নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ
রোমানা পারভিন মনিরা । মঙ্গলবার, ২৩ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ০৯:৫৫
নারী অধিকার মানবাধিকার থেকে ভিন্ন কিছু নয়। মানবাধিকারের সব বিষয়গুলোই নারী অধিকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অধিকন্তু নারীদের জন্য আছে কিছু অধিকার, যা একান্তভাবে নারীকে তার নিজস্ব মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচতে শেখায়। আর নারীর অধিকার রক্ষায় নারীর ক্ষমতায়নের বিকল্প নেই। ক্ষমতায়ন বলতে সাধারণত সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণকে বোঝায়। নারীর ক্ষমতায়নকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায়, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মূলধারায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। এর পূর্ণ ব্যাখ্যায় বলা যায়: সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন, অভিক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সমতার ভিত্তিতে সুফল ভোগে নারীর পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সামাজিক ক্ষমতায়ন বলতে নারীর অধিকার ভোগের বিষয়টি প্রথমে আসে। সমাজে নারী কী ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে এবং সেই ভূমিকা পালনে তার ক্ষমতার চর্চা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেই বিষয়টিকে বোঝায়। রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হলো রাজনীতি চর্চায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। ভোট প্রদান, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলে সমতার জায়গা অর্জনে কতটুকু নিশ্চিত তা। এসব জায়গায় নারী, বৈষম্যের শিকার বলে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন একই অর্থে ব্যবহার করা যায় না। সেজন্য ক্ষমতায়নের ধারণা পুরুষের জন্য একরকম, নারীর জন্য অন্যরকম, নারীর ক্ষমতায়ন সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার প্রধান দিক।
আমাদের সমাজব্যবস্থায় এমন এক সময় ছিল যখন নারীদের ভোগের সামগ্রী বা সন্তান উৎপাদনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে পুরুষের একটি সম্পদ বলে মনে করা হয়। স্বামীর মতামতকে উপেক্ষা করে নির্বাচনে নিজ পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দেয়ার কারণে স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ঘটনা স্বাধীনতার পরও ঘটেছে। বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সামনে রেখে শিক্ষায় নারীদের শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করাসহ রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহ প্রদান করে আসছেন। আর এর ধারাবাহিতায় প্রথম নারী উপাচার্য, প্রথম নারী পর্বতারোহী, বিজিএমইএ প্রথম নারী সভাপতি, প্রথম মেজর, প্রথম নারী স্পিকার, প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত এক দশকে সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর যথাযোগ্য অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানে নারীর অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধারা সন্নিবেশ করা হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতিও গ্রহণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে ৭ম অবস্থানে আছে। এটাও ঠিক যে, পরিসংখ্যানের চিত্র দেখলে বাংলাদেশের নারীরা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে ভাল অবস্থানে আছে। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০ এ উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে সংরক্ষিত আসন ও নির্বাচিত ২২ জনসহ ৭২ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিও আছেন ১২ হাজার জনের মতো।
কিন্তু এসবই মুদ্রার এক পিঠের ছবি। মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে নারীর প্রতি চরম অবহেলা, সীমাহীন বৈষম্য ও ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র। সম্পত্তির উত্তরাধিকারের প্রশ্নে এখনো দেশে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সমাজে এখনো নারী পুরুষ মজুরি বৈষম্য বিদ্যমান। নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাও ক্রমবর্ধমান। এখনো পথে ঘাটে, গণপরিবহনে, অফিসে, গৃহে নারীরা নিরাপত্তাহীন। সমাজে বহুযুগের পুরনো পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনো প্রবল দাপটে রাজত্ব করে চলছে। যার ফলে পারিবারিক সহিংসতা, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ এবং যৌন হয়রানির মত ঘটনা বাড়ছে। নারীর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা না থাকায়, নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে কন্যা-শিশুদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। তাই শুধুমাত্র উচ্চ পদে আসীন নারীদের দেখেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার সাথে সাথে নারী অধিকার রক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন আইন ও তার সঠিক বাস্তবায়নের দৃষ্টি দিতে হবে। নারীশিক্ষা ও নারীর মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে। নারীকে তার কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নে নারীকেই সবার প্রথম এগিয়ে আসতে হবে। নিজেরা সচেতন না হলে, নিজের উন্নয়ন নিজে না ভাবলে ক্ষমতায়ন অসম্ভব। তাই নারীদের যাবতীয় অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতে হবে।
লেখক- সমাজ গবেষক।
ইউডি/সুস্মিত

