ইন্ডিয়ার সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্য: নুপুর শর্মার জন্যই জ্বলছে ইন্ডিয়া
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:০০
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ইন্ডিয়ায় সৃষ্ট অশান্তির জন্য অভিযুক্ত বিজেপি নেত্রী নুপুর শর্মা একাই দায়ী বলে জানিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। বিতর্কিত ওই মন্তব্যের কারণে সারা দেশের কাছে তার ক্ষমা চাওয়া উচিত বলেও জানিয়েছে দেশটির শীর্ষ আদালত। শুক্রবার (১ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা। অবশ্য অভিযুক্ত নুপুর শর্মাকে আগেই দল থেকে বরখাস্ত করেছে বিজেপি। বিস্তারিত লিখেছেন মো. রুবেল
মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অপমানজনক মন্তব্যে উত্তেজনা উসকে দেওয়ার জন্য বিজেপির বহিষ্কৃত নারী মুখপাত্র নুপুর শর্মাকে দায়ী করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জে.বি. পারদিওয়ালার সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ মৌখিক পর্যালোচনায় বলেছে, তার উচিত পুরো দেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া। বিচারপতিরা বলেছেন, যেভাবে তিনি দেশজুড়ে মানুষের আবেগ উসকে দিয়েছেন, দেশে যা ঘটছে সেজন্য এককভাবে এই নারী দায়ী। খবর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার। গত মে মাসের শুরুতে একটি টেলিভিশন বিতর্কে নুপুর শর্মার অপমানজনক মন্তব্য ইন্ডিয়া ও বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় মুসলিম দেশে ক্ষোভের জন্ম দেয়। বেশ কয়েকটি আরব দেশ ইন্ডিয়ার কূটনীতিককে তলব করে কঠোর তিরস্কার জানায়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইন্ডিয়ার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছেন, (টিভি) বিতর্কের সময় কীভাবে তাকে উত্তেজিত করা হয়েছিল তা আমরা দেখেছি। কিন্তু তিনি যেভাবে বিতর্কিত এসব কথা বলেছেন এবং পরে বলেছেন যে, তিনি একজন আইনজীবী ছিলেন; তা লজ্জাজনক। পুরো দেশের কাছে তার ক্ষমা চাওয়া উচিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, সুপ্রিমকোর্টের এই মন্তব্য বর্হিবিশ্বে ইন্ডিয়ার ভাবমূর্তি উজÍল করবে।
এক নজরে নুপুর শর্মাকে নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের মন্তব্য : নুপুর শর্মার অবিবেচকের মতো মন্তব্যর কারনেই উদয়পুরে নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। তার মন্তব্য মানুষের আবেগ উসকে দেয়ার মতো। ক্ষমা চাইতেও দেরি করেছেন নুপুর। টেলিভিশনে গিয়ে গোটা দেশের কাছে ক্ষমা চান। নুপুরের মতো মানুষেরা অবিবেচকের মতো মন্তব্য করো হিংসায় উসকানি দেয়। ইন্ডিয়ায় যা কিছু অশান্তি হচ্ছে তার জন্য একমাত্র দায়ি নুপুর শর্মা। নুপুরের মন্তব্য গোটা ইন্ডিয়ায় আগুন জ্বালিয়েছে। নুপুরের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, নুপুরই নিরাপত্তার জন্য হুমকী হয়ে উঠেছেন। রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হওয়ার মানে এই নয় যে যা মুখে আসবে তা বলে দিলাম। ক্ষমতার দম্ভ নুপুর শর্মার মাথায় চড়েছে।

নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছেন নুপুর: নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সকল এফআইআর দিল্লিতে স্থানান্তর করার আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন নুপুর শর্মা। সেখানে তার আইনজীবী বলেন, নুপুরকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আইনজীবীর এই বক্তব্য শুনে বিচারপতি বলেন, তিনি হুমকির মুখে পড়ছেন, না কি তিনিই নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছেন! তিনি দেশে অশান্তির পরিবেশ তৈরি করেছেন। আজ গোটা দেশে যা হচ্ছে, তার পেছনে একা এই নারীই দায়ী। আদালত জানায়, নুপুর শর্মার মন্তব্য ছিল ‘শান্তিভঙ্গকারী’। বেঞ্চের পক্ষ থেকে তার আইনজীবী সিনিয়র অ্যাডভোকেট মানিন্দার সিংয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়, এই মন্তব্য করায় তার (নুপুর শর্মা) কাজ কী? মানিন্দার সিং আদালতকে জানান, তার মক্কেল ক্ষমা চেয়েছেন। তখন বিচারপতিদের বেঞ্চ সমালোচনা করে বলে, তার উচিত ছিল টেলিভিশনে হাজির হয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া। মন্তব্য প্রত্যাহারে তিনি অনেক দেরি করেছেন। সেই প্রত্যাহারও করেছেন শর্তসাপেক্ষে। তিনি বলেছেন, যদি অনুভূতিতে আঘাত লাগে। আদালত বলেছে, তার মন্তব্য ছিল উসকানির উদ্দেশ্যে। নুপুর শর্মার ‘সমান আচরণ’ ও ‘কোনও বৈষম্য না থাকার’ যুক্তিরও সমালোচনা করেছে আদালত। বিচারপতিরা বলেছেন, আপনি যখন অন্যদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেন তখন তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু যখন তা আপনার বিরুদ্ধে হয় তখন কেউ আপনাকে গ্রেফতারের সাহস করে না।
একগুঁয়ে ও অহংকারী নুপুর: ইন্ডিয়ার শীর্ষ আদালত বলেছেন, বিতর্কিত মন্তব্যের মাধ্যমে সবার সামনে নিজের একগুঁয়ে ও অহংকারী চরিত্র দেখিয়েছে নুপুর শর্মা। বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, যদি তিনি একটি দলের মুখপাত্র হন তাহলে কি হবে। তিনি (নুপুর) মনে করেন, তার পেছনে ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে এবং দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না রেখেই যেকোনো বক্তব্য তিনি দিতে পারেন। তার আইনজীবী দাবি করেন, টেলিভিশন বিতর্কের সময় উপস্থাপকের একটি প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন নুপুর শর্মা। তখন আদালত বলে, তাহলে ওই উপস্থাপকের বিরুদ্ধে একটি মামলা হওয়া উচিত’। আইনজীবী যখন নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকারের কথা তুলে ধরেন তখন বিচারপতিরা ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলেন, গণতন্ত্রে সবার কথা বলার অধিকার রয়েছে। গণতন্ত্রে ঘাসের বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে এবং গাধার অধিকার রয়েছে তা খেয়ে ফেলার।

উদয়পুরের ঘটনা উত্তেজনা বাড়াচ্ছে: উদয়পুরে দু’জন মুসলিম যুবকের হাতে একজন হিন্দু দর্জির নৃশংস হত্যার দু’দিন পর ওই শহরে গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের ডাকে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে, সেখান থেকে তীব্র উত্তেজনাও ছড়িয়েছে। রাজস্থানের পুলিশ বলছে, শহরে কারফিউ জারি থাকা সত্ত্বেও অশান্তি ঠেকাতেই তারা ওই মিছিলের অনুমতি দিয়েছিল। ইন্ডিয়ার বিভিন্ন শহরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ডাকে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, দাবি করা হচ্ছে দোষীদের কঠোরতম শাস্তির। মুসলিম ধর্মীয় নেতারা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এই হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে শান্তি বজায় রাখার আর্জি জানাচ্ছেন। উদয়পুরসহ গোটা রাজস্থানে ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার সকালে বেশ কয়েক হাজার মানুষ গেরুয়া পতাকা নিয়ে বিশাল মিছিল বের করে। নিহত দর্জি কানহাইয়ালালের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি জানিয়ে তারা কাছারি অভিমুখে মিছিল করে যান এবং জেলা কালেক্টরের হাতে একটি স্মারকলিপিও তুলে দেন। বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুন হওয়ার তিন সপ্তাহ আগে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ কানহাইয়া লালকে গ্রেপ্তার করেছিল। