উচ্চ মূল্যের কবলে দিশেহারা দেশের মধ্যবিও মানুষ

উচ্চ মূল্যের কবলে দিশেহারা দেশের মধ্যবিও মানুষ

আরেফিন সিদ্দিকী । বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই ২০২২ । আপডেট ০৮:২০

দীর্ঘদিন থেকেই উচ্চ মূল্যের কবলে পড়েছে দেশের মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়েছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের মানুষের আয় যেভাবে বাড়ছে, তার তুলনায় ব্যয় বাড়ছে তীব্রগতিতে। নিম্নবিত্তের মানুষ সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পেলেও বাড়তি ব্যয়ের চাপে পিষ্ট মধ্যবিত্তরা। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। চাল তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম এ সময়ে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। শাকসবজি থেকে শুরু করে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম লাগামহীন। একইভাবে বাড়ি ভাড়া, জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। বেড়েছে গ্যাসের দাম।

নতুন করে আবার পানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এদিকে শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে, বেড়েছে রিকশা ভাড়া। কিন্তু ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আয় বাড়ছে না। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমছে। অনেককে সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে তা জনসাধারণের জীবনকে কতটা বিপর্যস্ত করে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে কতটা প্রভাবিত করে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় দেশে ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর আগে করোনাকালে দেশে তিন কোটির বেশি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছিল। করোনার পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। নতুন দরিদ্র মানুষের পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে না। দরিদ্র মানুষ টিকে থাকার চেষ্টা করছে। করোনার শুরু থেকে এ পর্যন্ত সময়ে গ্রাম ও শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় কমা-বাড়া, খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা, কর্মসংস্থান, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোর জন্য মানুষের প্রচেষ্টা, পেশার পরিবর্তনসহ নানা বিষয় আলোচনায় এসেছে।

নানা অজুহাতে যারা দাম বাড়ায়, সমাজে তারা কোন শ্রেণির মানুষ তা সবাই জানে। এরা অতিলোভী অসৎ লুটেরা। এরা দেশের মানুষকে জিম্মি করে একেক সময় একেক অজুহাত তুলে পকেট কাটে। এখন যে দেশের প্রতিটি পণ্যের উচ্চমূল্য এদের কারণেই। এরা অপরাধী, এরা বাজার সন্ত্রাসী। এ দেশের একশ্রেণির অসৎ ও অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার কারণেই এই বিপন্ন অবস্থা। জনগণকে বারবার দুর্ভোগ ও অসহায়ত্বে ফেলে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত কাজ নয়। বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কী কারণে দাম বাড়ানো হয়েছে তা বোধগম্য নয়। গরিব ও মধ্যবিত্তের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাদের ইচ্ছে পূরণের জায়গাগুলো ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। তাদের মৌলিক চাহিদা ও স্বপ্ন প্রতিনিয়ত মাঠে মারা যাচ্ছে। তারা হয়ে পড়ছে হতাশাগ্রস্ত দিশেহারা। ছোট হয়ে যাচ্ছে তাদের মনও। কেবল অর্থনৈতিক কারণে অনেক পরিবারে ভাঙন দেখা দিয়েছে। শারীরিক নির্যাতন, হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। উচ্চ মূল্যের কারণে জীবনযাত্রার মান নেমে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত এখন নিজের পতন নিজেই দেখছে আর হতাশ হচ্ছে।

মূলত মধ্যবিত্তের জীবন এখন হতাশার কাফনে মোড়া। কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন ব্যবসা। মধ্যবিত্তের সংকট সমস্যা টানাপড়েন যেভাবেই বলি বা ব্যাখ্যা দিই না কেন, এটা আর্থসামাজিক ও পারিবারিক। তবে মূল সংকট হচ্ছে অর্থনৈতিক। নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে বাসা ভাড়া, বাস ভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্তের অবস্থা বড়ই করুণ। তাদের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে এখন বিশাল ব্যবধান। কেবল অর্থের কারণেই মধ্যবিত্ত তাদের সন্তানদের দেশের নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াতে পারে না, বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা তো দূরের কথা। মনে রাখতে হবে, দেশে যে দরিদ্র জনসংখ্যা রয়েছে- যা মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। করোনাকালে ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এর হার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এটা হবে এক অশুভ সংকেত। সুতরাং সময় থাকতেই সাবধান হওয়া সমীচীন।

লেখক: সমাজ গবেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading