যুদ্ধের বলয় ভেঙে বিশ্ববাসী শান্তি চায়
সুদিপা দেবনাথ। শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:৫০
রাশিয়ার সাথে সুদীর্ঘ সীমান্ত আছে স্কানডিনেভিয়ান দেশ ফিনল্যান্ডের। ইউরোপের সর্বোত্তর প্রান্তের একটি দেশ হিসেবে তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক মোর্চা ন্যাটো বা উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থার সদস্য হতে আবেদন জানিয়েছে। যদিও ফিনল্যান্ড এ মহাসাগর থেকে বহু দূরবর্তী এবং ন্যাটোর সদস্য হলে দেশটার নিরপেক্ষতা বলতে আর কিছু থাকবে না। তদুপরি এটা রাশিয়া বা মস্কোর তীব্র ক্ষোভের এক বড় কারণ। চার মাস আগে, বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে এই ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলে রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে সর্বাত্মক আগ্রাসন চালিয়ে যে যুদ্ধ বাধিয়েছেন, তা চলছে আজো এবং এর মাধ্যমে পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের বিরাট অংশ মস্কো দখল করে নিয়েছে। রাশিয়ার আগ্রাসনে ইউক্রেন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এমনিতেই প্রেক্ষাপটে ‘শান্তিবাদী’ হিসেবে অভিহিত রাষ্ট্র ফিনল্যান্ড (এবং তার প্রতিবেশী সুইডেনও) ন্যাটো জোটে শামিল হওয়ার আকুল আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছে। এখন রাশিয়ার মতো পরমাণু শক্তিধর বৃহৎ শক্তির সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত বলে ফিনল্যান্ড জানাল। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী প্রধান হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, যেকোনো ধরনের রুশ হামলার মোকাবেলায় আমরা তৈরি আছি। এজন্য গত কয়েক দশক ধরে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ‘তেমনি কিছু’ ঘটলে ফিনল্যান্ড তার জনগণকে নিয়ে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়বে বহিঃশক্তির বিরুদ্ধে। ফিনল্যান্ড ‘শান্তিবাদী’ হলে কী হবে, নিজ মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ অর্থ প্রতিরক্ষার জন্য খরচ করছে যা খোদ ন্যাটোভুক্ত বহু দেশের তুলনায় অধিক। তার সশস্ত্র বাহিনী প্রধান জেনারেল টিমো কিভিনেন বলেছেন, অস্ত্রের চেয়ে বড় হচ্ছে যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং দেশের স্বার্থে এ ক্ষেত্রে উদ্যমী হওয়া। উল্লেখ্য, ফিনল্যান্ডের বিশাল অস্ত্রাগার রয়েছে। রুশ সামরিক আগ্রাসনের মুখে লড়াই করতে কতটা তৈরি আছে ফিনল্যান্ড, সে ব্যাপারে এক সাক্ষাৎকারে কিভিনেন বলেছেন, ইউক্রেনে যেমন হামলা চলছে, তেমন লড়াই করতে আমরা বিশেষত আমাদের সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। অস্ত্রশস্ত্র, সাঁজোয়া বাহিনী আর আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে শক্তি বৃদ্ধি করেছি। ইউক্রেনের মতো ফিনল্যান্ডেরও রাশিয়াকে কঠিন প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে বৈকি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে ফিনল্যান্ড উঁচু দরের সমর প্রস্তুতি বহাল রেখেছে। গত শতকের চল্লিশের দশকের শিক্ষা তাদের কাছে অতীব গুরুত্ববহ। তখন রাশিয়া তার দশ ভাগের এক ভাগ ভূমি দখল করে নেয়। তাছাড়া, যুদ্ধে ১ লাখ নাগরিক নিহত হয় ফিনল্যান্ডের।
এখন অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রাগার তার আছে। ফিনল্যান্ড দেশটার ‘ক্রুইজ’ মিসাইল ৩৭০ কিলোমিটার দূরবর্তী টার্গেটেও হামলা চালাতে পারে। ইউক্রেনে রুশ হামলার পরই দেশটি ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে মহাযুদ্ধের পর থেকে তারা গত ৭৭ বছর ধরে জোট নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছেন ব্যাপক প্রতিরক্ষা সামর্থ্য সত্ত্বেও। অবশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে নিজ নিরাপত্তা ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কায় ন্যাটোতে শামিল হতে চাচ্ছে ফিনল্যান্ড। অপর দিকে, মস্কো তার প্রতিবেশী ফিনল্যান্ডের নতুন ভূমিকার আগেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছে, তারা ন্যাটোতে যোগ দিয়ে বড় ভুল করবে।
আমরা কোনো দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নয়, স্থায়ী শান্তি চাই। এটা বিশ্ববাসীর আন্তরিক অভিমত। যুদ্ধ নয়, কেবল শান্তিই দুনিয়ার কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। আমরা বিশ্বে কোন আগ্রাসন দেখতে চাই না, মানবতাকে পরাজিত হতে দেখতে চাই না। ইউক্রেন প্রশ্নে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ড ভলাদিমির পুতিন যুদ্ধের পথ এড়াতে পারতেন বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। আমরা মনে করি, যুদ্ধ কোন সমাধান নয়। ইরাক বা আফগানিস্তান যুদ্ধে কোন সমাধান মেলেনি।
আলোচনা শান্তির পথ দেখাতে পারে। ইউক্রেন আলোচনায় বসতে চাচ্ছে। তাদের এই আগ্রহকে সম্মান দেখানো জরুরি বলেই শান্তিকামী মানুষ মনে করে। কিয়েভের পতনের অপেক্ষায় না থেকে রাশিয়া যদি আলোচনার টেবিলে হাজির হয় তবে সেটাই সব পক্ষের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে। যুদ্ধ শুরু করেছে রাশিয়া। শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটিও তাকে শুরু করতে হবে। মানুষ যুদ্ধ চায় না, শান্তি চায়। রাশিয়াতেও যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। মানুষের শান্তির চিরন্তন আকাঙ্ক্ষাকে কোন পরাশক্তিই দমিয়ে রাখতে পারে না।
লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক
ইউডি/সুপ্ত

