সরকারের ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ বাস্তবসম্মত
মোয়াজ্জেম হাওলাদার । বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৭:৫৫
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ব এক ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং অতীতের তুলনায় ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি। টানা দুই বছর করোনায় বিপর্যস্ত উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা আরও বড় ধরনের ধাক্কা খায় চলতি বছরে এসে। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে বিশ্ব এখন রীতিমতো নাকাল হওয়ার অবস্থায়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও এর প্রভাবে ব্যাপকভাবে ভুগছে। এর মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে খুব দ্রম্নতই যে এই সমস্যার সমাধান হবে সেটাও আশা করা যায় না। দেশে দেশে জ্বালানি সংকট এখনই এত তীব্র হয়েছে যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি উত্তরণে কৃচ্ছ্রসাধনে সবাইকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। দেশ ও বিশ্বের সামগ্রিক অবস্থায় যা খুবই যৌক্তিক। যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা এখন যেমন বলা যাচ্ছে না এবং একই সঙ্গে ধনী দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত করার দ্বন্দ্ব বন্ধের ভবিষ্যদ্বাণী করা যাচ্ছে না। এর বিকল্প উপায় হচ্ছে নিজেদের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ও যথাযোগ্য ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে সব মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকা।
করোনার কারণে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা ও খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করে আসছে গত বছরের শুরু থেকে। এখন নতুন করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘ রূপ নেওয়ায় মন্দা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা মূল্যস্ফীতিতে হিমশিম খাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার মতো যেসব দেশ বিদেশি ঋণনির্ভর বড় বড় প্রকল্প নিয়েছে সেসব দেশে আতঙ্ক বাড়ছে। ছোট দেশ ছাড়াও বড় দেশগুলোও বৈশ্বিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির চাপে ব্যয় সংকোচন নীতিতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য মতে, সরকার ব্যয় কমানো এবং সম্পদ সংরক্ষণের খাতগুলো দেখছে। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কারণ এ দুটি খাত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ব্যয় কমানোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে আমদানিনির্ভর বড় এবং কম প্রয়োজনীয় প্রকল্পের কাজ আপাতত বন্ধ রাখা।
আমাদের দেশে আবার বিদ্যুতের সংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির কারণে সারাদেশে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, জ্বালানির অভাবে উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি খাত বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের যে টালমাটাল অবস্থা তৈরি হয়েছে তার ধাক্কা লেগেছে বিশ্বের সর্বত্র। তেলের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম একলাফে আকাশচুম্বী হয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে বিদ্যুৎ ও তেলের খরচ কমানোর একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত হয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে। ডিজেলের দাম ‘আকাশচুম্বি’ হয়ে যাওয়ায় আপাতত দেশের ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন স্থগিত রাখা হবে। পাশাপাশি সপ্তাহে একদিন পেট্রোল পাম্প বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, এখন কয়লা থেকে ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, গ্যাস থেকে ৫০ দশমিক ৮৪ শতাংশ, ফার্নেস অয়েল থেকে ২৮ শতাংশ এবং ডিজেল থেকে ৬ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি সাশ্রয় নীতির কারণে দিনে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সেই ঘাটতি সমন্বয় করতে গ্রাহক পর্যায়ে দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হবে, আর এলাকাভিত্তিক এই লোডশেডিং শুরু হয়েছে মঙ্গলবার থেকেই। কোথায় কখন লোডশেডিং হবে, তা জানিয়ে দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলো। রাত ৮ টার পর দোকান বন্ধ থাকবে। অফিসের সময় কমিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
প্রায় শতভাগ জ্বালানি তেল আমদানি করা বাংলাদেশের পরিবহণ খাতের ৯০ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৪ শতাংশ তেলনির্ভর। ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ায় সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় এলএনজি কেনার পরিমাণও কমানো হয়েছে। তাতে দেশজুড়ে লোড শেডিং ফিরে এসেছে আবার। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারকে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

