প্রকৃতি রক্ষা আধুনিক সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ
রায়হান আহমেদ । শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:১০
আমাদের জীবনযাপনের, জীবনধারণের এবং জীবন সাজানোর বেশিরভাগ উপাদানের নিরবচ্ছিন্ন জোগানদার হলো প্রকৃতি। প্রকৃতি আমাদের কী না দেয়! খাদ্য, ফলমূল থেকে শুরু করে ওষুধ, পথ্য, পানীয়, কাপড়, বাড়ি-ঘর নির্মাণের উপাদান প্রকৃতি থেকে আসে। কোটি কোটি মানুষের শ্বাস নেওয়ার জন্য অক্সিজেন জোগান দেওয়া জীবন-জীবিকার উপায় সৃষ্টি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা পালন-সবকিছুই প্রকৃতির অবদান। এমনকি আমাদের ভেতরের মানবিক আবেগ আর শৈল্পিক অনুভবকে জাগিয়ে তোলার অনুপ্রেরণাও প্রকৃতি। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস অথবা বাংলাদেশে আঘাত হানা বড় বড় সাইক্লোনের সময় সুন্দরবন এবং উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল লাখো মানুষের জীবন বাঁচাতে রক্ষাকর্তার ভূমিকা পালন করেছে।
তাই এ কথা বলা বাহুল্য, প্রকৃতিতে জীবজগৎ ও উদ্ভিদ জগতের যথার্থ সহাবস্থান আর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য মানুষের নিজের টিকে থাকার পূর্বশর্ত। যে প্রকৃতি বা পরিবেশ বারবার আমাদের রক্ষা করছে, তাকে রক্ষা করতে আমরা কি যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে পেরেছি? এমনিতেই ভারতের গঙ্গা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিম্নাঞ্চল এবং বাংলাদেশে নতুন ধারার বিপর্যয়কর বন্যাগুলোর কারণ ও ধরন মোটাদাগে কয়েকটা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে অধিক তাপমাত্রায় বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা বৃদ্ধিজনিত অতিবৃষ্টি অবশ্যই একটা বড় কারণ। গঙ্গা ও তিস্তা অববাহিকায় বন্যার প্রধানতম কারণ অবশ্যই উজানে বাঁধ নির্মাণ ও একতরফা পানি প্রত্যাহারে স্রোত হারিয়ে নদীতে বালু জমে নদীর গভীরতা কমে আসা। অতিবৃষ্টির পর বন্ধ বাঁধগুলো হঠাৎ যখন একসঙ্গে খোলা হয়, তখন ভরাট হয়ে পড়া পদ্মা ও তিস্তা পানি ধারণ করতে না পেরে অভাবনীয় ক্ষতির বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে।
জলবায়ু পরিবর্তনগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং স্থলভাগে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, পানীয় জল সুরক্ষা-সম্পর্কিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে কিছু অভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদিও ভারত ও বাংলাদেশ মানচিত্রের একটি ভৌত সীমানা দ্বারা পৃথক, তবু আমাদের বায়ু, পানি, নদী, বন এবং অন্য অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ অভিন্ন। এসবে মানচিত্রের সীমানা অকেজো। জলবায়ু পরিবর্তনগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রশ্নে এ উপলব্ধির গভীরে পৌঁছাতে হবে। মানচিত্রের সীমানা অতিক্রম করলেই নদী আরেকটি ভিন্ন সত্তা হয়ে যায় না। একটি মহান নদী-সভ্যতা একটি সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ফসল! পরিবেশ বাঁচানো মানে প্রকৃতি ও পরিবেশের জীবনচক্র ও গতিপথকে স্বাভাবিক রেখে মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির অনুকূলে কাজে লাগানো। এ জন্য হাজার বছরের অর্জিত জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিকতম জ্ঞানের টেকসই সমন্বয় দরকার।
প্রাকৃতিক আবাসস্থল এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি কমাতে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ কী, তার আঞ্চলিক গবেষণা জরুরি। নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা করলেই পরে এ অঞ্চলের অধিকতর জলবায়ু-সহিষ্ণুতা অর্জন সম্ভব। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য নদীকে বাঁচিয়ে তাকে পরিবেশগত প্রবাহ, বাস্তুশাস্ত্র, জীববৈচিত্র্য ও পানি বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের উন্নয়নই টেকসই উন্নয়ন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মানে প্রকৃতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে চ্যালেঞ্জ করা নয়; বরং কারিগরি ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্যোগঝুঁকি প্রশমন করা, জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার আগাম, তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সব আয়োজন এখনই সময়। পৃথিবীর প্রাণ প্রকৃতি রক্ষার এ সময়ে বিশ্ব সম্প্রদায় একজোট হতে পারে, গড়ে তুলতে পারে জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা তহবিল। করোনা মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে পৃথিবী নিজেই নিজেকে নিরাময় করতে পারে, আমাদের কেবল নিরাময় প্রক্রিয়াটিকে সাহায্য করতে হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য অনুরাগী মন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের এমন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার, যাতে করে প্রকৃতিবান্ধব সমাধানের লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকেরা কৌশলগত পরিবর্তন আনতে পারেন। একই সঙ্গে জনসাধারণ নিজেদের প্রাণ-প্রকৃতিকে বিনষ্ট না করেই সবুজ ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য দায়িত্বশীল পদক্ষেপ রাখতে পারেন।
লেখক- সাংবাদিক
ইউডি/সুপ্ত

