হাজার সূর্যের আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠেছে প্রভাতের আলো।
মাইক টাইসনের বক্সিং ম্যাচ
মাইক টাইসনের কঠোর অনুশিক্ষনের ফল পাওয়া গেল। ১৯৮৫ সালের মার্চ মাস প্রথম পেশাদারী বক্সিং এ নামলেন, প্রথম রাউন্ডেই হেক্টার মারসেডেসকে নক আউট করে দিলেন। সেই বছর ১৫ টি লড়াইয়ের মধ্যে ১৩ টিতে জিতলেন। ১৯৮৬ সালে সব থেকে কম বয়সে বিশ্ববক্সিং কাউন্সিলের খেতাবের লড়াইতে জিতলেন দু’রাউন্ডে হারিয়ে দিলেন ডাকসাইটে বক্সার ট্রেভর বারবিককে।
মাইক টাইসনের বক্সিং ক্যারিয়ার
৫৪ বার পেশাদারী লড়াইতে অংশ নিয়ে ৪৯ বার জিতেছেন। ৪৩ বার নক আউটে। মাত্র তিনবার হারের তেতো জ্বালা হজম করতে হয়েছে তাকে। বক্সিং ইতিহাসে অন্যতম অঘটন হিসাবে মাইক টাইসনের সাথে একটা ঘটনা জড়িয়ে আছে। জেমস ডগলাসের কাছে দশম রাউন্ডে হেরে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হেভিওয়েট খেতাব হারিয়ে ছিলেন মাইক। মাইক টাইসন এক অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন যে, মহাত্মা গান্ধীর জীবন দর্শন তাকে প্রেরণা দিয়েছে। তাই মাঝে মধ্যে তিনি মাদাম তুসোর মোমের পুতুলের জাদুঘরে চলে যান। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকেন মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির সামনে। দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে আসে অশ্রুকণা। এভাবেই হয়তো অতীত জীবনের সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
ইউডি/অনিক

