ধান উৎপাদন বাড়াতে কৃষকবান্ধব নীতি গ্রহণ করুন

ধান উৎপাদন বাড়াতে কৃষকবান্ধব নীতি গ্রহণ করুন

রেজাউল করিম । সোমবার, ২৯ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৩:২০

সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চলতি বছর আমন ও বোরো উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় বেড়ে গেছে। ধান উৎপাদন করে কৃষক আদৌ লাভবান হবেন কি না এমন সংশয়ও সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১ আগস্ট থেকে ইউরিয়া সারের দাম বেড়েছে কেজিতে ৬ টাকা এবং ৫ আগস্ট থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বেড়ে যাওয়ায় ধান উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপক হারে। এমনিতেই তারা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। যে কারণে ধান চাষে উৎসাহ হারিয়েছেন কৃষক। চলতি বছর রেকর্ড পরিমাণ ধান-গম আমদানিতে দেশের অর্থনীতি কঠিন চাপের মুখে পড়েছে।

আমেরিকার কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএর তথ্য মতে, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন হয়েছে প্রায় তিন কোটি ৫৮ লাখ টন। চলতি অর্থবছরে তা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে তিন কোটি ৬৩ লাখ টন হতে পারে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন প্রায় ২৬ লাখ ৫০ হাজার টন। কৃষক পর্যায়ে যদি এই পরিমাণ সারের ব্যবহার হয়, তাহলে মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষকের বাড়তি খরচ হবে প্রায় এক হাজার ৫৯০ কোটি টাকা; প্রতি মণ ধানে যা প্রায় ১৬ টাকা। এ ছাড়া কৃষকের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া ছাড়াও সার্বিকভাবে দেশে চালের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর ফলে চালের আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। সারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষকের খরচ বৃদ্ধি পাবে বলে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ব্রি)। আমনের তুলনায় বোরোতে সারের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের তুলনামূলক বেশি খরচ হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বব্যাপী যখন সারের দাম কমার দিকে, তখন দেশে সারের দাম বাড়ানো মোটেও যৌক্তিক হয়নি। সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি আমন ও আগামী বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন কমতে পারে। আমন মৌসুমে বন্যার পর এখন তীব্র খরার কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। এরপর সারের মূল্যবৃদ্ধি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কৃষক নিরুৎসাহ হয়ে আগামী বোরো মৌসুমে আবাদ কমিয়ে দিতে পারেন। ফলে দুই মৌসুমে উৎপাদন কমার কারণে খাদ্যঘাটতিতে পড়তে পারে দেশ। এতে বাড়তে পারে আমদানি নির্ভরতা।

কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, কৃষিকাজে বছরে ৯ লাখ ৭২ হাজার টন ডিজেল ব্যবহার হয়। এতে কৃষকের খরচ হয় ৭ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। নতুন করে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৩৪ টাকা বাড়ানোয় এখন ব্যয় হবে ১১ হাজার ৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকের ব্যয় বাড়ছে ৩ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া নভেম্বরে শুরু হতে যাওয়া বোরো মৌসুমে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয় বেশি। প্রতি কেজিতে ৬ টাকা বাড়ায় বোরো আবাদে শুধু ইউরিয়া সারের খরচ বাড়ছে ৩৭ শতাংশ। ১৩ বছর ধরে চাল উৎপাদন বাড়লেও প্রতি বছর চাল আমদানি করতে হচ্ছে। খাদ্য হিসেবে আড়াই কোটি টন চালের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হচ্ছে পৌনে ৪ কোটি টনের বেশি। তবু বর্তমানে রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের চাল। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ না ওঠায় কয়েক বছর ধরেই ধানের আবাদ ছেড়ে অন্য ফসলে ঝুঁকছেন কৃষক। কমছে ধানের জমি। নীলফামারী জেলায় গত বছর ২৩ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হলেও চলতি বছর ভুট্টার জমি ২ হাজার হেক্টর বেড়েছে। অর্থাৎ কৃষক ধানের বদলে ভুট্টা বা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিবান্ধব পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে যাতে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান। এটি সম্ভব হলে ধান উৎপাদনে উৎসাহী হবেন কৃষক। পাশাপাশি গম উৎপাদনে উৎসাহী করা গেলে হাজার হাজার কোটি টাকার আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হবে। শক্তিশালী হবে দেশের অর্থনীতি। মনে রাখতে হবে দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আর এজন্য এ মুহূর্তে যা দরকার তা হলো, অধিক পরিমাণে খাদ্য উৎপাদনে উৎসাহ জোগাতে কৃষকদের সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান।

লেখক: গবেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading