বাংলাদেশ সীমান্তে সংঘর্ষ থামছেই না মিয়ানমারের: রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের নতুন ফন্দি নয় তো?

বাংলাদেশ সীমান্তে সংঘর্ষ থামছেই না মিয়ানমারের: রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের নতুন ফন্দি নয় তো?
উত্তরদক্ষিণ । ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:৩০

বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়া সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বেশ কিছু দিন ধরে চলছে সংঘর্ষ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন, বার বার গোলা নিক্ষেপ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত করেছে মিয়ানমার। এসব ঘটনায় বান্দরবানের ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে একাধিকবার তলব করে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। দেশটির এই ধরনের কার্যকলাপকে ফাঁদ মনে করছেন বিশ্লেষকরা৷ তারা বলছে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানোর এ এক ফন্দি। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গত কয়েকদিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। দেশটির বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়া সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা রাখাইন রাজ্যে অব্যাহতভাবে চলা এ সংঘর্ষের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায়। শঙ্কা জেগেছে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের আবারও বাংলাদেশে প্রবেশ করার। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় ইতোমধ্যে বেশ ক’জন রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে যদিও প্রশাসনিকভাবে এ খবরের কোনো সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে, সীমান্তের ওপারের এমন টানা সংঘর্ষ আবারও বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তির বার্তা নিয়েই আসছে বলাই বাহুল্য। বিশ্লেষকগণ বলছেন রোহিঙ্গারা ওপারে চাপের ওপর পড়ে এপারে (বাংলাদেশে) আসতে বাধ্য হবে। যার ফলে ভুগতে হবে বাংলাদেশকে। এমনিতেই প্রায় ১০-১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এই ভার নেয়া বর্তমানে কঠিন হয়ে পড়েছে দেশের জন্য। অন্যদিকে, রোহিঙ্গারাও এখানে নানাবিধ অপকর্ম তথা মাদক ব্যবসা, ছিনতাইয়ে জড়িত হয়ে দেশের জনগণকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। বাড়তি রোহিঙ্গাদের ভার বাংলাদেশ কী বইতে পারবে।

বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি হাজারো রোহিঙ্গার: স্থানীয় সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমে জানা যায় বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে আরও হাজারো রোহিঙ্গা। ইতোমধ্যে ১০-১৫ জন রোহিঙ্গা এপারে এসেছেন বলেও খবর মেলে। যদিও প্রশাসন এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেনি। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম, তুমব্রু, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছেন তারা। উখিয়ার পালংখালী অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির নেতা রবিউল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, গত কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে সংঘর্ষ চলছে, সেটার অজুহাতে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছেন। প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা আসছেন। সম্প্রতি মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার এশারা বেগম (২৭), সাদেক হোসেন (৪০), মো. তাহের (১৩), মো. শরীফ (৯), বিবি আয়েশা (৭) ও বিবি জান্নাত (৩) পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানান, রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ ফের অভিযান শুরু করলেও বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা শান্ত। কিন্তু মালয়েশিয়া থেকে পাঠানো ত্রাণের কথা জেনে তারা বাংলাদেশে চলে আসছেন। কারণ রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের মাত্রা একটু কমলেও রোহিঙ্গাদের কোনো কাজে বের হতে দিচ্ছে না মিয়ানমারের পুলিশ ও সেনাবাহিনী। অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা রোহিঙ্গারা তাই বাংলাদেশে ছুটছেন। পালংখালী ইউনিয়নের থ্যাংখালী ক্যাম্প-১৯ এর বক্ল-১৬ এর মাঝি আয়ুব (ছদ্মনাম) জানান, কয়েকজন রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসছেন। বিষয়টি ক্যাম্প ইনর্চাজ বরাবর জানানো হয়েছে। তাদের ট্রানজিট ক্যাম্পে নেওয়া হচ্ছে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, মিয়ানমারের বলিবাজার ও সাপ বাজার থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ পালিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছেন। এ বিষয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত এ রকম কোনো তথ্য আমরা পাইনি। বিষয়টি দেখছি।

