জাপানে সন্ত্রাসের থাবা : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে’কে গুলি করে হত্যা
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০৯ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:০০
কঠোর আইনের কারণে জাপানে বন্দুক হামলা একটি বিরল ঘটনা। এছাড়া জাপানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের টার্গেট করে হত্যা করার ঘটনাও খুব একটা দেখা যায় না। এমন অবস্থার মধ্যেই জাপানের সাবেক দুইবারের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে প্রকাশ্যে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে, শৃঙ্খল জাপান এই হত্যাকাণ্ডের কারনে বদলে যেতে পারে। শান্তির দেশ জাপানে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ও তার আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
আততায়ীর হামলায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন জাপানের ৬৭ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, দেশটির ইতিহাসে যার সবচেয়ে দীর্ঘসময় গণতান্ত্রিকভাবে সরকারপ্রধান থাকার রেকর্ড ছিল। শুক্রবার সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে জাপানের নারা শহরে এক নির্বাচনী প্রচার সমাবেশে বক্তৃতা দেওয়ার সময় আবেকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়, সঙ্গে সঙ্গেই পড়ে যান তিনি। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তার কিছুক্ষণ পর দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা জানান, আবের অবস্থা সংকটাপন্ন এবং চিকিৎসকরা তার জীবন বাঁচাতে লড়ছেন। তারও কয়েক ঘণ্টা পর জাপানি গণমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর আসে। তিনি ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন। দলের পক্ষ থেকেও মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নারা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, জাপানের স্থানীয় সময় বিকাল ৫টা ৩ মিনিটে শিনজো আবেকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। তাকে বাঁচাতে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছেন ২০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তবে ঘাতক বুলেট তার বুকের যথেষ্ট গভীরে পৌঁছে যায় বলে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। জাপানে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নেতা আবে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী না থাকলেও জাপানে এখনও তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। গত তিন দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নেতাও।
আবের প্রতি ‘অসন্তুষ্ট’ ছিলেন হামলাকারী
শিনজো আবেকে পেছন থেকে তাকে গুলি করা হয়। জাপানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর নারার একটি ট্রেন স্টেশনের বাইরে নির্বাচনি প্রচারণায় ভাষণ দিচ্ছিলেন শিনজো আবে। ওই সময় দুটি গুলির শব্দ শোনা যায়। এরপরই নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ধূসর টি-শার্ট পরা এক সন্দেহভাজনকে চেপে ধরতে দেখা যায়। প্রাথমিক ভাবে তাকেই হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে আটক করেছে পুলিশ। তার নাম তাৎসুইয়া ইয়ামাগামি। তার বয়স ৪১ বছর। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হামলাকারী পুরুষ আবের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন আর তাকে খুন করতে চেয়েছিলেন। হামলাকারী একসময় জাপানের নৌবাহিনীর সমমর্যাদার মেরিটাইম সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের সদস্য ছিলেন। দৃশ্যত হাতে তৈরি বন্দুক নিয়ে আবের ওপর গুলি চালায় হামলাকারী। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের কাছে হামলাকারী দোষ স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি শিনজো আবের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলাম। তাই তাকে গুলি করতে চেয়েছিলাম। তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। তবে, তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আমার কোনো ক্ষোভ নেই।’
শান্তির জাপানে নির্মম হত্যাকাণ্ড
জাপানে বন্দুক সহিংসতার ঘটনা বেশ বিরল। কারণ পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে হ্যান্ডগান বা বন্দুক নিষিদ্ধ। দেশটিতে বৈধভাবে একটি আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক হওয়াও খুব কঠিন। ২০১৭ সালে সাড়ে ১২ কোটি মানুষের দেশটিতে মাত্র ৩ লাখ ৭৭ হাজার মানুষের নিবন্ধিত অস্ত্র ছিল। প্রতি ১০০ জনে এ সংখ্যা শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। আমেরিকায় এ হার প্রতি ১০০ জনে ১২৫। ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কাউন্সিলের জাপানবিষয়ক পরিচালক ন্যান্সি স্নো বলেন, আবের এই গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা জাপানকে অনেকটা পাল্টে দেবে। জাপানে বন্দুক হামলা অত্যন্ত বিরল, যা সাংস্কৃতিকভাবেও অকল্পনীয়। আমেরিকায় যে ধরনের বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটছে তা জাপানের মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। এটা অবর্ণনীয় মুহূর্ত।
আবে হত্যাকাণ্ড বদলে দিতে পারে জাপানকে
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এক মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাপানের মানুষ সহিংস অপরাধের কথা প্রায় চিন্তাই করেন না। যদিও দেশটিতে ইয়াকুজার মতো কুখ্যাত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র রয়েছে। কিন্তু এদের সংস্পর্শে আসতে চায় না খুব বেশি সংখ্যক মানুষ। এমনকি এই চক্রও আগ্নেয়াস্ত্র থেকে দূরে রাখে নিজেদের। কারণ অবৈধ অস্ত্র বহনে কঠোর সাজা ভোগ করতে হয়। আবের হত্যাকারী কোন ধরনের তা অবশ্য এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মনে করা হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ড নিশ্চিতভাবে জাপানকে বদলে দেবে। নিরাপদ দেশ হলেও জাপানে নিরাপত্তা বেশ শিথিল। নির্বাচনি প্রচারণায় রাজনীতিবিদরা আক্ষরিকভাবে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন, মানুষের সঙ্গে হাত মেলান। এ কারণেই আবের হামলাকারী কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং অস্ত্র ব্যবহার করেছে। ‘এই বাস্তবতা আজকের পর থেকে নিশ্চিতভাবে বদলে যাবে’ বলে সংবাদমাধ্যমের মন্তব্য প্রতিবেদনে এমনই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
‘এমন হামলার ঘটনা ক্ষমার অযোগ্য’
শিনজো আবের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী। তখন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় দৃশ্যত তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। আবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরে এবং তার মৃত্যুর বিষয়টি চিকিৎসক কর্তৃক ঘোষণা দেওয়ার আগে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। এ সময় আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি বলেন, ‘শিনজো আবের ওপর এ নৃশংস আক্রমণ হয়েছে একটি নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময়। এ ধরনের নির্বাচনী প্রচারাভিযান গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। এমন হামলার ঘটনাকে আমরা ক্ষমার চোখে দেখব না। আমি এ ধরনের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই।’ জাপানে রাজনীতিবিদদের জনসমক্ষে তাদের কষ্ট ও আবেগ দেখানোর ঘটনা বিরল। কিন্তু শিনজো আবের ওপর হওয়া ওই আকস্মিক হামলার পর নিজের আবেগ সংবরণ করতে পারেনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী।
হতবাক বিশ্ব নেতাদের শোক জ্ঞাপন
শিনজো আবের মৃত্যুর ঘটনায় অবক পুরো বিশ্ব, একই সঙ্গে হতবাক বিশ্ব নেতারা। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমেরিকা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশও করেন তিনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিনজো আবের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এ হামলা বিধ্বংসী। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে একজন সত্যিকার মহান ব্যক্তি ও নেতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক টুইট বার্তায় বলেছেন, প্রিয় বন্ধু শিনজোর আবে ওপর হামলায় আমি গভীরভাবে ব্যথিত। তার পরিবার, দেশের জনগণের প্রতি সহানুভূতির কথাও উল্লেখ করেন মোদি। পাশাপাশি জাপানের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াণে আজ শনিবার (৯ জুলাই) এক দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন মোদী। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুড, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন, ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র সচিব এনরিক মানালো, ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি, মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন আবদুল্লাহসহ আরও অনেকেই আবের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক ও নিন্দা
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দু:খ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি এম আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপ্রধান তার শোকবার্তায় শিনজোর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এছাড়া এ ঘটনার শোক ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। শোকবার্তায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, শিনজো আবে আমার ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। তিনি বাংলাদেশেরও বন্ধু ছিলেন। তার মৃত্যুতে জাপানের জনগণ এক অসাধারণ নেতাকে হারাল। একইসঙ্গে বাংলাদেশ হারাল তার একজন অকৃত্রিম বন্ধুকে।
দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের কীর্তি
শিনজো আবে জাপানের সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্র নীতি ও বিশেষ ধরনের অর্থনীতি প্রচলন করার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এমন অর্থনৈতিক নীতি অ্যাবেনোমিক্স নামে পরিচিত ও জনপ্রিয় ছিলো। অধিকাংশ জাপানির মতে তিনি একজন রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী ছিলেন। ৬৭ বছর বয়সী আবে তার রাজনৈতিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে (এলডিপি) দু’বার বিজয়ী করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম কার্যকাল সংক্ষিপ্ত ছিল। ২০০৬ সালে তিনি প্রথমবারের মতো জাপানের প্রধানমন্ত্রী হন। ওই সময় এক বছরের কিছু বেশি সময় ধরে দেশটিতে তার শাসন চলেছিল। তার এ এক বছরের শাসনামল ছিলো বিতর্কিত। কিন্তু, ২০১২ সালে তিনি সবাইকে বিস্মিত করে আবার ক্ষমতায় এসেছিলেন। এরপর তিনি টানা আট বছর ক্ষমতায় থেকে পরে ২০২০ সালে স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করেন।
তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে যখন ক্ষমতায় আসেন তখন জাপান একটি মন্দার মধ্যে ছিলো। এ সময় তার অর্থনৈতিক নীতির কারণে জাপানি অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হয়। তিনি মুদ্রা ব্যবস্থা সহজ করা, রাজস্ব উদ্দীপনা এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেন। তিনি ২০১১ সালে তোহোকুতে একটি বিশাল ভূমিকম্প ও সুনামি থেকে জাপানের পুনরুদ্ধারের তত্ত্বাবধান করেছিলেন। ওই দুর্যোগে প্রায় ২০ হাজার লোক নিহত হয়েছিলেন এবং এ কারণে ফুকুশিমার পারমাণবিক চুল্লিগুলো গলতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের জল্পনা-কল্পনার পরে তিনি ২০২০ সালে পদত্যাগ করেন। এ সময় তিনি আলসারেটিভ কোলাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানান। অন্ত্রের রোগে ২০০৭ সালেও তিনি পদত্যাগের করেছিলেন। ওই সময় তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন ঘনিষ্ঠ দলীয় মিত্র ইয়োশিহিদে সুগা। কিন্তু, তারপরও তাকে জাপানের রাজনীতিতে একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়।
ইউডি/সিফাত

