রোহিঙ্গাদের দুঃখ-কষ্ট আর কতো, শেষ কবে ?
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ৩১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:৫৫
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির প্রত্যাবাসন কী আদৌ হবে, নাকি মাতৃভূভি ছেড়ে দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই তারা জীবন অতিবাহিত করবে। লাখো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মহান মানবতার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে সে প্রশংসা বিশ্বমহল জানান দিলেও প্রত্যাবাসন ইস্যুতে নেই তাদের কোনো আগ্রহ। আর এত বিপুল জনগোষ্ঠিকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশও পড়েছে মহা সংকটে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ইস্যুতে এখন প্রায় নিশ্চুপ। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির।
বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত গোটা বিশ্ব। তার ওপর চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে এতটাই চাপে ফেলেছে যে অধিকাংশ দেশই এখন চরম সংকটকালীন সময় অতিবাহিত করছে। বাংলাদেশও এই পর্যায়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যু এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার ছোট্ট এই দেশের জন্য বাড়তি ১১ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা বহন করা অনেক কঠিন। নিজ দেশে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের মানবতার দৃষ্টিকোন থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই আশ্রয় বিশ্বে এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে, কিন্তু এর পরবর্তী পদক্ষেপ তথা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক কোনো হস্তক্ষেপ এখনও পায় নি বাংলাদেশ। জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। গত জুনেও রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে একটি প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে। কিন্তু সংস্থাটির কার্যক্রমের দুর্বলতা ও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যাবাসন ইস্যুতে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা হতাশজনক: বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাবাসন যত বিলম্বিত হবে, বাংলাদেশ তত সংকটের মুখে পড়বে। এ সংকট চলমান থাকলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাদক, মানব পাচার, যৌন অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, হত্যা, কট্টরপন্থা ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বাড়বে। বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। আশিয়ান সদস্যদেশ ও এশীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ চীন ও জাপানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। চীনের কাছ থেকে এখনো আশানুরূপ কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে গত ২৪ জুলাই জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় প্রতিমন্ত্রী হোন্ডা তারো বাংলাদেশ সফরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে সমর্থন জানিয়েছেন। এর আগে গত ১৮ জুলাই জাকার্তায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো এলপি মারসুদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ইন্দোনেশিয়া ও আশিয়ানের সমর্থন চাওয়া হয়। সবশেষ ২৮ জুলাই ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে ‘বন্ধু’রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকায় চরম হতাশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের পর মিয়ানমারে বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর বিনিয়োগ ও ব্যবসা বেড়েছে।
ওদের কষ্ট দেখার কেউ নেই: আঞ্চলিক, বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-কষ্ট ধেখার যেনো কেউ নেই। কেননা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে কোনো সংস্থা বা রাষ্ট্রর বিন্দুপরিমাণও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অথচ এই বিষয়ে মিয়ানমারকে বৈশ্বিক চাপ দেয়া গেলে সমস্যার সমাধান ইতোমধেই হয়ে যেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যেসব দেশ ও নেতা এ ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করবে, তারাই মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে জড়িয়েছে। কাজেই মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা তাদের জন্য কঠিন। তারা মনে করছে, রোহিঙ্গা সমস্যায় কিছু ত্রাণসহায়তা ও তহবিল ঘোষণা করলেই চলে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিষয়ে নিজেকেই ভাবতে হবে।

‘রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশ ভিকটিম’
মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ও দোসরদের নির্যাতনে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গার কারণে বাংলাদেশ ভুক্তভোগী হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে শনিবার (৩০ জুলাই) বাংলাদেশ ইউনাইটেড নেশনস মাইগ্রেশন নেটওয়ার্ক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত মানব পাচার প্রতিরোধে জাতীয় পরামর্শক সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। মন্ত্রী বলেন, মানব পাচার বিষয়ে বাংলাদেশ আজ পরিস্থিতির শিকার। বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া রোহিঙ্গা নাগরিকদের কারণে ভিকটিম (ভুক্তভোগী) হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের সম্পদ সীমিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও সহায়তা নিশ্চিত করছে, কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, এই বাস্তুচ্যুত নাগরিকরা আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশ তাই দ্রুতই মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চায়।
তিনি বলেন, আমেরিকার মানবপাচার সূচকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্তরে অবস্থান করছে। এটি বাংলাদেশের প্রতিনিয়ত মানব পাচারের বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রতিফলন। মানব পাচার ইস্যুকে আমাদের সরকার ও প্রচলিত আইন গুরুত্ব দিয়ে দেখে। দিবসটি উদযাপন নিয়ে কামাল বলেন, প্রথমবারের মতো এই দিনটি উদযাপনের অর্থই হচ্ছে মানব পাচার প্রতিরোধে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। মানব পাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধের বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। এই অপরাধ রোধে সরকার আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।
পশ্চিমাদের অনুরোধে বন্ধ হয়নি ইন্টারনেট: পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ১০ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের পাচার রোধে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উচ্চ গতির মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমাদের অনুরোধে তা করা যায়নি। শনিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে বাংলাদেশ ইউনাইটেড নেশনস মাইগ্রেশন নেটওয়ার্ক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত মানবপাচার প্রতিরোধে জাতীয় পরামর্শক সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন তিনি।

এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, সরকার নাগরিকদের মানবপাচারের শিকার হওয়া থেকে বিরত রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিভিন্ন সময়ে আমাদের উদ্যোগ ও প্রণীত নীতি তাই ইঙ্গিত করে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে আমরা বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছি।
তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবপাচারকারীরা আরও বেশি ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এবং অংশীজনরা প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের প্রতিরোধ করতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে মানবপাচার একটি ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম এবং আমাদের থেকে অন্যদেশের প্রযুক্তি আরও উন্নত হতে পারে; মানবপাচারকারীরা যার সুবিধা নিতে পারে। সেজন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো যেন উন্নত-প্রযুক্তি হাতে পাওয়ার সুবিধা পায়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমেরিকাকে ইমিগ্রেন্টদের দেশ বলা হয় এবং ইমিগ্রেন্টরা সেখানে বোঝা না। ইমিগ্রেন্টরা দেশটির ইনোভেশন ও উন্নয়নের উৎস। তারা স্থানীয়দের কর্মসংস্থান কমিয়ে না এনে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। আমরা যদি মানবিক বোধের জায়গা থেকে একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে এই সংকট থেকে উত্তরণ করতে পারবো।
সংকট মোকাবিলায় দরকার আঞ্চলিক পরিকল্পনা: গত বৃহস্পতিবার ড. এ কে আব্দুল মোমেন অপর এক অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা ইস্যু মোকাবিলায় আঞ্চলিক পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি খুবই জটিল অবস্থায় আছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে রোহিঙ্গারা মাদক ও মানব পাচারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তারা জঙ্গিবাদের সাথেও জড়িয়ে পড়তে পারে। যদি তাদেরকে দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো না যায়, তাহলে জঙ্গিবাদ গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সুতরাং, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় এই অঞ্চলের সবগুলো দেশেরই উচিত সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে আগে থেকেই তৈরি থাকা।
দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগও ব্যর্থ হওয়ার নেপথ্যে: রাখাইনে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মক্লা চালিয়ে ভীতিকর অবস্থা তৈরি করছে মিয়ানমার সরকার। যার ফলে প্রত্যাবাসনের দ্বিপক্ষীয় (বাংলাদেশ-মিয়ানমার) উদ্যোগও ব্যর্থ হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে একজন রোহিঙ্গাকেও রাখাইনে পাঠানো যায়নি। কারণ, মানবিক নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব ছাড়া কোনো শরণার্থীকে ফেরত পাঠানো যায় না। কেউ চায় না, নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে শরণার্থী হয়ে থাকতে। রোহিঙ্গারাও বিশ্বাস করে, প্রত্যাবাসন হলে তাদের যন্ত্রণার অবসান ঘটবে। বিস্ময়কর হলো, বাংলাদেশ প্রায় ৮ লাখ ৭৬ হাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য নিবন্ধন করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫ হাজার রোহিঙ্গার পরিচয় মিয়ানমার সরকার নিশ্চিত করেছে। আর বাকিদের বাংলাদেশের (চট্টগ্রাম) বাসিন্দা বলে দাবি করা হয়েছে। কোনো দেশ শরণার্থী সংকটে পড়লে এটি শুধু আশ্রয়দাতা দেশের দায়িত্ব নয়। এটি পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

পাঁচ বছরেও শুরু হয়নি ফেরার প্রক্রিয়া: ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে রোহিঙ্গারা রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা শুরু করে। সে সময় প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় কক্সবাজারে। তবে, বাংলাদেশে আসার ৫ বছর পর একাধিকবার ঢাকা-নেপিদো বৈঠক হলেও, এখনো শুরু হয়নি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। দেশে ফেরার আকুতি বিশ্বকে জানাতে নীরব সমাবেশও করেছে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা। ‘গো হোম ক্যাম্পেইন’-শিরোনামে বিশ্ব শরনার্থী দিবসে ওই ক্যাম্পেইন করে তারা। পরিস্থিতি বিবেচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

সমন্বিত উদ্যোগই পারে রোহিঙ্গাদের হাসি ফেরাতে: অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দরকার সমন্বিত পদক্ষেপ। মিয়ানমারের সঙ্গে কার্যকর বৈঠক করতে হবে। শুধু বাংলাদেশই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সহ পশ্চিমা দেশগুলোর জোড়ালো ভূমিকা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘকে এই ব্যাপারে আরও কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে যেখানে সমাধানই যেনো টার্গেট হোক। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিৎ বারংবার মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলে কীভাবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে সেই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আর তাতেই লাখো রোহিঙ্গার মুখে হাসি ফুটবে, তারা ফিরে পাবে নিজেদের মাতৃভূমি, ওদের নতুন প্রজন্ম হাসবে প্রাণখুলে।
ইউডি/সুস্মিত

