গৌরবোজ্জ্বল ভাবমর্যাদা রক্ষার্থে পুলিশের সংযত আচরণ বাঞ্ছনীয়
রাকিবুল পাটোয়ারী । বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ০৮:৩০
দেশের এগিয়ে চলা প্রতিটি পর্বে বাংলাদেশের পুলিশের ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে এ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। পরবর্তী ৫০ বছরের পথচলায় পুলিশ সে ঔজ্জ্বল্য শুধু হারিয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারের সময় বিরোধী দল বিশেষ করে সর্বহারা পার্টি ও জাসদের বিরুদ্ধে সরকারি দমন-পীড়নে রক্ষীবাহিনীর সাথে পুলিশের ভূমিকাও কালো অধ্যায় রচনা করে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এ বাহিনীর ভূমিকা ইতিবাচক ছিল বলা যাবে না। বরং ছাত্রমিছিলে ট্রাক তুলে দেয়াসহ নানা পীড়নমূলক পদক্ষেপের কারণে উল্টোটাই সত্য। এগুলো ইতিহাসের অংশ। কিন্তু গত ১৫ বছরে বিরোধী দলের সংবিধানস্বীকৃত গণতান্ত্রিক অধিকার নস্যাৎ করতে পুলিশ যে মারমুখী আচরণ করে আসছে; তা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে বললে অত্যুক্তি হবে না। সম্ভাব্য নাশকতার অজুহাত তুলে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ভণ্ডুল করে দেয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে।
কথায় কথায় মামলা-হামলা ও বানোয়াট মামলা চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা এমনকি ঔপনিবেশিক পুলিশের মধ্যেও দেখা যায়নি; যেটি বর্তমান পুলিশ বাহিনীর সাধারণ কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে গাড়ি ভাঙচুর বা পুলিশের কাজে বাধাদানের অজুহাত তুলে মামলা রুজু করা হয়। এসব মামলায় এমনো নেতাকর্মীর নাম ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে; যারা হয়তো ওই সময় দেশে ছিলেন না। এমনকি মৃত ব্যক্তির নাম এজাহারে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে এমন দৃষ্টান্তও আছে। মিডিয়া এর নামকরণ করেছে গায়েবি মামলা। ঘরোয়া বৈঠক করতে গেলে নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে- এমন অভিযোগ তুলে গ্রেফতার নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, এখনো ঘটছে। সরকারি পেটোয়া বাহিনীর সাথে কাঁধ মিলিয়ে রাজধানীতে অরাজনৈতিক নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি পণ্ড করতে পুলিশের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। এগুলো কোনোভাবে একটি স্বাধীন দেশের গণমুখী পুলিশ বাহিনীর ভাবমর্যাদার উপযুক্ত নয়। এসব করতে গিয়ে পুলিশের যে মূল দায়িত্ব তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলার বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিলে বিষয়টি স্পষ্ট। সমস্যা হলো, সরকার, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির সব কিছু যখন একাকার করে ফেলা হয় তখন এককভাবে পুলিশ বাহিনীকে দোষারোপ করা অর্থহীন।
গত রবিবার রাজধানীর শাহবাগে পুলিশ বিনা উসকানিতে হামলা চালিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর সমাবেশ ভণ্ডুল করেছে। হামলায় বেশ কিছু তরুণ শিক্ষার্থী আহত হন। পুলিশ বলেছে, সমাবেশকারীরা প্রথমে পুলিশের ওপর চড়াও হয়। এ বিবৃতির পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। লক্ষণীয়, এটি কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ ছিল না। ‘জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও লুটপাটের’ প্রতিবাদে সমাবেশের ডাক দেয়া হয়। দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের নজিরবিহীন এ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কী তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা দলমত নির্বিশেষে সবাই উপলব্ধি করছেন। স্বাভাবিকভাবে প্রতিবাদ হচ্ছে, মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে হতাশা ব্যক্ত করতে। মূলত এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো প্রত্যেক সচেতন মানুষের কর্তব্য বলে আমরা মনে করি। প্রতিবাদ না করার অর্থ গণমানুষের স্বার্থের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া। এ অবস্থায় পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের সময় এসেছে বলে আমরা মনে করি। পুলিশ বাহিনী দেশের মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা বিক্ষোভের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিপক্ষে বলে আমরা মনে করি না। বরং দেশের গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার অংশ। সুতরাং পুলিশ নিজেদের ভাবমর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে এটিই প্রত্যাশা।
পুলিশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা ভুলে গেলে চলবে না। হলিআর্টিজানে জঙ্গি হামলাকে পরাস্ত করতে একাধিক পুলিশ অফিসারকে জীবন দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের জঙ্গি দমনে পুলিশের ভূমিকা সারা বিশ্বে নন্দিত। বাংলাভাই থেকে শুরু করে সকল জঙ্গি দমনে সফলতা দেখিয়েছে পুলিশ। হেফাজতের তান্ডবকে প্রতিহত করে ঢাকা মহানগরীর শান্তি বজায় রাখতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। তারপরও ওসি প্রদীপের মত কিছু অপেশাদার অসৎ পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকায় গৌরব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তবে এবার করোনাযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা সারা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশকে এই জায়গাটা ধরে রাখতেই হবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

