সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চালের বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছে
রায়হান জাহাঙ্গীর । বুধবার, ৩১ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১১:১৫
চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চালের সিন্ডিকেট, মজুতদার ও বাজার অস্থিতিশীলকারীদের গ্রেপ্তার এবং চাল ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজ নামে একটি সংগঠন। তাদের দাবি, চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট মজুতের মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে। ফলে তৈরি হচ্ছে চালের সংকট। তাদের অতি মুনাফা ও মজুত বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। আর এই সিন্ডিকেট ও মুনাফাখোরদের কারণে অস্থির হয়ে উঠছে খুচরা ব্যবসায়ীসহ সাধারণ ক্রেতারা। মোটা চাল এখন ৫৫ টাকা কেজি। আর চিকন চাল ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। চালের মূল্যবৃদ্ধি, বিশেষ করে মোটা চালের দর বৃদ্ধিতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। চাল আমাদের প্রধান খাদ্যদ্রব্য। চালের দর নিয়ে তাই কোনো ধরনের অস্থিরতা মোটেই কাম্য নয়।
এটা সত্য, আমাদের পর্যাপ্ত উৎপাদন রয়েছে। সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে। সরকার আমদানি করেছে এবং বেসরকারি উদ্যোগেও আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু অনেক চাল ব্যবসায়ী আমদানির অনুমতি পেয়েও আমদানি করেননি। সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। প্রতি সপ্তাহে চালের দাম বাড়ানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহণ খরচের দোহাই দিয়ে সিন্ডিকেট চালের দাম বাড়ালেও তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লোডশেডিং ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে চাল উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি যাতায়াত ভাড়া বেড়েছে। মিলাররা চালের দাম বাড়িয়েছে। তাই আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সম্প্রতি খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, যারা অবৈধ মজুত করে চালের দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা মনে করি, চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। এটা অতি মুনাফাখোর ও লোভী ব্যবসায়ীদের কারসাজি। তারা একেক সময় একেক অজুহাত তুলে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তারা কখনোই ক্রেতাদের স্বার্থ বিবেচনা করে না। অসাধু মিল মালিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে চালের দাম সহনশীল পর্যায়ে আনতে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখবে, এটাই প্রত্যাশা। মাঝেমধ্যে কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও গুরুদণ্ডের পরিবর্তে দেয়া হয়েছে লঘুদণ্ড। এ প্রেক্ষাপটে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মন্ত্রীদ্বয়ের বৈঠক তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত করবে- এ আশা দুরাশা বলেই মনে হয়। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে ভাতপ্রধান বাঙালি যদি তাদের চাহিদামতো চাল কিনতে না পারে তবে, এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী হতে পারে। বিশেষ করে মোটা চালের দামবৃদ্ধি কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ দেশের স্বল্প আয়ের মানুষ মোটা চালনির্ভর। মনে রাখতে হবে এ দেশে তেলের দাম বেড়ে গেলে সবকিছুর দাম বেড়ে যায়। যার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি। সুতরাং সার্বিক সকল পরিস্থিতি বিবেচনা করলে একটাই কথা যে করেই হোক চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সংবাদ উদ্বেগজনক। আসলে পণ্যের সরবরাহ বা সংকটের সঙ্গে দাম বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা হচ্ছে অসৎ ব্যবসায়ীদের হীনমানসিকতা। অতীতেও আমরা লক্ষ্য করেছি, তারা একেক সময় একেক পণ্যের দাম বাড়িয়ে ক্রেতাদের পকেট কেটেছে। তেল ও চালের দাম তো নানা অজুহাতে কয়েক দফা বাড়ল। এটা তাদের ব্যবসায়িক অসুস্থ সংস্কৃতি। এটা হচ্ছে বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি। এরা জনগণের স্বার্থের দিকে নজর দেয় না। এরা বাজারসন্ত্রাসী। কীভাবে অসৎ উপায় অবলম্বন করে দ্রম্নত ধনী হবে এটাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে তাদের কাছে দেশের অসহায় জনগণ জিম্মি হয়ে পড়ে। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারও তাদের কাছে জিম্মি। বাজার নিয়ে অতীতে অনেক পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, কোনো কাজ হয়নি। বিক্রেতাদের মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। বিক্রেতাদের মানসিকতার পরিবর্তন যতদিন না ঘটবে ততদিন চালসহ নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির থাকবেই এবং দেশের জনগণও তাদের কাছে জিম্মি থাকবে।
লেখক: কলামিস্ট।

