‘ভারমুক্ত’ হলেন রনিল বিক্রমাসিংহে: শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:৪৫
শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে রনিল বিক্রমাসিংহকেই বেছে নিয়েছে। মূল্যস্ফীতি, খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ ঘাটতির কারণে সৃষ্ট ব্যাপক জনঅসন্তোষ ও গণবিক্ষোভে গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালানোর পর রনিল ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এবার স্থায়ীভাবে সেই দায়িত্ব পেলেন তিনি। তবে, এই দায়িত্ব পালনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যে তাকে যেতে হবে তা বলাই বাহুল্য। ধ্বংসস্তূপ থেকে লঙ্কাকে আবারও চালকের আসনে নিতে পারবেন কী রনিল? বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান
কে হচ্ছেন শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট তা নিয়ে আলোচনার কমতি ছিলো না। অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ও রাজনৈতিকভাবে প্রায় লন্ডভন্ড একটি দেশকে কে নেতৃত্ব দিয়ে আবারও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নিয়ে আসবেন তা নিয়ে কৌতূহল ছিলো বেশ। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে আগ্রহের মাত্রা ছিলো বহুগুণ। সবকিছু ছাপিয়ে বুধবার (২০ জুলাই) দেশটির পার্লামেন্টে আইনপ্রণেতারা গোটাবায়ার বাকি মেয়াদ পূরণের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে রনিল বিক্রমাসিংহকেই বেছে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বেছে নিতে বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে স্পিকার মাহিন্দা ইয়াপা আবেবর্ধনের সভাপতিত্বে পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হয়।
প্রেসিডেন্ট পদে বুধবার যে তিন প্রার্থী লড়েন তাদের মধ্যে রনিল ছাড়াও ছিলেন শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীন দল পদুজানা পেরামুনা পার্টির সাংসদ দুল্লাস আলাহাপ্পেরুমা ও ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ারের নেতা কুমারা দেশানায়েকে। রনিল বিক্রমাসিংহের প্রতিদ্বন্দ্বী দুল্লাস আলাহাপ্পেরুমা পরাজয় মেনে নিয়েছেননতুন প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে জনতার দুর্ভোগের কথা শুনবেন বলে আশা প্রকাশ করেন দুল্লাস আলাহাপ্পেরুমা। দুল্লাস আলাহাপ্পেরুমা বলেন, আমি সংসদ সদস্যদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। আমি আশা করছি অন্তত এখন আপনারা জনগণের দুর্ভোগের কথা শোনার মানসিকতা গড়ে তুলবেন।

নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন দিনেশ গুনাবর্ধনে: শ্রীলঙ্কার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের অধীনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সংসদ নেতা ও পার্লামেন্ট সদস্য দিনেশ গুনাবর্ধনে। রাজাপাকসেদের রাজনৈতিক দল শ্রীলঙ্কা পোদুজানা পেরামুনার (এসএলপিপি) নেতা হলেন দিনেশ। বুধবার লঙ্কান সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর অনলাইন এই খবর দিয়েছে। এর আগে দুপুরে রনিল বিক্রমাসিংহে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। পার্লামেন্টে রনিলের নিজের দলের কোনো এমপি না থাকলেও এসএলপিপির এমপিরা তাকে সমর্থন দিয়েছেন। তবে রাজাপাকসে পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলে রনিল দেশটির জনগণের কাছে অজনপ্রিয়।
রনিলকে সফল হতে হবে দ্রুতই : বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজাপাকসেরা সরে যাওয়ার পর বিক্ষোভের তীর তার দিকে ঘুরে গেলেও রনিল কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে পরিস্থিতি আপাতত সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দ্বীপদেশটির অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে ‘বেইলআউটের’ আলোচনাকে দ্রুত সফলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে তাকে। মেটাতে হবে খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির ঘাটতি; হাতে বিদেশি মুদ্রা না থাকায় গত কয়েকমাস ধরেই এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আমদানি করতে পারছিল না শ্রীলঙ্কা। এই ঘাটতি আর ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি শ্রীলঙ্কাকে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বাজে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলেছে। রনিল কী পারবেন, ডুবন্ত এই দ্বীপদেশটিকে টেনে তুলতে?