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পুলিশ প্রটেকশনের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন, তখন জীবনের প্রতি হুমকি আসার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। এক পুলিশ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পুলিশ তখন শান্তি আলোচনার জন্য কিছু হিন্দু ও মুসলিমকে ডেকেছিল, এ বৈঠকের পর কানহাইয়া বলেছিল, কারও বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার নেই তার।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানাল কংগ্রেস: বহিষ্কৃত বিজেপি মুখপাত্র নুপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানাল কংগ্রেস। তাদের বক্তব্য, নুপুর শর্মাকে সুপ্রিম কোর্ট যে ভাষায় তিরস্কার করেছে তাতে বিজেপির মাথা হেঁট হয়ে যাওয়া উচিত। নুপুরকে নিয়ে শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণকে হাতিয়ার করে সরাসরি ইন্ডিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে আক্রমণ করেছে তৃণমূল কংগ্রেসও।
‘লজ্জায় মাথা নত করা উচিত বিজেপির’: সুপ্রিম কোর্টের কড়া ভাষাকে হাতিয়ার করেই বিজেপিকে আক্রমণ করেছে কংগ্রেস। দলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ বলেছেন, দেশের বর্তমান হিংসাত্মক পরিবেশের জন্য নুপুর শর্মাকে দায়ী করে একেবারে ঠিক করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের এই মন্তব্য আসলে গোটা দেশের মানসিকতার প্রতিফলন। ক্ষমতাসীন দলের উচিত লজ্জায় মাথা নত করে বসে থাকা। জয়রাম রমেশের অভিযোগ, এই ধরনের সাম্প্রদায়িক হিংসা থেকেই বিজেপি রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করে। এটা কারও কাছে গোপন নেই। যারা যারা বিভেদকামী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তাদের সবাইকে শক্তি দেবে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ। শীর্ষ আদালত বিজেপিকে আয়না দেখিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আবার নূপুরের এই মন্তব্যের জন্য সরাসরি দেশটির প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিজেপি এবং আরএসএস (জঝঝ) মিলে দেশে ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করেছে। নূপুরের মন্তব্য তারই ফলশ্রুতি।শুধু কংগ্রেস নয়, বিজেপিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেতৃণমূল কংগ্রেসও। তৃণমূলের (ঞগঈ) তরফে টুইট করে বলা হয়েছে, নুপুর শর্মাকে যেভাবে অমিত শাহ এবং দিল্লি পুলিশ আড়াল করছে সেটা লজ্জার। এরাজ্যের শাসক দলের বক্তব্য,শীর্ষ আদালতই বলে দিচ্ছে গোটা দেশে আগুন জ্বালানোর জন্য নূপুর শর্মা একাই দায়ী।

প্রসঙ্গত, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপি’র সাবেক মুখপাত্র নুপুর শর্মা এক টেলিভিশন শোতে অংশ নিয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বিতর্কিত ওই মন্তব্য করেছিলেন। পরে দলটির নয়াদিল্লি শাখার গণমাধ্যম প্রধান নবীন জিন্দালও নুপুর শর্মার মন্তব্যের সমর্থনে টুইট করেন। তাদের এই মন্তব্য দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এমনকি অভিযুক্তদের মন্তব্যের জেরে ইন্ডিয়ার বেশ কয়েকটি রাজ্যের মুসলিমরা বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেন। আর এর রেশ ইন্ডিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরের বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিজেপি অভিযুক্ত নুপুর শর্মাকে বরখাস্ত এবং জিন্দালকে বহিষ্কার করে। পরে বিজেপির এই দুই নেতা প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে বিবৃতিও দিয়েছেন।
ইউডি/সুপ্ত

