নারী পাচার রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন

নারী পাচার রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন

মোহাম্মেদ ফজলুল হক । শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১১:১৫

প্রযুক্তির অপব্যবহার জনজীবনে অভিশাপ হয়ে দেখা দিচ্ছে। নারী পাচারের ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখছে। পাচারকারী চক্র টিকটক, লাইকি, ফেসবুক, ইমো, ভাইবার, ডিসকড, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির অ্যাপস ব্যবহার করে পাচারের জন্য নারীদের সংগ্রহ করছে। দালাল নিয়োগ করেও নানা কৌশলে নারীদের পাচার করে দিচ্ছে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, কাতার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে। নারী পাচারের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ৩০টি বা তারও বেশি নারী পাচারকারী চক্র সক্রিয়। মধ্যপ্রাচ্যে গৃহপরিচারিকার চাকরির নামে নারী পাচারের ঘটনাও ঘটছে এবং এর সঙ্গে জড়িত আদম ব্যাপারি নামের মানব পাচারকারী চক্র।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বরাতে একটি বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ বছরে ৫০০ ও আট বছরে ১ হাজার নারী পাচারের শিকার হয়েছেন, যাদের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। ২০২০ সালে দেশে মানব পাচারের যে ৩১২টি মামলার বিচার হয়, তার ২৫৬টি ছিল নারী পাচার ও যৌন সহিংসতা-সংক্রান্ত। এছাড়া গত চার বছরে বাংলাদেশ থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার নারী সউদী আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গেছেন। যার একটি অংশ যৌন নিপীড়নসহ নানামুখী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দেশ থেকে নারী পাচারের যত ঘটনা ঘটে তার একটি ক্ষুদ্র অংশই গণমাধ্যমে আসে। সাধারণত পাচারের শিকার যারা তার অধিকাংশের পরিবারের সদস্যরা থানায় অভিযোগ করা কিংবা গণমাধ্যমের শরণাপন্ন হওয়ার মতো বোধশক্তির অধিকারী নন। ফলে দেশে নারী পাচারের ঘটনা অহরহ ঘটলেও তার ভয়াবহ আকার সম্পর্কে অবহিত নন সমাজের সচেতন মানুষও। নারী পাচার বন্ধের প্রধান উপায় হলো গণসচেতনতা সৃষ্টি। এ ক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা হাজার হাজার নারীর সর্বনাশ ডেকে আনছে। যার অবসানে সরকারসহ সব সামাজিক শক্তিকে সক্রিয় হতে হবে।
এশিয়ার মধ্যে নারী পাচার ঘটনার দিক থেকে নেপালের পরই বাংলাদেশের স্থান।

যতই দিন যাচ্ছে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে নারী পাচার। কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না এ পাচার। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান কনকর্ড অ্যাপেক্স রিক্রুটিং এজেন্সি। প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র, তালাকপ্রাপ্ত, স্বামীর সংসারে নির্যাতিত নারীদের টার্গেট করে বিদেশে ভালো বেতন ও বিনামূল্যে হজ করার প্রলোভন দেখাতো। এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার নারী শ্রমিককে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছে। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর প্রতিশ্রম্নতির কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করা হতো না, বরং বিভিন্ন অবৈধ কাজে বাধ্য করা হতো নারীদের। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

এছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে নারী পাচার এবং তরুণীকে পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের হোতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভারতে পাচার হওয়া এক কিশোরী দেশে ফিরে হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা করেছেন। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের দুই চক্রের যোগসাজশে পাচারের কাজটি চলত। পাচারের শিকার নারীদের তারা বিভিন্ন অনৈতিক কাজে বাধ্য করত। উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করতেন তারা। আর এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রম্নপ খুলে বিভিন্ন বয়সের নারী ও তরুণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। এই গ্রম্নপে যেসব তরুণী ছিলেন, তাদের মডেল বানানোসহ ও বিভিন্ন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করতেন। পরবর্তী সময়ে ভারতে বিভিন্ন সুপারশপ ও বিউটি পার্লারে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বস রাফির সহযোগিতায় এসব তরুণীকে বিদেশে পাচার করা হতো। ভারতে তাদের পাচারের পর প্রথমে একটি সেফ হাউসে নেওয়া হতো। সেফ হাউসে তাদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে এবং জোর করে মাদক সেবন করতে বাধ্য করানো হতো। মাদক সেবনের পর তাদের জোরপূর্বক যৌন নির্যাতন করে ভিডিও ধারণ করা হতো। যাতে তাদের পরবর্তী সময়ে বস্ন্যাকমেইল করা যায়। এই চক্র এ পর্যন্ত দেড় হাজার নারী পাচার করেছে।

দেশের মধ্যে কত সংখ্যক নারী পাচার হচ্ছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব পাওয়া যায় না। তবে জাতিসংঘের এক পরিসংখ্যানে বিশ্বের ৩৪ শতাংশ নারী নিজ দেশেই পাচার হয়। আর ৩৭ শতাংশ আন্তঃসীমান্ত পাচারের শিকার। পাচার হওয়া নারীদের অনেক সময় তালা মেরে বন্দি করে রাখা হয়। তথ্য মতে, ৫ বছরে বাংলাদেশের ৫ লাখ নারী বিদেশে পাচার হয়েছে। যাদের গন্তব্য ভারত, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ। সব চেয়ে নেতিবাচক দিক হচ্ছে, দেশে ফিরে এলেও পাচার হওয়া নারীকে সমাজে কখনোই সহজভাবে গ্রহণ করে না। আত্মীয়স্বজনরাও তাদের দেখে খারাপ দৃষ্টিতে। দেশের সীমানাগুলোতে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে, যেন কোনো নারী দেশের বাইরে পাচারের শিকার না হন। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে নজর দেওয়া উচিত স্থানীয় প্রশাসনের। প্রশাসনের সাহায্য না পাওয়ায় পাচাররোধ সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি ফিরে আসা মেয়েদের স্বাবলম্বী করার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে।

লেখক- কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading