দেশে কাঁচা মরিচের দাম বাড়ে, জীবনের দাম বাড়ে না
চিররঞ্জন সরকার । বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ০৮:২০
পাতে কাঁচা মরিচ ছাড়া অনেক বাঙালির ভোজনই হয় না। আকস্মিকই ডাবল সেঞ্চুরি পার করেছে কাঁচা মরিচের দাম। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২১০ থেকে ২৪০ টাকায়। কয়েক দিন আগেও এর কেজি ছিল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। এটা সোনাও না, ডলারও না। বিদেশি কোনো জুস বা সঞ্জীবনী সুধাও নয়। তাহলে কাঁচা মরিচের দাম কী করে প্রতি কেজি ২৬০ টাকা হয়? ভদ্রলোকেরা এ জিনিস বড় বেশি খায়ও না। চাষাভুষারা খেলেও ভাত কিংবা মুড়ির মতো খায় না। একটা-দুটো কাঁচা মরিচ হলেই তাদের হয়ে যায়। তার পরও এ জিনিসের এত দাম কেন? এটা কি কোনো বিশেষ ষড়যন্ত্র? দেশের মানুষকে ঝালবঞ্চিত করে নিস্তেজ বানানোর কোনো প্রকল্পের অংশ? বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।
যে কাঁচা মরিচ ৩০-৪০ টাকা কেজি হওয়া সংগত, সেটি এখন সেঞ্চুরি ছাড়িয়ে ডাবল সেঞ্চুরি পার করেছে। কোথাও কোথাও ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বলেও গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। গত কয়েক দিনে দামের পারদ ওঠানামা করলেও ‘উত্তাপ’ এখনো বিপৎসীমার ওপরেই রয়েছে। বৃষ্টিপাত ও বর্ষার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় মরিচের দাম বেড়েছে। আবার এ বছর অনাবৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলের মরিচের খেত নষ্ট হয়েছে। ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানিও ঠিকঠাকমতো হচ্ছে না। ফলে দামের এই ঊর্ধ্বগতি। হবেও হয়তো। যদিও আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার জন্য কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ লাগে না। এটা এমনি এমনিই বাড়ে, বাড়তেই থাকে। সুচতুর ব্যবসায়ীরা নিত্যনতুন কারণ দেখিয়ে জিনিসের দাম বাড়িয়ে দেন। আর আমরা যত কষ্টই হোক, সেই বাড়তি দাম দিয়ে জিনিসপত্র কিনতেই থাকি। বেশি দামের কারণে কেউ কিনছে না, এমন উদাহরণ আমাদের দেশে খুব একটা নেই।
আমাদের দেশে জীবনের দাম বাড়ে না, সৃজনশীলতা বা স্বপ্নের দাম বাড়ে না, এমনকি মানুষের দামও বাড়ে না, বাড়ে শুধু বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। এই দাম শুধুই বাড়ে। কারণে বাড়ে, অকারণে বাড়ে। বাড়তেই থাকে। জিনিসপত্রের দাম বাজেটের আগে বাড়ে, পরেও বাড়ে। ঝড়, বৃষ্টি হলে বাড়ে, না হলেও বাড়ে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম বাড়লেও বাড়ে। ভোটারসহ নির্বাচন, ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের শাসনামলে বাড়ে, এমনকি অনির্বাচিত সরকারের আমলেও বাড়ে। রমজানের আগে বাড়ে, পরেও বাড়ে। ঈদে বাড়ে, বর্ষায় বাড়ে, সিজন-অফসিজন সব সময় বাড়ে। করোনা এবং ডেঙ্গুর ঋতুতেও বাড়ে। ইউক্রেন যুদ্ধে বাড়ে, তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের বিরোধ সৃষ্টি হলেও বাড়ে।
আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, আমদানি শুল্ক কমিয়ে আমদানি বাড়ালে কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম কমলেও আমাদের দেশে দাম কমে না। এমনকি দেশে বাম্পার ফলন হলেও খাদ্যশস্যের দাম কমে না। মানুষের বয়সের মতো, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মতো, আমাদের জীবনের সামগ্রিক হতাশার মতো জিনিসপত্রের দাম কেবল বাড়ে, বাড়তেই থাকে। দাম অবশ্য আপনাআপনি বাড়ে না, বাড়ানো হয়। বলা বাহুল্য, এ দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, আড়তদার, চাঁদাবাজ, আন্তর্জাতিক বাজার ইত্যাদির ভূমিকা থাকলেও সরকারি নীতির ভূমিকাও উপেক্ষণীয় নয়। আশার কথা হচ্ছে, এসব নিয়ে মানুষের মধ্যেও বড় বেশি ক্ষোভ নেই। এরও অবশ্য কারণ আছে। আমাদের দেশের শাসকরা নানা কৌশলে মানুষের সহ্যশক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে যদি একটু একটু করে নির্যাতন করা হয়, আঘাত করা হয়, তাহলে একসময় তা সয়ে যায়। এরপর আঘাতের মাত্রা বাড়ালেও খুব একটা ভাবান্তর হয় না।
আমরা কাঁচা মরিচের আলোচনায় ফিরে আসি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে যখন সূর্য অস্ত যেত না, সাহেবরা তখন নাকি এই একটা জিনিসকে যমের মতো ভয় পেতেন। অথচ তারাই মরিচকে গ্লোব-ট্রটার বানিয়েছিলেন। মুখে দিলে জ্বলে যায়, বাপ রে কী সৃষ্টি, এই ফলটির আদিভূমি, যত দূর জানা যায়, দক্ষিণ আমেরিকা। অন্তত ১০ হাজার বছর আগেই তার ব্যবহার ছিল সেখানে। তার পর মরিচের কায়কারবার ঘটে পনেরো শতকে কলম্বাস ও সহশিল্পীবৃন্দের মাধ্যমে। পতুর্গিজ বণিকরাই মরিচ নিয়ে গেলেন নানা দেশে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের উপকূলে কেন রান্নাবান্নায় মরিচের এমন দাপট, বুঝতে কোনো অসুবিধে নেই। তবে মরিচের দাম বাড়ানোর পেছনে ‘অন্য উদ্দেশ্য’ আছে। বন্যা, খেত নষ্ট হওয়া, ভারত থেকে না আসা, এগুলো ভাঁওতা মাত্র। বুঝতে হবে যে, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে যতটুকু তেজ বা ঝাঁজ, তা মোটামুটি পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচের গুণ। এখন পেঁয়াজ-মরিচের সীমাহীন দামের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই দুটি জিনিস খাওয়া বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে মানুষের সামগ্রিক তেজ বা বারুদ আরো নিম্নগামী হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। শাসকদের অবশ্য তেজহীন মানুষই পছন্দ। তেজহীন মানুষ প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ইত্যাদি করে না। ব্যারামওয়ালা মুরগির মতো ঝিমায়। পুরো জাতিকে নিস্তেজ ঘুমকাতুরে বানাতেই কি কাঁচা মরিচের এমন দাম?
লেখক: রম্য লেখক।
ইউডি/সুস্মিত

