সমূলে উপড়ে ফেলুন শিক্ষা খাতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ

সমূলে উপড়ে ফেলুন শিক্ষা খাতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ

মাছুম বিল্লাহ । সোমবার, ২৯ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৪:১০

দুর্নীতির মহামারী গ্রাস করেছে সমগ্র সমাজকে। বাংলাদেশের এক ইঞ্চি জমিও খালি নেই যেখানে দুর্নীতির বীজ রোপিত হয়নি। এই দুর্নীতির বীজের সোপান হচ্ছে রাজনীতি। একসময় রাজনীতি ছিল সেবার ব্রত, এখন রাজনীতি হচ্ছে অর্থবিত্তের স্রোত। রাজনীতি থেকে নীতিনৈতিকতা, সেবা, কল্যাণচিন্তা, সদাচার ও সততা বিদূরিত হয়েছে। এখন আর রাজনীতি দেশাত্মবোধকে ধারণ করে না। সততার বদলে শঠতা, প্রেমের পরিবর্তে প্রতারণা, বিনয় বিদায় দিয়ে বিকৃতি এবং সদ্ভাব তাড়িয়ে সন্ত্রাস রাজনীতির নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালো টাকার রাজত্ব সর্বত্র। রাজনীতি যেহেতু রাষ্ট্রপরিচালনা করে সুতরাং জাতি, সমাজ ও জনপথ সর্বত্র এর প্রতিফলন হবে এটাই স্বাভাবিক। যেহেতু দুর্নীতি আকণ্ঠ নিমজ্জিত রাষ্ট্রতরণী, আর সেহেতু শিক্ষা যখন রাষ্ট্রেরই অংশ, তখন শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে পারে না।

দুর্নীতি কেন হয়, কিভাবে হয় তা শিক্ষা প্রশাসকরা সবই জানেন। তাঁরা জানেন যে মন্ত্রণালয় থেকে অনেক বিষয় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে রাজনৈতিকভাবে অনেক বিষয় অবৈধ হলেও তাঁদের স্বীকার করে নিতে হয়। শিক্ষকসমাজ সেটিও জানে, তার পরও মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার মতো, মাউশির অভ্যন্তরে অনেক রিফর্ম ও পরিবর্তন মাউশির দুর্নীতিকে অনেকটাই কমাতে পারে। শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা হয়তো এসব শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষা প্রশাসকদের দ্বারা সম্ভব নয়। তার পরও তাঁদের শুরু করতে হবে, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষকরা সঠিক সেবাটি পান। তাঁদের অর্থের বিনিময়ে যাতে কোনো কাজ করাতে না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, তাঁরা শিক্ষক। তাঁদেরই যদি ঘুষ দিতে হয়, তাহলে সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

আমরা প্রত্যক্ষ করি যে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান একটি প্রতিষ্ঠানে বদলি হয়ে আসেন। তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তারা অনেক কিছু আশা করে, বরণের দিন কত মধুর ও কত সুন্দর কথা আলোচনা করা হয়। অথচ জেনে অবাক হলাম যে তিন লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে এসব বদলির ব্যবস্থা করা হয়, তাদের পুরো বিষয়টিই যে অন্ধকারাচ্ছন্ন সেটি মানসচক্ষে দেখা যায় না বলে অনেক কথা বলা হয়। এনটিআরসি কর্তৃক সুপারিশ পাওয়া সহকারী শিক্ষকদেরও নাকি ঘুষ দিয়ে কাজে যোগ দিতে হয়। শিক্ষা বিভাগে যেখানে প্রশাসন থেকে কোনো কর্মকর্তা নেই, শিক্ষকরাই সব কিছু ম্যানেজ করেন, সেখানকার কর্মচারীরা যদি এতটা দুর্নীতিপরায়ণ হন তাহলে কী হবে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের?

শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ হলে তার প্রভাব যে কত গভীর সেটি কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হচ্ছে মাউশি, এখানকার দুর্নীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব গোটা শিক্ষকসমাজের ওপর পড়ে। কাজেই এটিকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে যেকোনো মূল্যে। এই দুর্নীতিবাজরা কিন্তু সবাই এক, এরা সংঘবদ্ধ নিজেদের বৃহত্তর স্বার্থের কারণে। কিন্তু সৎ কর্মকর্তা দু-চারজন যে আছেন, তারা কিন্তু সংঘবদ্ধ নন। তাঁরা নিজ উদ্যোগে মাঝেমধ্যে এই পাহাড়সম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে, কাজ করতে গিয়ে মারাত্মকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন, অনেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যান।

বছরের পর বছর একই জায়গায় চাকরি করছেন খুঁটির জোরে। কখনো বদলি করা হলে আবার কয়েক দিন পর যথাস্থানে হাজির। অর্থ দিয়ে, পার্টির জোর দিয়ে সব ম্যানেজ করা হয়। কারণ এঁদের সবারই ঢাকার বাইরে বহু ধরনের সম্পদ, ব্যবসা, ব্যাংক ব্যালান্স আছে বিভিন্ন নামে। দেশের শিক্ষকসমাজ যদি এ ধরনের অসাধু কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের নিকট ধরা থাকে, তাহলে শিক্ষার কী হবে? শিক্ষার প্রাথমিক স্তর বিপর্যস্ত। মাধ্যমিক স্তর দুর্নীতিগ্রস্ত। উচ্চশিক্ষা প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। শিক্ষা প্রশাসন খড়গহস্ত। যাদের সন্দেহ আছে, কিছু বিদ্যালয় ঘুরে আসুন, দেখুন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের অবস্থা, শিক্ষকদের অবস্থা। শিক্ষকরা কেন পড়াশোনা করবেন? শিক্ষার্থীরা কেন পড়বে, যখন এমনিতেই পাস? এই অবস্থা কি চলতে থাকবে? শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়, তারা যাতে শ্রেণিকক্ষে আসে এবং শিক্ষকরা যাতে মনোযোগ দিয়ে পড়াতে পারেন সেই ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই সচেষ্ট হোন।

লেখক: কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading