জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা: দৃষ্টিভঙ্গিতে দরকার ইতিবাচক পরিবর্তন
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২৭ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দিনকে দিন বাড়ছে নারীদের অংশগ্রহণ। একইসঙ্গে নারী ক্ষমতায়নে সরকারের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা ভূমিকা রাখছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন হয়রানিমূলক প্রতিবন্ধকতা নারীদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা প্রশ্ন। এক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর জোড় দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকগণ। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির
জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই উৎকণ্ঠা রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের লিঙ্গ সমতার ইনডেক্সে বাংলাদেশ যত ওপরের দিকে যাচ্ছে, ততই এ ধরনের ঘটনা ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে তেমনই এক গবেষণাধর্মী কাজ করছে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)-এর তরুণদের প্ল্যাটফর্ম ইয়াং বাংলা, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের মানবাধিকার প্রোগ্রাম এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা বিষয়ে সমাজের সংশ্লিষ্ট অংশীজন, তরুণ সমাজ ও নাগরিকদের ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই ক্যাম্পেইনের আরও একটি লক্ষ্য হচ্ছে এ সম্পর্কিত বিষয়ে নীতিমালার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে তা নীতিনির্ধারকদের অবহিত করা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এ কারণেই ‘জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা’ শীর্ষক ক্যাম্পেইন ও গবেষণা কার্যক্রম শেষে এ বিষয়ে সিআরআই পলিসি ক্যাফেতে তরুণদের সঙ্গে আলোচনা করেন নীতিনির্ধারকরা।

জীবনে অন্তত একবার হয়রানির শিকার দেশের ৮৭ শতাংশ নারী: দেশে প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২৪টি জেলার ৫ হাজার নারীর ওপর চালানো একটি জরিপ থেকে এ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে আরও দেখা যায়, বাস-লঞ্চ-ট্রেনের টার্মিনালসহ গণপরিবহনে ৩৬ শতাংশ নারী নিয়মিত যৌন হয়রানির শিকার হন। উত্তরদাতাদের ৫৭ শতাংশ গণপরিবহনকে সবচেয়ে অনিরাপদ বলে মনে করেন। গণপরিবহন ছাড়া রাস্তা, শপিংমল এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে নারীদের হয়রানিদের করা হয় বলে জরিপের ফলাফলে পাওয়া গেছে। ইউএনডিপি বাংলাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং সিআরআই যৌথভাবে এ জরিপটি পরিচালনা করে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেক্সট মেসেজ, ইমেইলের মাধ্যমে ২৪ জেলার ৫ হাজার ১৮৭ জন নারীর বক্তব্য নিয়ে তা বিশ্লেষণ করে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, দিনের বেলা নারীরা হয়রানির শিকার হন। ৫২ শতাংশ নারী দিনে হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং বেশিরভাগ ঘটনা বিকেলের দিকে ঘটেছিল। ফলাফলে দেখা যায়, হয়রানির প্রতিক্রিয়ায় ৩৬ শতাংশ নারী প্রতিবাদ করেছেন। হয়রানির শিকার হয়ে মাত্র ১ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চেয়েছেন। সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, প্রকাশ্যে হয়রানির শিকার হয়েও ৪৪ শতাংশ নারী কোনও সহযোগিতা পাননি।

গণপরিবহনই যৌন হয়রানির ‘হটস্পট’: যৌন হয়রানির হটস্পট এখন গণপরিবহন। পাবলিক প্লেসে ৮৭ শতাংশ নারী সরাসরি যৌন হয়রানির শিকার হন। এ ছাড়া ৪২ ভাগ নারী উত্ত্যক্তের শিকার হন। সিআরআই পৃষ্ঠপোষকতায় ‘জনপরিসরে নারী নিরাপত্তা’ ক্যাম্পেইনের জরিপে উঠে এসেছে এমন তথ্য। আর পলিসি ক্যাফে নামক প্ল্যাটফর্মের আলোচনায় অংশ নিয়ে নারীর জন্য সর্বক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম পলিসি ক্যাফের আলোচনায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম সর্বক্ষেত্রে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেতনতা সৃষ্টির উপর গুরুত্বারোপ করেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, আমরা বলতে চাই, লেটস ওয়ার্ক টুগেদার। লেফট নো ওয়ান টু বি বিহ্যান্ড। এই চিন্তা আমাদের যেতে হবে।
এদিকে, অন্য এক জরিপে উঠে এসেছে রাজধানীতে গণপরিবহনে গত ৬ মাসে ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন। এরমধ্যে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ বুলিং, ১৫ দশমিক ২ শতাংশ সামাজিক বৈষম্য, ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ লিঙ্গ বৈষম্য এবং ৮ দশমিক ২ শতাংশ বডি শেমিংয়ের মতো হয়রানির মধ্য দিয়ে গেছেন। ‘ঢাকা শহরে গণপরিবহনে হয়রানি: কিশোরী এবং তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব’ শিরোনামে আঁচল ফাউন্ডেশনের এক জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে ১৩ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৮০৫ নারী অংশ নেন। এরমধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮৬ শতাংশ। জরিপ শুরুর সময়ের ৬ মাস আগপর্যন্ত হয়রানির মুখামুখি হয়েছেন এমন নারীদের তথ্য যুক্ত করা হয়েছে। অফলাইন ও অনলাইনে জরিপ করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা হয়। জরিপটি পরিচালনা করা হয় এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। এসব যৌন হয়রানির মধ্যে রয়েছে গণপরিবহনে ওঠা-নামার সময় চালকের সহকারীর অযাচিত স্পর্শ, বাসে জায়গা থাকার পরও যাত্রীদের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো, বাজেভাবে স্পর্শ করা, ধাক্কা দেওয়া, বাজে মন্তব্য। জরিপে অংশগ্রহণকারী বেশির ভাগ নারী ঝামেলা এড়াতে এসব ঘটনার প্রতিবাদ করেননি। যৌন নিপীড়নকারী ব্যক্তিদের মধ্যে যাত্রীর সংখ্যাই বেশি। গণপরিবহনের চালক ও চালকের সহকারীর হাতেও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন অনেকে। নিপীড়নকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা বেশি।

সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের সফল সমাপ্তি : ২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর ‘জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা’ বিষয়ক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের যাত্রা শুরু হয়। এই ক্যাম্পেইনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন সিআরআই চেয়ারপারসন সজীব ওয়াজেদ জয়, সিআরআই ট্রাস্টি ও ভাইস-চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ এবং সিআরআই ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক। কার্যক্রম শুরুর পর থেকে মাঠ পর্যায়ের পাশাপাশি অনলাইন মাধ্যমেও ক্যাম্পেইনটি পরিচালিত হয়। মাঠ পর্যায়ের এই ক্যাম্পেইনে ‘ইয়াং বাংলা’র সঙ্গে সম্পৃক্ত ১০টি যুব সংগঠন বাংলাদেশের ১০টি জেলায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, নড়াইল, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, নওগাঁ ও রাজশাহীতে কাজ করে। এই জেলাগুলোতে ২৯ জন প্রশিক্ষকের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত ২ হাজার ২০০ স্বেচ্ছাসেবী, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও গণপরিবহন শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করে অংশীজন সভার আয়োজন করে। এসব সভায় এক হাজার অংশীজন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাড়ে ১১ হাজার মানুষ সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। সিআরই সূত্র জানিয়েছে, দুই বছরব্যাপী এই ক্যাম্পেইন কর্মসূচিটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

গড়ে উঠুক নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ : বিশ্লেষকগণ বলছেন, হেনস্তার শিকার সিংহভাগ নারীই তাদের এই ধরণের বিষয়গুলো কারো সঙ্গে শেয়ার করেন না। তাতে মানসিকভাবে তারা আরও ভেঙ্গে পড়েন। অনেক নারীই একটা সময় আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। এমন আপত্তিকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে অর্থাৎ নারীদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। বিদ্যমান আইনে কিছু বিধান থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সচেতনতারও বিরাট অভাব রয়েছে। ফলে জনপরিসরে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হলে আইনিভাবে তার প্রতিকার আদৌ ভুক্তভোগি নারীরা পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে পেলেও তা খুবই কম পরিমাণ। বিড়ম্বনার মাত্রাও অনেক বেশি রয়েছে। তারা বলছেন, নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদস্যরা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে সচেতন নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সঠিক দায়িত্ব পালন করেন না। প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার পাশা-পাশি রাজনৈতিক, সামাজিক ও পুরুষতান্ত্রিকতার মতো সমস্যাগুলো যৌন হয়রানি ও সহিংসতাকে উস্কে দিচ্ছে। তাই এ সমস্যার আসু সমাধানে সবাইকে এক হয়ে কাজ করার প্রতিই তাগিদ তাদের। নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে হবে। নারী নির্যাতনের বিচার দ্রুত এবং দায়ী ব্যক্তির কঠোর শাস্তিই প্রত্যাশা করে সমাজের প্রতিটি মানুষ। পাশাপাশি সাধারণভাবে পুরুষমাত্রের মধ্যে সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা তৈরির জন্য কাজ করতে হবে। শুধু সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে রুখে দাঁড়াতে হবে এই জঘন্য ব্যাভিচার ও সর্বগ্রাসী ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে।
ইউডি/সুপ্ত