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ: কয়েক মাস ধরেই শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে চরম মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে, মুদ্রাস্ফীতিও আকাশছোঁয়া। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মানুষ। এ অবস্থায় ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে দেশটির সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে। আর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে পেতে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন প্রেসিডেন্টের প্রধান কাজ। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি রনিল এই কাজে শুরুতেই আশার আলো দেখাতে পারেন, তবে তাকে ঘিরে যে অসন্তোষ বিরাজ করছে তা দ্রুতই কেটে যাবে।
আইএমএফের ঋণ: প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার গত জুনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের প্রতিনিধি দল শ্রীলঙ্কা ঘুরে গেছে। ইতোমধ্যে একটা বিৃবতিতে তারা বলেছে, দেশটির অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। এগুলো করতে হলে শুধু বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বদল আনতে হবে, তা নয়; অন্তত ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভয়াবহ মূল্যম্ফীতিসহ নানা ধরনের কষ্ট জনগণকে সইতে হবে। কারণ ওই সংস্কারমূলক পদক্ষেপের মধ্যে আছে সুদ ও করের হার বাড়ানো। নতুন সরকার এসব সংস্কারে রাজি হলে আইএমএফ শ্রীলঙ্কাকে ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে। কিন্তু এ পরিমাণ অর্থ দিয়ে দেশটির জরুরি প্রয়োজন মিটবে, তা বলা যায় না। শ্রীলঙ্কা সরকারের হিসাব অনুসারে তাদের এখন বৈদেশিক ঋণ হলো প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলার। খেলাপি হওয়ার কারণে দেশটি নতুন কোনো ঋণ পাচ্ছে না। নতুন ঋণ পেতে হলে এ বছরই দাতাদের হাতে অন্তত ৭ বিলিয়ন ডলার তুলে দিতে হবে। শুধু তাই নয়, আগামী বছরও দেশটিকে একই পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে, যা এখনও অনিশ্চিত।

নজর দিতে হবে পর্যটন ও রেমিট্যান্সে : শ্রীলংকায় বৈদেশিক মুদ্রার বড় জোগান আসে দেশটির পর্যটন খাত থেকে। করোনা ভাইরাস মাহারির কারণে প্রায় দুই বছর পর্যটন শিল্পে কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় চরম সংকটে পড়েছে দেশটি। মহামারি শুরুর আগে শ্রীলংকায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসতো চীন থেকে। কিন্তু চীনে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ কঠোর থাকায় চীন থেকে পর্যটক আসতে পারেনি। এর ফলে দেশটির পর্যটন খাতে বিপর্যয় নেমে আসে। দেশটিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেকটি বড় জায়গা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রীলংকার নাগরিকদের পাঠনো ডলার। কিন্তু করোনা ভাইরাস মহামারির সময় সেটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা ভাইরাস মহামারির আগে পর্যটন এবং রেমিটেন্স থেকে শ্রীলংকার ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করতো। তাই নতুন প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের সামনে এই অপার সম্ভাবনাকে আবারও সতেজ করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য পর্যটন ও রেমিটেন্সে নজর বাড়ানোর বিকল্প নেই।
নয়া প্রেসিডেন্টকে কী লঙ্কানরা মেনে নেবে: পার্লামেন্টের ২২৫ সদস্যের মধ্যে সেলভারাজা গজেন্দ্রন ও জি জি পন্নামবালাম বাদে বাকি সবাই ভোট দিয়েছেন; এর মধ্যে চারটি ভোট বাতিল হয়। ১৩৪ ভোট পেয়ে রনিল প্রার্থীদের মধ্যে সবাইকে ছাড়িয়ে যান, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দুল্লাস আলাহাপেরুমা পান ৮২ ভোট। দেশানায়েকের বাক্সে পড়ে মাত্র ৩ ভোট। আইনপ্রণেতারা নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে রনিলকে বেছে নিলেও স্বাধীনতার পর সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়া শ্রীলঙ্কার জনগণ তাকে মেনে নেবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। সংকটের