মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক
ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী । শনিবার, ২৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:৫৫
পৃথিবীতে কিছু কিছু মুখ থাকে, যেগুলো চাইলেও ভোলা যায় না; বরং যতই সময় গড়িয়ে যায়, ততই মুখগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রক্তের বন্ধন হয়তো থাকে না সেখানে, তারপরও খুব আপন হয় সে মুখগুলো। যেমন-তৃষিত মাটির আপনজন হয়ে ওঠে মেঘ থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির জলরাশি। তীব্র শীতে উদোম শরীরের ছেলেটার আপনজন হয়ে ওঠে এক টুকরো সূর্যের উত্তাপ। খুব চেনা চেনা সেই মুখগুলো, চোখটা বয়সের ছাপে ঝাপসা হলেও মুখগুলো তখনও জ্বলজ্বলে। ঠিক যেমনটা আকাশে ঝুলে থাকা জ্বলজ্বলে তারাগুলো। চশমায় পাওয়ারফুল কাচের লেন্স চোখে লাগিয়ে তখন অন্য সবকিছু ভালো করে দেখার প্রয়োজন হলেও সেই মুখগুলো দেখার জন্য কোনো চশমার প্রয়োজন হয় না; বরং দগদগে কাঁচা ঘায়ের মতো মুখগুলো দেহের ভেতরে প্রবেশ করে জীবনকে যেন নতুন করে চিনিয়ে যায়। কারণ, সেই মুখগুলোয় কখনো কোনো মুখোশ থাকে না; বরং মুখ ও মানুষ থাকে।
যে মানুষটা অনেকটা কুমোরের মতো, কাদামাটি হাতে নিয়ে সেগুলোকে নিজের মতো করে গড়ে। নিজের স্বপ্ন যেখানে অপূর্ণ থেকে যায়, সেখানটায় সেগুলোকে পৌঁছানোর জন্য জীবনকে বাজি রেখে লড়াইয়ে নামে। কখনো চিত্রশিল্পীর মতো হয়ে যায় মানুষটা। জলরং তুলিতে নিয়ে ছবি আঁকে। নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয়। ক্লান্তিতে জড়োসড়ো শরীর অতৃপ্তিটা মুছে ফেলার প্রাণান্ত চেষ্টা করে। কিছুই হয়তো নেই মানুষটার; অথচ যা আছে তা নিঃসন্দেহে অমূল্য। পৃথিবীর মানুষের সাধ্য নেই সে অমূল্য রতনকে কিনবার, সে অমূল্য রতনকে তাদের কেনা দাস বানানোর। রঙের বিন্যাস তার ছবিতে বৈচিত্র্য আনে, চিন্তার রংছবির ভেতরের রংকেও ছাপিয়ে যায় কখনো কখনো। তারপরও মানুষটা থেমে থাকে না। তার সংসারের টানাপোড়েনটা আধুনিক পৃথিবীর বাণিজ্যিক মানুষের চোখে হয়তো ধরা পড়ে না কখনো; কিন্তু মানুষটা তো ত্যাগের শরীর নিয়ে তৈরি, ভোগের লোভ তার শরীরের কোথাও দাগ ফেলার মতো সাহস দেখাতে পারে না।
খুব সাধারণ একটা মানুষের কথা বলছি, যাকে মানুষ প্রিয়জন হয়তো মনে করে না; বরং তার প্রয়োজন মনে করে। খুব সুদর্শন নয় হয়তো, তারপরও মস্তিষ্কে গিজগিজ করা চিন্তাগুলো যে মানুষটার কপালের ভাঁজ হয়ে নতুন জীবনের জন্ম দিতে পারে, সেই সাধারণ পৃথিবীর অসাধারণ মানুষটাই হচ্ছেন শিক্ষক। যদিও বলতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত নই, পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন শিক্ষক হওয়া। সবাই শিক্ষক হতে পারে না, কেউ কেউ শিক্ষক হয়। কথাগুলো খুব সহজসরল বলে মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত বিষয়টি খুব জটিল ও গবেষণাযোগ্য।
মনে পড়ছে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের কথা। তিনি যত বড় না দার্শনিক ছিলেন, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষক হিসাবে। অথচ খুব সাদামাটা একটা মানুষ। অসাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড় করালে এ সাধারণ মানুষটাকে হয়তো খুঁজেও পাওয়া যাবে না। উচ্চতাও তেমন মনে রাখার মতো কিছু না, খুব বিশ্রী রকমের মোটা একজন মানুষ। অতিমাত্রায় কুৎসিত একটা মানুষ! তার চোখগুলো দেখে মনে হতো, যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। নাকটাও ছিল বোঁচা।
কিন্তু এ মানুষটা এমন সব মৌলিক জ্ঞানের জন্ম দিয়েছেন, যা দীর্ঘ ২০০০ বছর ধরে পশ্চিমা সংস্কৃতি, দর্শন ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। সক্রেটিস সারা পৃথিবীর শিক্ষক ছিলেন; অথচ তিনি বলতেন, নিজের ব্যাপারে আমি বলব-আমি এটাই জানি যে, আমি কিছুই জানি না। খুব অদ্ভুত এক আত্মবিশ্লেষণ, যেখানে জ্ঞানের মহাসমুদ্রে ডুবে থাকা মানুষটা বুঝতে পারছেন না, তিনিই জ্ঞানের মহাসমুদ্র হয়ে উঠেছেন। তার লেখা কোনো বই নেই; অথচ পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একাডেমিক দর্শনশাস্ত্রের মৌলিক বিষয় হিসাবে সক্রেটিস পড়ানো হয়। সবচেয়ে বড় কথা, তার চিন্তা কখনো থেমে থাকেনি; বরং তার চিন্তা ক্রমাগত শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে সব যুগে, সব কালে প্রাসঙ্গিক হয়ে মানুষের মধ্যে নতুন নতুন চিন্তার জন্ম দিয়ে চলেছে।
খুব অদ্ভুত ছিল তার শিক্ষাপদ্ধতি। আধুনিক যুগের মতো দামি দামি ইট-পাথরের শক্ত গাঁথুনিতে গড়া শিক্ষায়তনে বসে তিনি শিক্ষাদান করেননি; অথচ তিনি তখনও শিক্ষক ছিলেন, মৃত্যুর পরও তিনি শিক্ষক হিসাবেই বেঁচে আছেন। আধুনিক পৃথিবীর চার দেওয়ালের বন্দিত্বের মধ্যে আবদ্ধ শিক্ষায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। শিক্ষাগ্রহণের জন্য কোনো ছাত্র তার কাছে কখনো আসতেন না; বরং তিনি যেখানেই যেতেন, সেখানেই জন্ম হতো ছাত্রদের। যেখানেই যাকে পেতেন, তাকেই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর বোঝানোর চেষ্টা করতেন। সে চেষ্টায় কোনো ক্লান্তি ছিল না, জড়তা ছিল না, স্বার্থের অসুখ ছিল না। শিক্ষক তো এমনই হবেন, মানুষের চোখে তাকে হয়তো কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না; কিন্তু তার মধ্যে নিভৃতে বাস করা দার্শনিকটা ছড়িয়ে থাকবেন মানুষের চারপাশে।
লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ইউডি/সুস্মিত

