বিশ্ব মঞ্চে ধ্বনিত হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়নের জয়গান

বিশ্ব মঞ্চে ধ্বনিত হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়নের জয়গান

মো. আকরাম হোসেন । সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২ । আপডেট ০৯:৪০

বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা চিরতরে বিনাশ করতে চেয়েছিল পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান শাসন-শোষণের জাল বুনেছিল আমাদের এই পূর্ব বাংলায়। হানাদারদের সব অন্যায়, অবিচার আর নৃশংসতার জাল ছিন্ন করে দেশকে স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ম্ফূর্ত সমর্থনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০-এর নির্বাচনে জয়লাভ করেও ক্ষমতায় বসতে না পারা- এসবের প্রতিটি ধাপই বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা অর্জনের দিকে পর্যায়ক্রমে ধাবিত করে তুলেছিল। আর প্রত্যেকটি আন্দোলনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন এবং অবিসংবাদিত নেতৃত্ব প্রদান করেছেন।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং যুদ্ধচলাকালে বাঙালির করণীয় সম্বন্ধে সামগ্রিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। ৭ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাঙালি মানসিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং তারপরই শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ শহীদের অমর আত্মত্যাগ আর দুই লাখ মা-বোনের সল্ফ্ভ্রমের বিনিময়ে অদম্য বাঙালি জাতি ছিনিয়ে় আনে বহুল প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বদেশে ফিরলে বাঙালির মুক্তির স্বাদ পরিপূর্ণতা লাভ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন জাতির পিতা। একাত্তরের যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তান সরকার স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অপপ্রচার করে। অথচ বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার ৫১তম বছর উদযাপন করছে, তখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিবিদ ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মুখে বাংলাদেশের উন্নয়নের জয়গান ধ্বনিত হচ্ছে। সমৃদ্ধির বহু নামে বাংলাদেশকে পরিচিতি দেওয়া হয়, বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে বিশেষায়িত করা হয় অজস্র অভিধায়। জাতিসংঘের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তকমা ঘুচিয়ে উন্নয়নশীল দেশে উপনীত।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পুনর্গঠনের জন্য কয়েক বছর লেগেছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ছিল ৬২৯ কোটি ডলার, মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৮৮ ডলার, রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ৩৪ কোটি মার্কিন ডলার। সে সময় রিজার্ভ ছিল মাত্র ১১০ কোটি টাকা, আমদানি ব্যয় ছিল ২২৬ কোটি ডলার, রাজস্ব আয় ছিল ২৮৫ কোটি টাকা আর দারিদ্র্যের হার ৭০ শতাংশ। ১৯৭৬ সালে রেমিট্যান্স ছিল এক কোটি ৬৩ লাখ ডলার। ৫১ বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, রপ্তানি আয় বহুগুণে বেড়ে মিলিয়ন ডলার থেকে এসেছে বিলিয়ন ডলারের ঘরে। গত ৫০ বছরে দারিদ্র্যের হার ৭০ শতাংশ থেকে কমে ২০.৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়নের প্রায় সব সূচকেই আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে অপ্রতিরোধ্য এই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা তাকে পৌঁছে দেবে এক অনন্য উচ্চতায়। ভিক্ষার ঝুলির অপবাদ পাওয়া সেই বাংলাদেশ এখন অনেকটাই স্বাবলম্বী হওয়ার পথে। ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে এই দেশের উন্নয়ন ব্যয়ের ৮০ শতাংশই বিদেশি সাহায্য ও ঋণের মাধ্যমে মেটানো হতো। বর্তমানে সেই দেশের বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ে বিদেশি ঋণ ও সাহায্যের পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। এখন উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ৩০ শতাংশ আসছে বৈদেশিক সাহায্য থেকে। বাকি ৭০ শতাংশই নিজস্ব অর্থ থেকে জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এক সময় বৈদেশিক অর্থায়ন না পেলে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলেও সেটি নেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এখন নিজেদের অর্থে বৈদেশিক ঋণ ছাড়াই প্রকল্প নেওয়ার সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে, যার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর মতো ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন।

জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী, কোনো দেশ পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায়। বাংলাদেশ সেই চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছিল গত বছর। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ২৪ নভেম্বর ২০২১ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনের ৪০তম প্লেনারি সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশ এখন স্থায়ীভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করল। যদিও প্রস্তুতিকালীন পাঁচ বছর পর ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে তা কার্যকর হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমাদেরকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ এই একটি কথাই যেন বাঙালির অগ্রযাত্রার জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে স্বাধীন বাংলার পতাকা এখন দূর গগনে উড়ছে। দেশরত্ন শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অচিরেই বাংলাদেশ উন্নত দেশের তালিকায় নিজের নাম লেখাবে। পরবর্তী প্রজন্ম জন্মগ্রহণ করবে গর্বিত বাংলাদেশ নামক উন্নত এক রাষ্ট্রে, যে রাষ্ট্র প্রকৃত প্রস্তাবে হবে সোনার বাংলা।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading