তরুণদের প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার: উন্নতি না অবক্ষয়?
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০
তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে মানুষের জীবন যাত্রাকে সহজ ও প্রাণবন্ত করেছে। বিশ্বকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার সমাজ জীবনের প্রতিটি খাতে প্রভাব ফেলছে, পাল্টে যাচ্ছে কার্যপদ্ধতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা, এমনকি রাষ্ট্র চালানোর প্রক্রিয়াও। কিন্তু মুদ্রার উল্টোপিঠে দেখা যায় প্রযুক্তি সমাজ থেকে কেড়ে নিচ্ছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। প্রযুক্তির এই থাবার সিংহভাগই শিকার হচ্ছেন তরুণরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন তরুণদের প্রযুক্তি নির্ভরতা শুধু ইতিবাচকই নয় নেতিবাচকও বটে। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বলছে বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট ব্যাবহারকারীর সংখ্যা রয়েছে ১২ কোটি ৬২ লাখ ১০ হাজার জন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে ২০০৮ সালে এই সংক্যাটা ছিলো মাত্র সাড়ে সাত লাখ। এ থেকেই পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় দেশে বিগত বছরগুলোতে ডিজিটাল সেক্টরে কতটা পরিবর্তন ঘটেছে। প্রযুক্তির ব্যাপক এই প্রসারে মানুষের হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন-ইন্টারনেট। বিশেষ করে তরুণ সমাজের নিত্য সঙ্গী এই প্রযুক্তি। বিটিআরসি’র হিসেব মতে বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫২.৮ মিলিয়ন অর্থাৎ ৫ কোটি ২৮ লাখ। যার সিংহভাগই তরুণ। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রতিটি বাহকের যেমন ইতিবাচক দিক থাকে তেমনি থাকে এর নেতিবাচক দিকও। আর প্রযুক্তির এই নেতিবাচক দিকটা বর্তমানে প্রকট হয়ে উঠছে তরুণ সমাজের মধ্যে। তারা তাদের মূল্যবান সময়টাকে পুরোপুরি দিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তির অন্ধকার অংশে। বিশেষজ্ঞরা এটাকে অশনী সংকেত হিসেবেই জানান দিচ্ছেন। তরুণরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানা অ্যাপ তথা টিকটক-লাইকি, ইন্সট্রাগ্রামে মাত্রাতিরিক্ত সময় ব্যয় করছেন। এছাড়াও পর্ণোগ্রাফি সাইটগুলোতে তাদের ব্যবহার দিনকে দিন বাড়ছেই। বিভিন্ন বেটিং সাইটে জড়িয়ে পড়ছে তরুণরা, এর পেছনে রয়েছে নানা প্রলোভন। সর্বোপরি প্রযুক্তির আলোর দিকে তাকানোর চেয়ে অন্ধকারেই নিমজ্জিত হচ্ছে তারা।
যৌন হয়রানি- ধর্ষণের নেপথ্যে পর্ণগ্রাফি আসক্তি: বর্তমানে অধিকাংশ তরুণরা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার ব্যবহার করেন। সকলের হাতেই মোবাইল। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে সমাজে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তাহীনতা। নৈতিক অধঃপতনে পতিত হয়েছে সমাজ। সহজতর যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্বাস। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার ইত্যাদির মাধ্যমে অবাধ যোগাযোগ ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে ইন্টারনেট, ইউটিউব, পর্ণগ্রাফি আসক্তিতে উন্নত দেশগুলোর প্রায় ৬৫% যুবসমাজ (১২-১৮ বছর) যৌন হয়রানি ও ধর্ষণসহ বড় বড় অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। যা সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ এমনকি পর্ণ আসক্তিতে প্রতি বছর আমেরিকার স্কুল পড়ুয়া ২,৮০,০০০ শিক্ষার্থী গর্ভবতী হচ্ছে যা পুরো সমাজ ও একটি রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমাদের দেশে এমন ঘটছে না তা কিন্তু নয়।
বুদ্ধির বন্ধ্যত্বে বিঘ্নিত হচ্ছে মেধার বিকাশ: তরুণ ও কিশোর সমাজের শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য কায়িক শ্রমের গুরুত্ব রয়েছে। প্রয়োজন রয়েছে মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করার। কিন্তু ফেসবুক-টিকটকের মায়ায় প্রায়ই আটকে পড়ছে তরুণ ও কিশোর সমাজ। লেখাপড়া, কোচিং, প্রাইভেট, টিভি দেখা ইত্যাদি কারণে সময় বের করা এমনিতেই সম্ভব হয় না। তারপরও যেটুকু পাওয়া যায় তাও কেড়ে নিচ্ছে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। যখন তাদের ভবিষ্যতে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখার কথা তখন তারা ভাবছে ফেসবুকে কত আকর্ষণীয় ছবি আপলোড করা যায়। অথবা এমন কী কথা লেখা যাবে যাতে লাইক, শেয়ারের বন্যা বয়ে যাবে। এতে বুদ্ধির বন্ধ্যত্ব তৈরি হচ্ছে, বিঘ্নিত হচ্ছে মেধার বিকাশ। মনোচিকিৎসকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ফলে মনোবিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে তরুণা দ্রুতই।

টিকটক-লাইকিতে বিনোদন নাকি ফাঁদ: বর্তমান প্রযুক্তির নতুন উদ্ভাবন টিকটক-লাইকি তরুণ প্রজšে§র জন্য সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মাধ্যমগুলোতে ১০ বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে মধ্য বয়সী পর্যন্ত মানুষদের নানারকম ভিডিও পোস্ট করতে দেখা যায়। এগুলোকে ঘিরে হচ্ছে রমরমা ব্যবসা, বাড়ছে অপরাধ করার প্রবণতাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, সময়ের সাথে সাথে আমাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন হচ্ছে। বিনোদনের ধরনগুলোও বদলে গেছে। প্রযুক্তির এই সময়ে কোনো কিছু বন্ধ করলে সবকিছু সমাধান হবে বিষয়টি এমন না। টিকটক-লাইকি বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পাবে নাকি পাবে না সেটি সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকেই ঠিক করতে হবে। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইলে একটি বিধিনিষেধ বা রেজুলেশন থাকা দরকার। যেখান থেকে এই টিকটকের উৎপত্তি সেই চীনের তরুণ প্রজš§ই এরকম কনটেন্টে টিকটক ব্যবহার করে না। সেখানে একটি রাষ্ট্রীয় মনিটোরিং এর ব্যবস্থা রয়েছে। এই টিকটকের আসক্তির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়ায় বন্ধ করা হয়েছে, ইরাকে বন্ধ করা হয়েছে, পাকিস্তানে বন্ধ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, টিকটক-লাইকির মতো অ্যাপের মাধ্যমে যারা এসব কনটেন্ট তৈরী করছে তারাও আসক্ত হয়েছে এবং যারা উপভোগ করছে তারাও আসক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে। একটি হলো ব্যবহারকারী নিজে এবং অন্যটি হলো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে দুই পক্ষকেই সচেতন হতে হবে।
অপসংস্কৃতি পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজেই: প্রযুক্তির অপব্যবহার এক দিকে যেমন নৈতিকতার অবক্ষয় করছে। অন্যদিকে মোবাইল অপারেটরগুলোর বিজ্ঞাপনচিত্রেও খুবই সতর্কভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে অশ্লীলতা। তাছাড়া মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগে তরুণ-তরুণীদের কাছে এই অপসংস্কৃতি পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজেই। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনটা ঘটেছে একেবারে ইদানিংকালে। ২০০ বছরের শাসনে যে কাজটি পুঁজিবাদীরা ও সাম্রাজ্যবাদীরা যা করতে পারেনি, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাই হচ্ছে স্বচ্ছন্দে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও বিশ্বায়নের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের প্রাচীন অসভ্য সংস্কৃতি তথা নগ্নতা, অশ্লীলতা, ও বেহায়াপনা। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অশ্লীলতাই এখন সবার কাছে আধুনিকতার মানদন্ড।
সচেতন হওয়ার পরামর্শ শিক্ষাবিদ-প্রযুক্তিবিদদের: আধুনিক প্রযুক্তির মোবাইল-ফোন, কম্পিউটারের মাধ্যমে সারা বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পরিবর্তন, ইন্টারনেট অব থিংস, যন্ত্রপাতি পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, রোবটিক্স, জেনেটিক্স, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো বিষয়গুলো চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের সূচনা বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু প্রযুক্তি আসক্তে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। এ থেকে উত্তরণের জন্য সন্তানদের বেশি সময় দেয়া, প্রযুক্তির ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক সম্পর্কে অবহিত করা এবং সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তিবিদরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির প্রতি এ ধরণের আসক্তি জাতি গঠনের পথকে রুদ্ধ করতে পারে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ও শিক্ষাবিদ ড. মো. কায়কোবাদ বলেন, এতো বেশি প্রযুক্তি নির্ভরতা সমাজে একটা বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কারণ, এই শিশুরা মানুষের সঙ্গে মিশতে না শিখে বরং ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে সময় কাটানো শিখছে। সে মানবিক সমাজে না বেড়ে বরং সাইবার সমাজের মধ্যে বড় হচ্ছে। প্রযুক্তির প্রতি এ ধরণের আসক্তি জাতি গঠনের পথকে রুদ্ধ করতে পারে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে আমাদের সমাজে ইন্টারনেট প্রবেশ করেছে। এর ভালো ও মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। তবে অধিকাংশ শিশুই দিন কাটায় গেমস খেলে। এটা জাতি গঠনের ক্ষেত্রে খুবেই ধ্বংসাত্মক একটি ব্যাপার।’ তিনি আরও বলেন, ‘অধিকাংশ অভিভাবকই ইন্টারনেট সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ায় শিশুদের প্রতি নিয়ন্ত্রণহীনতা দিনে দিনে বাড়ছে। শিক্ষার পরিবর্তে তারা কুশিক্ষা গ্রহণ করছে। দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার হচ্ছে এই শিশুরা। আর তারাই যদি ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে বিপথে পরিচালিত হয় তবে তা আমাদের ভবিষ্যৎ জাতি গঠনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

প্রযুক্তির এ অপব্যবহার তাদের ব্র্যান্ড, ইমেজ, ও গ্লামারের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি করে। ফলে এটির অনুকরণে যুবসমাজ ভালমন্দের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না। মানুষের জীবনযাত্রার মান সহজ ও স্মার্ট করার পেছনে ইন্টারনেট, ইউটিউব, ভাইবার, ফেসবুকসহ প্রযুক্তির আরো অনেক মাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও এর আবার বিপরীত ভূমিকাও লক্ষ্য করা যায়। যা যুবসমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার সামাজিক অবক্ষয় অনাচার বিস্তারের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এখনই আমাদের এই ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত।একটি সঠিক ধর্মীয় আদর্শ ধারণ করা উচিত যার মাধ্যমে আমাদের যুবসমাজ তাদের জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন হবে এবং তারা হয়ে উঠবে এক একজন, মানবতার কল্যাণে-দেশের কল্যাণে, নিবেদিত প্রাণ। প্রকৃত ধর্মের শিক্ষার পাশাপাশি সঠিক প্রযুক্তির শিক্ষা আমাদের দেশ ও জাতিকে সম্বৃদ্ধি করে তুলবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার ও রাষ্ট্রের পাশাপাশি শিক্ষকদের নৈতিক বক্তব্য ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি সামাজিক মুল্যবোধ, পারিবারিক দায়বদ্ধতা, সর্বোপরি নিজেকে এ ধরনের অসুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে থেকে বিরত রাখতে হবে।
ইউডি/সুস্মিত

