জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: রেকর্ড তাপপ্রবাহে বাড়ছে শঙ্কা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: রেকর্ড তাপপ্রবাহে বাড়ছে শঙ্কা

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ০১ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০

সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি আলোচনার তুঙ্গে রয়েছে বৈশ্বিক তাপ্রবাহ। পৃথিবীর অনেক দেশেই একসঙ্গে বেড়েছে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা। আমেরিকা, ইউরোপ, চীন ও উপমহাদেশে বেড়েই চলছে ক্রমাশ তাপদাহ। একই সময়ে পৃথিবীর এতগুলো দেশে তাপমাত্রা এতটা বেড়ে গেল কেন? বৈশ্বিক তাপদাহ বাড়ার কারণ ও ভবিষ্যতের অশানি সংকেতের আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন সাইফুল অনিক।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যেন কারখানার বয়লার চেম্বারের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দিনে দিনে। তীব্র দাবদাহ, দাবানল আর খরায় পুড়ছে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল। আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে ইন্ডিয়া মহাসাগর অবধি আবহাওয়ার ওই অস্বাভাবিক অসহনীয় উষ্ণ আচরণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে প্রাণীজগৎ। তীব্র দাবদাহে গরম থেকে বাঁচতে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বাতিল করা হয়েছে হাসপাতালগুলোর নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট। ট্রেনের শিডিউল কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তীব্র দাবদাহে গেলে গেছে উড়োজাহাজের রানওয়ে। তাপপ্রবাহের কারণে ফ্রান্স, গ্রিস, পর্তুগাল ও স্পেনে ছড়িয়ে পড়েছে দাবানল। আমেরিকা ও চীনেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ বইছে।

আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ গত ১৫ জুলাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাপপ্রবাহের একটি মাত্রচিত্র প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে, স্পেনের সেভেলি শহরের তাপমাত্রা উঠেছে ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস; ইরানের আহভাজ শহরের তাপমাত্রা উঠেছে ৪৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং চীনের সাংহাই শহরের তাপমাত্রা উঠেছে ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ বড় শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ছিল।

তাপদাহের নেপথ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি!
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো যত দিন অব্যাহত থাকবে, তত দিন পর্যন্ত তাপমাত্রা বাড়ার রেকর্ডও বাড়তেই থাকবে। এ বছর গ্রীষ্মে বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্প যুগের আগের তাপমাত্রার চেয়ে গড়ে ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, ২১০০ সালের মধ্যে এটি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়বে। তবে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এটি অনুমানমাত্র, বাস্তবতা আরও কঠিন হবে এবং তাপমাত্রা অস্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছাবে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন তাপপ্রবাহকে নৃশংস পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এই অস্বাভাবিক ও অসহনীয় গরম তাপমাত্রা সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে। তাপমাত্রা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছার ঘটনা ঘন ঘনই ঘটবে। পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপ এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই গত বছর প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এ তাপপ্রবাহ অসম্ভব ছিল।

৪০ বছরে তাপপ্রবাহ বেড়েছে সাত গুণ
আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার এক দল গবেষক দেখেছেন, ১৯৭৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে উত্তর গোলার্ধের মধ্য ও উচ্চ অক্ষাংশে তাপপ্রবাহ সাত গুণ বেড়েছে। একই গবেষণায় দেখা গেছে, তাপ বিকিরণের এই ধরনটি (উচ্চ তাপপ্রবাহ) বারবার তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্য ও পূর্ব এশিয়ায় সমসাময়িক সময়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্য এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরের ‘জেড স্ট্রিম’ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে আবহাওয়ার যে চিরকালীন ধরন, তা পশ্চিম থেকে পূর্বে সরে যাচ্ছে। আর সেই কারণেই বিশ্বের অনেক জায়গায় একযোগে তাপপ্রবাহ আঘাত করছে।

৩৬৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার আশঙ্কায় ব্রিটেন
ব্রিটেনের আবহাওয়া অফিসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশটিতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হতে পারে। আমেরিকার গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভবত ব্রিটেন বিগত ৩৬৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ১৬৫৯ সালের পর সম্ভবত ব্রিটেন এই পরিমাণ তাপমাত্রা দেখেনি। ব্রিটেনের ন্যাশনাল ক্লাইমেট ইনফরমেশন সেন্টারের পরিচালক মার্ক ম্যাকার্থি গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘আমরা পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী যে, ১৮৫০ সালের পর আমরা কখনোই একদিনে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করিনি।’ তবে অনেকে আবার ব্রিটেনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ইতিহাসে বিগত ৬ থেকে ৭ হাজার বছর আগের তাপমাত্রার সঙ্গেও তুলনা করেছেন।

দাবদাহে বন্ধ গুগল-ওরাকলের ডেটা সেন্টার
ব্রিটেনে দাবদাহের প্রভাব পড়েছে গুগল ক্লাউড ও ওরাকলের ওপরেও। সার্ভার শীতল রাখতে না পেরে কোম্পানির ডেটা সেন্টার বন্ধ করতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠান দুটি। ডেটা সেন্টার অপ্রত্যাশিতভাবে বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে বাড়তি তাপমাত্রাকেই দায়ী করছে গুগল-ওরাকল। গুগল ক্লাউড জানিয়েছে, সার্ভার শীতল রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল ব্রিটেনে অবস্থিত কোম্পানির ডেটা সেন্টারগুলোর একটি। এতে ওই অঞ্চলে সক্ষমতা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে কিছু কম্পিউটার বন্ধ করে রাখার কথা বলেছে গুগল। একই রকমের তথ্য দিয়েছে ওরাকলও।

কানাডায় তাপমাত্রা ৫০ ছুঁইছুঁই, দাবদাহে ২৩০ মৃত্যু
শীত ও তুষারপাতে অভ্যস্ত উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডা। তবে এবার ভিন্ন ভয়াবহ রূপ দেখছে দেশটি। দেশটিতে দাবদাহ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৪৮ থেক ৪৯ ডিগ্রী তাপমাত্রা দেশটির জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে মৃতের সংখ্যাও। সর্বশেষ খবর পর্যন্ত, দেশটিতে কমপক্ষে ২৩৩ জন মারা গেছেন।

আমেরিকায় সতর্কতা জারি
ইউরোপের পাশাপাশি তীব্র দাবদাহে নাকাল আমেরিকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলও। তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অসহনীয় গরমে অতিষ্ঠ দেশটির ২৮টি অঙ্গরাজ্যের অন্তত দশ কোটি মানুষ। পরিস্থিতি সামলাতে অঙ্গরাজ্যগুলোতে সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। আগের সপ্তাহগুলোর তুলনায় গরমের তীব্রতা আরো বাড়ছে। এদিকে, গরমের তীব্রতা দিন দিন বাড়তে থাকায় ঠান্ডা ও কোমল পানীয় পানের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি চলমান পরিস্থিতি সামলাতে দেশটির ২৮টি অঙ্গরাজ্যে সতর্কতা জারি করেছে আমেরিকা।

তাপদাহে নাকাল দক্ষিণ এশিয়াও
বছরের এই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় গরম অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এবার তাপদাহ তুলনামূলক আগে, মার্চের শুরুর কাছাকাছি সময় থেকে শুরু হয়ে অনেক এলাকায় এখনও চলছে। বর্ষা মৌসুমেও নেই তেমন কোন বৃষ্টিপাত।

জলবায়ু বিপর্যয়ের বছর ২০২১
দাবদাহ থেকে বন্যা। কখনো ভয়ংকর ঝড় কিংবা কৃষকের মাঠে খরা। চলতি বছর প্রায় সব ধরনের জলবায়ু বিপর্যয় দেখেছে বিশ্ব। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে দেখা গেছে রেকর্ড দাবানল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চলতি বছর এমন বিপর্যয় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। ফেব্রুয়ারিতে টেক্সাসে ভয়াবহ শীত দিয়ে শুরু। সব সময় গরম থাকা টেক্সাসে শীতে মারা যায় ১২৫ জন। জুনে আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে শুরু হয় খরা। আমেরিকা ও কানাডায় দাবদাহে মারা যায় অন্তত কয়েক শ মানুষ। জুলাইয়ে চীনের হিনান প্রদেশে বন্যায় মারা যায় ৩০০ জন। একই সময় জার্মানি বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে বন্যায় ২০০ জনের প্রাণহানি।

মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস ও দুর্ভিক্ষের শঙ্কা
যে কারণেই তাপপ্রবাহ বাড়ুক না কেন, এর পরিণতি হবে বিপর্যয়কর। তীব্র দাবদাহে মানুষ মরতে থাকবে। বিপুলসংখ্যক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যাবে। ফলে কমে যাবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদন। তাপপ্রবাহের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হবে। এ বছর বসন্তে যেমনটা হয়েছে ইন্ডিয়াতে। দেশটির উত্তর প্রদেশে ফলন কমে গেছে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। যদি উৎপাদন হ্রাসের এই ঘটনা অন্যান্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বিশ্বব্যাপী খাদ্যঘাটতি দেখা দেবে। এ ছাড়া পৃথিবীর ‘রুটির ঝুড়ি’ হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতেও যদি তাপপ্রবাহজনিত কারণে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যের দাম বেড়ে যাবে। পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ নেমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

উত্তরদক্ষিণ । ০১ আগস্ট ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

রেকর্ড তাপদাহে গলছে হিমবাহ
রেকর্ড তাপদাহে বিশ্বের অধিকাংশ হিমবাহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গলে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপের আল্পস পর্বতমালায় রেকর্ড পরিমাণে হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটছে। আল্পসের তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০.৩ সেলসিয়াস উষ্ণ হচ্ছে, যা বৈশ্বিক গড় থেকে প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত। বিজ্ঞানীরা জানান, আল্পসের হিমবাহগুলো সর্বোচ্চ ক্ষতির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

হিমাঙ্কের নিচে থাকা অ্যান্টার্কটিকায় তাপমাত্রা এখন ১৬ ডিগ্রি
চলতি মাসে অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে তাপমাত্রা ছিল ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা নজিরবিহীন বলেই জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, গ্রীষ্মকালেও ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচেই থাকে। অন্যপ্রান্তে, ইউএস ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টারের তথ্য অনুসারে, গ্রিনল্যান্ডে শুধুমাত্র ১৫ থেকে ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে একেক দিনে প্রায় ৬ বিলিয়ন টন পানি গলেছে। নাসার সতর্কবার্তা, যে হারে বরফ গলছে তাতে এক দিন যদি গ্রিনল্যান্ডের সব বরফ গলে যায়, তবে পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর জলস্তরের উচ্চতা ২৩ ফুট বেড়ে যাবে। কেন বেড়েছে এ উত্তাপ? তার কারণ হিসেবে বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা আঙুল তুলেছেন বিশ্ব উষ্ণায়নের দিকে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading