পর্যটন শিল্পের বহুমাত্রিকতা বিকাশে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ কাম্য

পর্যটন শিল্পের বহুমাত্রিকতা বিকাশে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ কাম্য

বদরুজ্জামান ভূঁইয়া । বৃহস্পতিবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:৩০

সারা বিশ্বে পর্যটন শিল্প একটি অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে সুপরিচিত। পর্যটন শিল্প বর্তমান বিশ্বের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পর্যটন শিল্পে বিশ্বের বুকে এক অপার সম্ভাবনার নাম বাংলাদেশ। এ দেশের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য পৃথিবীর অন্য দেশ থেকে অনন্য ও একক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। পর্যটন বিকাশে বাংলাদেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। পর্যটন শিল্প পৃথিবীর একক বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। পর্যটনের গুরুত্ব সর্বজনীন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে পর্যটন এখন অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার খাত।

দেশে পর্যটন একটি সম্ভাবনাময় বড় খাত। দীর্ঘ দিন ধরে এই খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ তেমন ভালোভাবে হতে পারেনি। কোনো কিছু দৃশ্যমান বাস্তবায়ন চোখে পড়েনি। সরকার বড় বড় যে প্রকল্পগুলো হাতে নিয়েছে, তা চলমান। যদিও করোনাকালীন সময়ে এই সেক্টরে সার্বিক অগ্রগতি দারুনভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ নেই বললে চলে। দেশে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার মধ্যদিয়ে দেশে পর্যটনের সম্ভাবনা বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এখনো পর্যটন স্থানগুলোতে পর্যটকদের জন্য তেমন বাড়েনি সুযোগ-সুবিধা। যা এই খাতের সার্বিক অগ্রগতি ব্যাহত করছে, যা হতাশাজনক। মূলত দেশের অধিকাংশ পর্যটন স্থানগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, মানসম্মত আবাসিক হোটেল ও স্বাস্থ্যসম্মত রেস্তোরাঁর এখন বেশ অভাব রয়েছে। অনেক স্থানে যোগাযোগের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো এখন অধিকাংশ কাঁচা রয়ে গেছে। যা পর্যটকদের যাতায়াতে দারুন ভোগান্তিতে ফেলছে। তাই যত দ্রম্নত যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা অধিক জরুরি বলে মনে করি।

দেশের পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতে হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টসহ অবকাঠামো উন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এখন অনেক রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নেই। প্রায় সময় এসব রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমানে কুয়াকাটায় পর্যটকদের থাকার জন্য ১৫০টির বেশি হোটেল-মোটেল রয়েছে। এর মধ্যে তিন তারকা হোটেল আছে মাত্র দুটি। বাকি হোটেলগুলোর কক্ষ ব্যবস্থাপনা, হোটেলের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কুয়াকাটা অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত হোটেল-মোটেল আছে ৭৪টি। এর বাইরে আছে ৫৬টি হোটেল-মোটেল। প্রথম শ্রেণির হোটেল রয়েছে ১০-১৫টির মতো। এসব হোটেল বহু আগে গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এসব হোটেল-মোটেলে আধুনিক কোনো সুযোগ-সুবিধাসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে, যা পর্যটকদের এই স্থানে ভ্রমণের বিষয়কে নিরুৎসাহিত করছে।

যদিও বর্তমানে সময়ের কিছু কিছু পরিবর্তন হয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনাও বাড়ছে। এখন যারা হোটেল-মোটেল তৈরি করার উদ্যোগ নিচ্ছেন, তারা হোটেল ব্যবস্থাপনায় বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলছেন, যা ইতিবাচক। পাশাপাশি পুরনো হোটেলগুলোর মালিকরাও কেউ কেউ হোটেলের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় পরিবর্তন আনার চিন্তা করছেন। এখন যদি রাস্তাঘাটের মানোন্নয়নসহ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তবে আগামীতে এই পর্যটনশিল্পে সুফল পাওয়া যাবে।

যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুয়াকাটায় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। পৌরসভার অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়ন, হোটেল-মোটেলের সেবার মান বাড়ানো ও সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা উন্নতির জন্য কিছু পরিকল্পনা তারা হাতে নিয়েছে, যা ইতিবাচক বলে মনে করি। এ বিষয়ে দ্রম্নত সংশ্লিষ্টদের আসু ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি বলে মনে করি। যদিও বাস্তবতা হলো বিদেশি বড় বিনিয়োগ ছাড়া পর্যটন খাতকে কোনোক্রমেই বিদেশিদের মধ্যে আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব হবে না। সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে শুধু বিদেশি আকর্ষণীয় বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে জমজমাট ব্যবসা চলেছে। আমাদেরও অনুরূপ চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।

বিশ্বে বাংলাদেশের পর্যটনের রাজধানী হিসেবে ইতোমধ্যেই কক্সবাজার ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। এখানে বিশেষ করে ছুটির দিনে এত বেশি পর্যটকের আগমন ঘটে যে, হোটেল-মোটেলগুলোতে ঠাঁই হয় না। এ কারণে এখানে অবকাঠামোগত ব্যবস্থার আরও উন্নয়নের সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের জন্য কক্সবাজার ও এর আশপাশের এলাকাকে আরও আকর্ষণীয় হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও জরুরি বলে মনে করি।

দেশে পর্যটনশিল্পকে বড় শিল্প খাত হিসেবে দাঁড় করাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নতমানের আকর্ষণীয় ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারলে বিদেশি পর্যটক আমাদের দেশে প্রচুর আসবে। পর্যটকরা কেন সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সব চেয়ে বড়। পর্যটনের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত রাস্তা, হোটেল, মোটেল ও বিমানবন্দর সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। যানজটের অবস্থার উন্নতির জন্য সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই পর্যটনশিল্প বাংলাদেশে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দেশের মানুষও দেশকে দেখতে চায়, বেড়াতে চায়, অবসর সময় বিভিন্ন জেলায় জেলায় বেড়ানো বেশ অভ্যাস গড়ে উঠেছে। এজন্য বিভিন্ন জেলায় বিনোদন ও থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা থাকলে পর্যটনশিল্প প্রসার লাভ করবে। আর বিদেশিদের জন্য দরকার নিরাপদ সড়ক, সুন্দর থাকা-খাওয়ার হোটেল-মোটেল এবং পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তাব্যবস্থা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্তাদের দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক- কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading