মেডিটেশন থাকুক ভ্যাটমুক্ত
শাহনাজ বেগম । শনিবার, ২৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:০৫
মানুষ প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ আর প্রকৃতির ছন্দকে অনুভব করতে পারলে এবং সেই ছন্দে নিজের চলাফেরা, কাজকর্ম, খাওয়া-দাওয়া তথা জীবনাচারকে পরিচালিত করতে পারলে পৃথিবীটাই তখন মানুষের কাছে স্বর্গসম মনে হতে পারে। তবে এর জন্য চাই প্রশান্ত মন। মানুষ প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ আর প্রকৃতির ছন্দকে অনুভব করতে পারলে এবং সেই ছন্দে নিজের চলাফেরা, কাজকর্ম, খাওয়া-দাওয়া তথা জীবনাচারকে পরিচালিত করতে পারলে পৃথিবীটাই তখন মানুষের কাছে স্বর্গসম মনে হতে পারে। তবে এর জন্য চাই প্রশান্ত মন।
বর্তমান বিশ্বে মানুষের তথাকথিত যান্ত্রিক জীবনে এই প্রশান্ত মনের বড়ই অভাব। বহুবিধ দুশ্চিন্তা মানুষকে অস্থির করে রেখেছে। এসবের মধ্যে থেকে ধ্যানচর্চার মধ্য দিয়ে মানুষ জীবনে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পায়, তাতে মন প্রশান্ত হয়। আর প্রশান্ত মনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় সে জীবনে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয় সুস্বাস্থ্য ও সাফল্যের সূত্রগুলোকে।
আমি একসময় এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না। কিন্তু যখন ধ্যান করার প্রক্রিয়া শিখে এর অনুশীলন করতে থাকলাম দিনের পর দিন, ধীরে ধীরে অনুভব করতে থাকলাম নিজের পরিবর্তন।
এরপর সত্যি সত্যি অন্যদের কাছেও আমার এসব পরিবর্তন সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকল ক্রমাগত, যা রয়েছে চলমান। দু’একটা উদাহরণ না উল্লেখ করলেই নয়, যেমন-স্কুল জীবনকে মাইগ্রেনের ব্যথায় দুর্বিষহ লাগত, ডাক্তারের বক্তব্য ছিল কখনো ভালো হওয়ার নয়। ব্যথার শুরুর দিকে ওষুধ খেয়ে নেবেন, চলবে আমৃত্যু। যত বয়স বাড়ছিল, ততই বাড়ছিল এ ব্যথার ভয়াবহতা আর স্থায়িত্বকাল। পড়াশোনা শেষ হলো, বিয়ে হলো, সন্তান হলো আর ক্রমাগত ব্যথা ও ব্যথার সময়কাল বাড়তে থাকল।
এ ব্যথার জন্য আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করত, কিন্তু সন্তানদের ভাবনায় তা পারতাম না। মেডিটেশন শেখার পর ২/৩ বছরে কমতে কমতে কখন যেন এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে গেলাম, তা আল্লাহই ভালো জানেন। এখন বয়স প্রায় ৫৩ বছর, সত্যিই ভুলে গিয়েছিলাম কখনো আমার মাইগ্রেন ছিল। গত ৮/১০ বছরের মধ্যে এ ব্যথা আর হয়নি।
আজ মেডিটেশনের ওপর ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবের খবরে মনে পড়ে গেল, স্বাস্থ্যসেবায় সম্পৃক্ত কত শত ডাক্তার আমাকে মাইগ্রেনের ব্যথা থেকে মুক্তির উপায় বলতে না পারলেও মেডিটেশন আমাকে মুক্তি দিয়েছে। তাহলে কেন স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসাবে মেডিটেশনসেবা ভ্যাটমুক্ত থাকবে না? আমার গ্যাস্ট্রিক আলসার ভালো হয়েছে, ইউটেরাসে সিস্ট ভালো হয়েছে, পায়ের হিল বেড়ে গিয়েছিল, সেটি ভালো হয়েছে। ঘনঘন ইউরিন ইনফেকশন হতো, তা ভালো হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে নাইকি, গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাপলের মতো খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করছে মেডিটেশন চর্চায়। এর পাশাপাশি কর্মীদের কিছু সময়ের জন্য মৌনতা চর্চায়ও উৎসাহিত করছে তারা। তাদের মতে, এতে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
কমেছে অসুস্থতাজনিত ছুটি ও চিকিৎসা ব্যয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করে কর্মীরা অন্তর থেকে সুখী হয়ে ওঠে। ফলে কর্মস্থলের পরিবেশ থাকে সুন্দর। প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে কর্মীরা থাকে আন্তরিক। বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের যোগ-ধ্যানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন প্র্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আলেকজান্দ্রিয়ায় সুপরিচিত একটি বিদ্যালয় জর্জ ওয়াশিংটন মিডল স্কুল। এ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক ডেজিরি ম্যাকনাট এবং এলকিন রড্রিগেজ। ২০১৯ সালে সিক্সথ্ গ্রেডের (১১-১২ বছর বয়সি) ১৭৫ জন শিক্ষার্থীকে তারা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে মেডিটেশন করান। বছর শেষে দেখা গেল-এ ক্লাসের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত, দুশ্চিন্তামুক্ত এবং নতুন কিছু শেখার ব্যাপারে বেশি মনোযোগী। তারা পরস্পরের প্রতি সমমর্মী ও শ্রদ্ধাশীল। দুরন্ত শিক্ষার্থীরাও অন্যদের আগের চেয়ে বুলিং কম করছে। টিমওয়ার্ক ও পড়াশোনায় একে অন্যকে আগের চেয়ে বেশি সহযোগিতা করছে।
এছাড়াও দীর্ঘ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, মেডিটেশন চর্চার ফলে শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট ভালো হয়। দৃষ্টিভঙ্গি হয় ইতিবাচক। মনোযোগ ও পড়া মনে রাখার সামর্থ্য বৃদ্ধি পায়। গণিত ও বিজ্ঞানের জটিল বিষয় সহজে বোঝার দক্ষতা সৃষ্টি হয় এবং নৈতিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে। এক ডজনেরও বেশি গবেষণা করে গবেষকরা বলছেন, নিয়মিত মেডিটেশন শিক্ষার্থীদের চেয়ে শিক্ষকদের আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ, শিক্ষকদের এতে স্ট্রেস কমে, আচরণ নিয়ন্ত্রণে আসে। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।
শাহনাজ বেগম: ভাইস প্রিন্সিপাল, সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মালিবাগ শাখা, ঢাকা
ইউডি/সুস্মিত