বাকি রোহিঙ্গাদেরও পাঠাতে চায় মিয়ানমার?: এরইমধ্যে টানা অভিযানের ফলে রাখাইন থেকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর লোকজন ইন্ডিয়ার মিজোরামে প্রবেশ করছে৷ রাখাইন ছাড়াও নো-ম্যানস ল্যান্ডেও রোহিঙ্গারা রয়েছেন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান গণমাধ্যমকে বলেন, আসলে মিয়ানমার এক ধনের ফাঁদ পেতেছে৷ তারা সীমান্তে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করতে চাইছে৷ সংঘাত তৈরি করতে চাইছে৷ সেটা করতে পারলে তাদের ক্যাম্পে এবং সেখানে নিয়ন্ত্রণে থাকা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়া সহজ হবে৷ নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান অবশ্য মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তেমন নেই৷ কারণ সেখানে যে রোহিঙ্গারা এখনও আছে তাদের সংখ্যা নগণ্য৷

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন

সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে বিজিবি: মিয়ানমার থেকে গোলা ও মর্টারশেল বাংলাদেশ সীমান্তে পড়ার ঘটনার পর একাধিকবারই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিষয়টি তারা আমরা অবজার্ভ করছেন। মিয়ানমারের কোনো লোককে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। তিনি জানান, মিয়ানমারের ওখানে কিছু ভায়োলেন্স হচ্ছে। আমরা আমাদের বর্ডার সিল করেছি। মিয়ানমার যত উস্কানিই দিক না কেন সীমান্ত দিয়ে সেদেশ থেকে আর কাউকে ঢুকতে দেয়া হবে না। মিয়ানমারের লোক আমাদের দিকে যাতে না আসতে পারে সে জন্য বিজিবিকে সতর্ক করেছি। পাশাপাশি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গেও নিয়মিত আলাপ করছি। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না। আমরা অবজার্ভ করছি।তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে কোনো নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবে না। দেশটিতে বিভিন্ন আর্মস গ্রুপ সংঘাতে জড়িয়েছে। ভয়ের কথা হলো, সে দেশের নাগরিকরা যখন নির্যাতিত হয় তখন বাংলাদেশের দিকে চলে আসে। তবে আমরা তথ্য পেয়েছি, এবার তারা বাংলাদেশের দিকে আসছে না। মিয়ানমারের কোনো নাগরিক যাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে আমরা বিজিবিকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছি। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা ফেরদৌস গণমাধ্যমকে বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আমি স্থানীয় চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে শুনেছি, এখনো কোনো মিয়ানমারের নাগরিক অনুপ্রবেশ করতে পারেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় এলাকাবাসীদের আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

‘অভ্যন্তরিন সমস্যা মিয়ানমারকেই সমাধান করতে হবে’: এদিকে, বাংলাদেশের সীমান্তে মিয়ানমারকে গোলাগুলি বন্ধের জন্য হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, আমাদের সরকার সে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। কাজেই সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধ করুন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি আমরা। বাঙালি জানে কীভাবে তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হয়। আপনাদের মগের মুল্লুকের সমস্যা আপনারা মগের মুল্লুকেই সমাধান করুন। আমরা ভদ্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে বলছি; এটিকে আমাদের দুর্বলতা ভাববেন না। আমাদের ভদ্রতা ও বিনয়কে আপনারা সম্মান করতে শিখুন। নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিজেরা সমাধান করুন। আপনাদের সমস্যা যেন আমাদের কাঁধে না পড়ে সে বিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই। রবিবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকালে কক্সবাজারের টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

মিয়ানমার দুঃখ প্রকাশ করে নি এখনও: যুদ্ধবিমান থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মর্টার শেল ছোড়া হেলিকপ্টারের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ অং খোও ময়েকে ডেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর৷ একই সঙ্গে এই ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা৷ কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট মনে করেন না সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক সামরিক অ্যাটাশে মেজর জেনারেন (অব.) শহীদুল হক৷ তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, মিয়ানমার অতীতে চীন ও থাইল্যান্ডের আকাশ সীমাও লঙ্ঘন করেছে৷ যে জন্য তারা ক্ষমা চেয়েছে, দুঃখ প্রকাশ করেছে৷ ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেনি৷ কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারে উল্টো তারা বার বার ঘটনা ঘটাচ্ছে৷ বাংলাদেশ প্রতিবাদ করছে৷ কিন্তু তারা দুঃখও প্রকাশ করছে না৷

উত্তরদক্ষিণ । ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

‘মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই’: সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না, শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধান করতে চায় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে রবিবার (১১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভাশেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশের পরবর্তী পদক্ষেপ কী জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা তো যুদ্ধ করতে চাচ্ছি না। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধান করবো। আজকের সিচুয়েশন সেখানে গোলা-বারুদ কমে গেছে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading