চা শ্রমিকদের মুজুরি বাড়ানোর আন্দোলন যৌক্তিক
শওকত জামান । বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১১:১৫
চা শিল্পের উন্নতি হলেও বদলাচ্ছে না চা শ্রমিকদের জীবন। শ্রম শোষনের শিকার হয়ে আসছে ব্রিটিশ আমল থেকে আজঅব্দি। সারদিন কাজের পর একজন চা শ্রমিকের আয় হয় ১২০ টাকা। দ্রব্যমুল্য পাল্লা দিয়ে বাড়লেও সেভাবে বাড়েনা তাদের বেতন। নেই নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক জাতিগত পরিচয়। লেখাপড়ার সুযোগ নেই। নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থাও। রয়েছে চিকিৎসার অভাব। কাজ করতে গিয়ে অঙ্গহানি ঘটলেও কোনো সাহায্য নেই। ৭ ফুট বাই ১৪ ফুট ঘরে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতরভাবে বসবাস করতে হয়। ৫-৬ সদস্যের অনেক পরিবার আছে যেখানে ১ জন কাজ পাচ্ছে ১২০ টাকা আর বাকিরা এই টাকার উপর নির্ভর করেই দিন পাড়ি দিতে হয়। ছোট ভাঙাচোরা ঘরে থাকতে হয় গবাদি পশুসহ সন্তানদের নিয়ে। বাগান কর্তৃপক্ষের ঘর মেরামত করে দেয়ার কথা থাকলেও তা হয় না বছরের পর বছর। তাদের নেই নিজস্ব কোনো জায়গা। বাগানে কাজ না করলে থাকার জায়গা হারানোর ভয়। এভাবে নানা বঞ্চনা দু:খ্য দূর্দশার মধ্যে কাটছে বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের জীবন।
হতভাগ্য চা শ্রমিকদের ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৩০ এর দশকে সুন্দর জীবনযাত্রার লোভ দেখিয়ে এদেরকে বাংলাদেশে এনেছিল চা কোম্পানীর মালিকরা। কম দামে শ্রম কিনে অধিক মুনাফা অর্জন করার লক্ষ্যে ইংরেজ ব্যবসায়িরা আজীবন কাজের শর্তে চুক্তিবদ্ধ করে ভারতের বিহার, মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ, ওড়িশা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে কানু, তেলেগু, লোহার, রবিদাস, গোয়ালাসহ প্রায় ১১৬টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিল। গাছ নাড়লে টাকা পাবে কিন্তু চা-শ্রমিকরা এ অঞ্চলে এসে দেখে, গাছ নাড়লে টাকা পাওয়া তো দূরের কথা; হিংস্র জীবজন্তুর প্রতিকূল পাহাড়-জঙ্গলময় পরিবেশে নিজের জীবন বাঁচানোই দুঃসাধ্য ব্যাপার। অনাহারে-অর্ধাহারে, অসুখে-বিসুখে এক বীভৎস জীবনের সম্মুখীন হয় তারা।
বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় প্রধান ফসল হচ্ছে চা। জিডিপির ১ শতাংশ আসে এই চা থেকে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্ববাজারে চায়ের রফতানি দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও বদলাচ্ছে না চা শ্রমিকদের ভাগ্য। অনুন্নতই রয়ে যাচ্ছে তাদের জীবনযাত্রার মান। বাংলাদেশের ১৬৬টি চা বাগানে কয়েক লক্ষ শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সারাদিনে রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে দিনশেষে মজুরি পেতে হয় ১০২-১২০ টাকা, যা দিয়ে একটি পরিবারের ভরণপোষণ তো দূরের কথা, একজন মানুষের পকেট খরচ চালানোও দুষ্কর। দেশের অন্য সব খাতে শ্রমিকদের মজুরি মোটামুটিভাবে বাড়ানো হলেও চা শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হচ্ছে না। অত্যন্ত কম মজুরি হওয়ায় পরিবারের ছোট বড় প্রায় সব সদস্যদের লেগে থাকতে হয় কর্মে। ফলে তাদের শিশুরা পারছে না হাতে কলমে শিক্ষিত হয়ে উঠতে। বলতে গেলে তাদের সবাই মৌলিক অধিকারগুলো থেকেও বঞ্চিত। একরকম দাসের মতো জীবন কাটালেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উৎপাদন ধরে রেখেছেন চা শিল্পীরা।
বিট্রিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার এতো বছর পেরিয়ে গেলেও চা বাগানের শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসেনি। উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি তাদের জীবনযাত্রায়। এমনকী, মৌলিক অধিকারও তারা ভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। বর্তমানে দ্রব্য মূল্যে যে ঊর্ধ্বগতি তাতে তাদের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে। পরিবারে পুষ্টিকর খাদ্য ক্রয়ের সামর্থ্য নেই বলে অপুষ্টিকর, অনিরাপদ খাবার খেয়ে তাদের শরীরে সৃষ্টি হচ্ছে নানা রকম মরণঘাতী রোগ-ব্যাধি। নেই উন্নত চিকিৎসা ব্যাবস্থাও। সরকার যদিও চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নতয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কিন্তু তাতেও আর সব খাতের মতো রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে অনিয়ম-দুর্নীতি। যার প্রভাব পড়ছে এই খেটে খাওয়া অসহায় দিনমজুর মানুষদের উপর। তাই সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান, চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সুপরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করুন। উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে তাদেরকে স্বস্তিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিন।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/কেএস