জন্য লঙ্কানরা যাদের দায়ী করছে, রনিল সেই রাজাপাকসে পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় অনেকেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। তুমুল বিক্ষোভের পর মাহিন্দা পদত্যাগ করলে, রাজাপাকসে পরিবার তাকে (রনিল) প্রধানমন্ত্রী করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাতে লাভ হয়নি, শেষমেষ গোটাবায়াকে দেশ থেকে পালাতে ও পদত্যাগ করতে হয়েছে। এরপর থেকে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের তীর রনিলের দিকে। রনিল প্রেসিডেন্ট হলে ক্ষমতাসীন অভিজাতদের প্রতি ক্ষিপ্ত জনতা ফের বিক্ষোভ শুরু করতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

কে এই রনিল বিক্রমাসিংহে: শ্রীলঙ্কার গত অর্ধশতকের রাজনীতিতে বুদ্ধিমান ও হাল না ছাড়াদের তালিকা করলে সেখানে ‘দ্য ফক্স’ বা ‘শেয়াল’ নামে সুপরিচিত রনিল বিক্রমাসিংহের মতো হাতেগোণা কয়েকজনের নামই পাওয়া যেতে পারে। বারবার হোঁচট খেলেও কৌশলী ভূমিকার মাধ্যমে প্রতিবারই রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পুনর্জাগরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি; বিরল এ সফলতাই সম্ভবত ৭৩ বছর বয়সী এ রাজনীতিককে এমন ডাকনাম জুটিয়ে দিয়েছে বলে ধারণা গার্ডিয়ানের।দ্বীপরাষ্ট্রটির ছয়বারের প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের জš§ রাজনৈতিক পরিবারে, ১৯৪৯ সালের ২৪ মার্চ। সিলন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন তিনি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে ইউএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। সেসময় তিনি কেলানিয়া নির্বাচনী এলাকায় প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো দেশটির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জুনিয়াস রিচার্ড জয়েবর্ধনের ভাইপো তিনি। জয়াবর্ধনের নতুন সরকার গঠিত হলে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপমন্ত্রী হন রনিল। এরপর যুব ও কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি সবচেয়ে কম বয়সী হিসেবে যুব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন। পরে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসাকে হত্যা করা হলে সেসময়কার প্রধানমন্ত্রী ডি বি উইজেতুঙ্গা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। আর উইজেতুঙ্গার প্রধানমন্ত্রীর পদে স্থলাভিষিক্ত হন রনিল বিক্রমাসিংহে। ১৯৯৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালে গামিনী দিশানায়েক হত্যাকাণ্ডের পর ওই বছরের নভেম্বরে রনিলকে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত করা হয়।২০০১ সালে তিনি ফের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি দেশটির প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপাল সিরিসেনা তাকে ফের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০১৫ সালের সংসদীয় নির্বাচনে বিক্রমাসিংহের দলীয় জোট ইউনাইটেড ন্যাশনাল ফ্রন্ট ফর গুড গভর্ন্যান্স ১০৬ আসন লাভ করে। কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির ৩৫ সদস্যকে নিজ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফের নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে হয় রদবদল। তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেন প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপাল সিরিসেনা। তার স্থলে তৎকালীন সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। তবে ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর সিরিসেনা পুনরায় তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ২০ নভেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন এবং মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২০ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি জয়ী হতে পারেননি। তিনি বর্তমানে ইউএনপির কলম্বো জেলার সংসদ সদস্য। ২০২১ সালের ২৩ জুন তিনি শপথ নেন।
ইউডি/সুপ্ত

