এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা শিক্ষায় গতি বাড়াবে
শরীফুজ্জামান খান । রবিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৪:২০
স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর ঠিকানা বিবেচনায় নেওয়া হয় না। কোনো নিবন্ধনধারী শিক্ষক দেশের যে কোনো প্রান্তে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদে আবেদন করতে পারেন। আবেদনের সংখ্যাসীমাও নির্দিষ্ট করা নেই। একজন চাকরিপ্রার্থী লটারির টিকিট কাটার মতো শত শত আবেদন করেন। চাকরির আকাল এ দেশে যেখানেই চাকরি মিলে, তিনি যোগদান করেন। এভাবে অনেক নিবন্ধনধারী দূর-দূরান্ত থেকে এসে কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদে যোগ দেন।
এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরির শুরুতে নিবন্ধনধারী শিক্ষকের বেতন তেমন আকর্ষণীয় নয়। বিএড প্রশিক্ষণ থাকলে শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১৬ হাজার টাকা। আর প্রশিক্ষণ না থাকলে বেতন স্কেল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। নিয়োগের শুরুতে অধিকাংশ শিক্ষকের বিএড ডিগ্রি থাকে না। ফলে তারা নিুতর স্কেলে বেতন পান। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতনের সঙ্গে যৎসামান্য বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসা ভাতা যোগ হয়। এ সামান্য অর্থে জীবিকা নির্বাহ করা আসলেই খুব কঠিন। দূরে কোথাও চাকরি করতে গেলে পরিবার-পরিজন ছেড়ে সেখানে বাসা ভাড়া নিতে হয়। আর নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে যোগদান করলে শিক্ষক কোনো বেতনই পান না। সংসারে টানাপোড়েন চললে নিজ পেশায় মনোনিবেশ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীকে কেবল তার নিজ জেলায় নয়, উপজেলায় নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে করে তারা খুব সহজেই নিজ বাড়ি থেকে চাকরি করতে পারেন। ফলে শিক্ষকের পারিবারিক সুবিধা এবং খরচের সাশ্রয় হয়। কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণেও ক্ষেত্রবিশেষে বদলির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কোনো কোনো শিক্ষক বিরূপ পরিবেশে চাকরি করেন। বদলি তাদের জীবনে স্বস্তি দিত। তারা চাপমুক্ত অবস্থায় চাকরি করতে পারতেন। আর কয়েক বছর পরপর চাকরির স্থল পরিবর্তিত হলে একদিকে পেশাগত জীবনে বৈচিত্র্য আসত, অন্যদিকে অভিজ্ঞতাও বাড়ত।
ইনডেক্সধারী শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে গিয়ে বদলির বিকল্প হিসাবে শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলারে আবারও আবেদন করছেন। এতে করে তারা চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে অনাকাক্সিক্ষত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। নিবন্ধনধারী কোনো শিক্ষক এক প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত অবস্থায় আবেদন করে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গেলে আগের প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদ সৃষ্টি হয়। তখন ওই প্রতিষ্ঠানের আবার শূন্যপদে শিক্ষক চাহিদা দিয়ে শিক্ষকের অপেক্ষায় থাকতে হয়। অন্তর্র্বতী মেয়াদে শ্রেণি পাঠদানে ব্যাঘাত ঘটে। শিক্ষদের বদলির চাকরি হলে এ ধরনের সমস্যা এড়ানো যেত। তখন এক শিক্ষকের পরিবর্তে সহজেই অন্য শিক্ষক মিলত। বদলির সূচনায় কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রদবদল ঘটানো যেতে পারে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একদা কোনো বিষয়ে অধিক শিক্ষার্থী থাকায় শাখা খোলা হয়েছিল। এখন ওই শাখায় যথেষ্ট শিক্ষার্থী নেই। হয়তো ওই প্রতিষ্ঠানের অদূরে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হওয়ায় শিক্ষার্থী কমে গেছে। বর্তমান বাস্তবতায় ওই শাখা বিলুপ্ত করে অতিরিক্ত শিক্ষক অন্যত্র বদলি করা যেতে পারে। মফস্বলে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী খুবই কম। সেখানে জোর করে ২-৫ জন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করিয়ে বিভাগ টিকিয়ে রাখা হয়। কোনো বিভাগ টিকিয়ে রাখার মতো পরিস্থিতি না থাকলে ওই বিভাগের বিলুপ্তি ঘটিয়ে শিক্ষকদের অন্যত্র বদলি করে দিলে সিস্টেম লস কমত।
বদলির অন্যবিধ প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। এনটিআরসিএ থেকে এমপিও, ননএমপিও নির্বিশেষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে অধিক নম্বরপ্রাপ্ত নিবন্ধনধারীরা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে, অন্যদিকে কম নম্বরপ্রাপ্ত নিবন্ধনধারীরা ননএমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে আবেদন করে চাকরিতে ঢুকছেন। ৩৫ বছর পেরোনোর ঝুঁকিতে থাকায় নিবন্ধনধারীরা বিনা বেতনে হলেও আপাতত একটি চাকরি ধরে রাখছেন। ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসময় এমপিওভুক্ত হলেও এ দুই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের মানের একটা পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। বদলির ব্যবস্থা হলে উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের মানগত ভারসাম্য তৈরি হতো।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ, ঘরভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে যৌক্তিক দাবি রয়েছে। এসব দাবি পূরণের জন্য বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাজেট স্বল্পতার কথা বলে এসব দাবি পাশ কাটিয়ে থাকে। কিন্তু বদলির সঙ্গে অর্থের সংশ্লেষ নেই। এটি নিছক নীতিগত সিদ্ধান্ত। আশা করি, কর্তৃপক্ষ অচিরেই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে বদলির বিধান চালু করে শিক্ষা কার্যক্রম গতিশীল এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবন সহজ করে তুলবে।
লেখক: শিক্ষক।
ইউডি/সুস্মিত

