আইন না মানলে জনদুর্ভোগের আশু অবসান সম্ভব নয়
মো. ফখরুল ইসলাম । সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:৪৫
গত মাসের ঘটনা। জনবহুল ও গাড়িবহুল ব্যস্ত রাস্তায় দিনদুপুরে খোলা ক্রেন দিয়ে ভারী কংক্রিট ওঠানামা করা হচ্ছিল। ১৫০ টন ওজনের বক্স গার্ডার ওপরে তুলতেই ক্রেনের চাকা ওপরে উঠে বেসামাল হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। চলন্ত প্রাইভেট কারকে গার্ডারটি চাপা দিলে এর ভেতরে থাকা সাত জনের মধ্যে পাঁচ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, গাড়িতে আটকা পড়ে আহত শিশু দুটি অনবরত কাঁদতে কাঁদতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। এসব নির্মাণকাজে মানুষ ও গাড়ি চলাচল বন্ধ করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে কাজ করার নিয়ম থাকলেও এর ব্যত্যয় ঘটছে বারবার।
বিআরটি ধারণাটি বিশ্বের বড় বড় শহরে একটি এক্সক্লুসিভ বাসওয়ে সিস্টেম। এটা সর্বপ্রথম কানাডার অটোয়ায় ১৯৭৩ সালে শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের কুড়িটি বাসহ নানা দেশে বিআরটি ব্যবস্থা চালু হয়। এশিয়ায় সর্বপ্রথম বিআরটি চালু হয়েছে জাকার্তায়। ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় চালু হওয়া ২৫১ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রান্সজাকার্তা বিআরটি বিশ্বের দীর্ঘতম বিআরটি সিস্টেম। ঢাকা বিআরটি কোম্পানি ২০১৩ সালে চালু হয়। তারা উত্তরা থেকে টঙ্গী হয়ে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভার নির্মাণের বর্তমান কাজ পেয়েছিল। ‘বাস র্যাপিড ট্রানজিট’ বা বিআরটি নামে সেই কাজ সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল আরও অনেক আগে। কিন্তু নানা সমস্যায় যথাসময়ে কাজ শেষ করা হয়নি। এমন ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে।
এ ধরনের অবহেলা ও উদাসীনতা দেখানোর কারণ কী? আইন না মেনে চলা আমাদের মজ্জাগত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনের বিধিনিষেধ মেনে না চলার ব্যাপারে সবাই বেপরোয়া ভাব পোষণ করে থাকে। দুর্নীতির মাধ্যমে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে পার পাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এজন্যই জনদুর্ভোগের কথা মাথায় না এনে অন্যায় ও যেনতেনভাবে দায়সারা গোছের কাজ করা হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি যদি ভাবত যে, একটি গার্ডার ছিটকে পড়লে কারো মৃত্যু না হোক, ছয়-সাত ঘণ্টার জন্য এই জনবহুল রাস্তাটিতে চলাচল বন্ধ হয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হবে, তাহলে তারা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে কাজ করত। কিন্তু তাদের সেই ভাবনা কই?
আরও একটি বিশেষ বিষয় হলো, জনবহুল রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলে ট্রাফিক জ্যামের কারণে অকুস্থলে পুলিশ বা ফায়ার ব্রিগেডের উদ্ধারকারী দল কোনোভাবেই সময়মতো পৌঁছাতে পারে না। তবে ঠিক সময়মতো অকুস্থলে পৌঁছাতে না পারাটাও আমাদের উদ্ধারকাজে সক্ষমতা না থাকার একটি শর্ত। এজন্য রাস্তার থার্ড লেনকে সব সময় নির্দিষ্ট স্পিড দিয়ে ব্যবহার করার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কোনোভাবেই রিকশা বা ধীরগতির যানবাহনকে থার্ড লেনে উঠতে দেওয়া যাবে না। উন্নত বিশ্বের শহর এলাকায়ও শুধু হাইস্পিডের গাড়িগুলো থার্ড লেনে উঠে দ্রুতগতিতে চলে যাওয়ার নিয়ম রয়েছে। বিপদের সময় আমাদের সব লেনকেই রিকশা দ্বারা বা জ্যাম দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে থেমে থাকতে দেখা যায়। তাহলে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি দ্রুত চলবে কীভাবে?
সাধারণত বিদেশি প্রকৌশলী ও ঠিকাদার আমাদের দেশের মেগা প্রকল্পে কাজ বাগিয়ে নেন। কিন্তু এসব কাজের শ্রমিক ও মূল দায়িত্ব পালন করেন আমাদের দেশের মানুষ। বিদেশিরা নিজেদের দেশে যত সতর্কতার সঙ্গে নির্মাণকাজের নিয়ম-কানুন মেনে কাজ সম্পন্ন করেন, আমাদের দেশে ঠিক ততটাই অবহেলা করেন। তারা মানসম্মত ও উপযুক্ত মেশিনও ব্যবহার করছেন না। আমাদের শ্রমিক ও নির্মাণ এলাকায় জননিরাপত্তা গ্রহণের ক্ষেত্রেও যেনতেন প্রকারে দুর্বলভাবে কাজ চালিয়ে নেন। এ দেশে এসব আইন ও নিয়মকানুনের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখে তারাও চরম উদাসীন হয়ে দায়সারা নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন, যার চরম খেসারত দিতে হচ্ছে পথচারীদের মূল্যবান জীবনের বিনিময়ে।
আমাদের দেশে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটে আর মানুষের আর্তনাদ ও কষ্ট বাড়ে। কর্তৃপক্ষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় দুর্ঘটনার জন্য শুধু শোক প্রকাশ করে ক্ষান্ত দেন। সব দুর্ঘটনাই যে দুর্ঘটনা নয়, তা যাচাই করার ফুরসত থাকে না। অনেক দুর্ঘটনাই হত্যাকাণ্ডের শামিল। এসব হত্যাকাণ্ডের দায়ভার কে নেবে? এগুলো যে হত্যাকাণ্ড, সেজন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শক্ত হাতে বিচার করতে হবে, শাস্তি দিতে হবে। প্রায়ই তদন্ত কমিটি গঠিত হয় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর। কিন্তু কোনো ঘটনা ঘটতে পারে এমন আইনগুলো অমান্য করে চলেছে বা মানা হচ্ছে না, সেটা অবলোকন করার জন্য আগে কেন তদন্ত কমিটি গঠিত হয় না? অথচ, নির্মাণকাজে দুর্ঘটনা ঘটলে হঠাৎ কাজ বন্ধ করে দিয়ে আরও জনদুর্ভোগ বাড়ানোর জন্য পরামর্শদাতার অভাব নেই।
অতএব, নির্মাণকাজে এসব দুর্বল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার আগে সেগুলোর উপযুক্ততা যাচাই করে নিতে হবে। শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট জনগণের সার্বিক নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে যথাযথ নিরাপদ ও নিরাপত্তা দিয়ে তবেই কাজে হাত দিতে হবে। দেশে আরও অনেক নির্মাণকাজ হবে। এজন্য নতুনভাবে সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণের নীতিমালা চাই। নির্মাণকাজে মূল্যবান জীবন রক্ষার্থে এবং ন্যূনতম জননিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে এসব ঐচ্ছিক গাফিলতি ও অবহেলার আশু অবসান হওয়া জরুরি।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

