জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: দুর্বিষহ হয়ে উঠছে মানুষের জীবনযাত্রা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: দুর্বিষহ হয়ে উঠছে মানুষের জীবনযাত্রা
উত্তরদক্ষিণ । ১৪ সেপ্টেম্বর,২০২২

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:৫০

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বেকারত্ব-দারিদ্রতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, সামজিক অবক্ষয়, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে দাবি করেছেন পরিবেশবিদরা। এই জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করছে বলেও মতামত দিয়েছেন তারা। সময় যত যাচ্ছে এর প্রভাব ততই বেড়ে উঠছে তাই বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা এখনই নিতে হবে চূড়ান্ত উদ্যোগ। বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল অনিক

মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন প্রকৃতি ও পরিবেশ। কিন্তু প্রতিনিয়ত মানুষ এ পরিবেশকে নানাভাবে দূষিত করে নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনছে। বিশ্বজুড়ে এখন জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা ভয়াবহ। এর ফলে বেড়েছে তাপমাত্রা। এতে বহুমুখী দুর্যোগ-দুর্ভোগ নেমে আসছে দেশে দেশে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন, ব্যয়বহুল, অস্বাস্থ্যকর এবং দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। পরিবর্তন ঘটছে প্রাকৃতিক পরিবেশের। এতে কোথাও অস্বাভাবিক বন্যা, কোথাও দাবদাহ আবার কোনো দেশ ভূমিকম্পে হচ্ছে বিপর্যস্ত। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তাপমাত্রার কারণে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা এই পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, তা না হলে মহাসংকটের ঝুঁকিতে থাকতে হবে গোটা বিশ্ববাসীকেই। তারা বলছেন, তাপমাত্রার বিপজ্জনক বৃদ্ধি রোধে পৃথিবীকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠী নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে পড়েছে সারা বিশ্বের মানুষ। আর বাংলাদেশ এই ঝুঁকির তালিকায় থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি। বাংলাদেশের পরিবেশবিদগণের ভাষ্য এই জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে সিপিআরডি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন তারা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা ফলাফলে এমন দাবি তাদের। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল, সিপিআরডির নির্বাহী প্রধান সামসুদ্দোহা, বাদাবন সংঘের নির্বাহী প্রধান লিপি রহমান, এসডিএস নির্বাহী প্রধান রাবেয়া বেগম প্রমুখ।

স্বাস্থ্য সংকট, বাস্তুচ্যুতিসহ আর্থিক ক্ষতির মুখে মানুষ : বাংলাদেশে ৩টি অঞ্চল মোংলা, রাজশাহী ও শরীয়তপুরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা হয়। গবেষণা ফলাফলে গবেষকরা জানান। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত ২০ বছরে এই অঞ্চলগুলোতে যে প্রভাব পড়েছে সে বিষয়টি তারা গবেষণায় তুলে ধরেছেন। গবেষণায় দেখা যায়, আকস্মিক দুর্যোগ, লবণাক্ততার কারণে এসব অঞ্চলের ২০০ টি পরিবার ৯ কোটি ২৪ লাখ ৯৮ হাজার প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এছাড়া তারা স্বাস্থ্য সংকট, বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক ও যৌন হয়রানি, পানিসংকট, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, শিশু শ্রম, বাল্যবিবাহ, সহিংসতা, মানসিক বিপর্যয়, ক্যান্সার সহ নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।

সিপিআরডি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশবিদগণ

৫৫% প্রাকৃতিক সম্পদের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা কৃষকদের : কৃষির দিক থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল অত্যন্ত উৎপাদনশীল। অন্যান্য এলাকার তুলনায় উপকূলীয় এলাকা অনেক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝুঁকির উচ্চমাত্রা এবং স্থানীয় দরিদ্র সম্প্রদায়ের ওপর এ ঝুঁকির আশঙ্কাজনক প্রভাবের কারণে অঞ্চলটি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ উপকূল বরাবর সমুদ্রের স্তর বছরে প্রায় তিন মিলিমিটার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মাটিতে লবণাক্ততা ২ শতাংশ বেড়েছে (মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, ২০১০)। এ লবণাক্ততার কারণে চাল উৎপাদন ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ এবং গম ৩২ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। আইপিসিসির পঞ্চম প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বাংলাদেশে প্রায় ২.৭ কোটি লোক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের জীবিকা নির্বাহের প্রায় ৮৮ শতাংশ কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল এবং জিডিপিতে অবদান প্রায় ১৬ শতাংশ। কৃষি মৌসুমি অবস্থার যেকোনো পরিবর্তনের সাথে সংবেদনশীল, এমনকি তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মৌসুমের সময় ও সময়কাল, বারবার বন্যাসহ মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির সাথে কৃষির উৎপাদন সরাসরি জড়িত। ২০২০ সালে প্রাক্কলিত দেশের মোট শ্রম খাতের প্রায় ৩৭.৭৫% কৃষিতে জড়িত। উচ্চতাপমাত্রা ও অধিক বৃষ্টিপাত কোনো কোনো ক্ষেত্রে শস্য উৎপাদনভিত্তিক আয় বাড়াতে অবদান রাখলেও (হোসেন এবং অন্যান্য, ২০১৯) অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইতিবাচক সে অবদানকে নেতিবাচক অবস্থানে নামিয়ে নিয়ে আসতে পারে। আশঙ্কার বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকরা প্রায় ৫৫% প্রাকৃতিক সম্পদের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কৃষিকাজের জন্য জমির পরিমাণ কমে গিয়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রায় ৩০% কমে যেতে পারে। এমনকি মানবসম্পদের জোগান ১৫% হ্রাস এবং কৃষকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রায় ২৫% বেড়ে যেতে পারে। ফলে সার্বিক উৎপাদনশীলতা কমে আয় হ্রাস পাওয়ায় আর্থিক সম্পদে গ্রামীণ মানুষের অভিগম্যতা প্রায় ৪৬% কমে যেতে পারে।

মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে’: বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, প্রকৃতি নির্ভর ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে ব্যবহার না হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এই অধিকার যাদের লঙ্ঘন হচ্ছে তাদের কথাগুলো নীতি নির্ধারকদের কাছে পৌঁছায় না। তিনি বলেন, আমাদের দেশ পানি দুষ্প্রাপ্যের দেশ। শুকনো মৌসুমে মাত্র ২০ ভাগ পানি আসে। তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে যাদের অবদান বেশি তাদের সমস্যা সমাধানে বেশি এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এজন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। পির্তৃভূমি রক্ষা করা মানুষের মানবাধিকার। কিন্তু এটি রক্ষা করা হচ্ছে না।

পরিবর্তন আসছে জীবনযাত্রার ও জীবিকার: সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বক্তারা বলেন, দেশের উন্নয়ন কর্মকাøে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা না থাকা ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ পর্যন্ত উন্নয়ন না পৌঁছায় এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও বেশি ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। এই পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ও জীবিকার পরিবর্তন আসছে। দুর্যোগে অধিকমাত্রায় বেশি বঞ্চনার শিকার হন নারীরা। দুর্যোগকালে নারীদের প্রাত্যহিক কাজের পাশাপাশি স্বামীর বাইরের কাজেও সহায়তা করতে হয়। বক্তারা বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গবেষণা ফলাফলগুলো বাংলাদেশে সফররত ইউএনএইচসিআর -এর জলবায়ু ও মানবাধিকার দূত ড. ইয়ান ফ্রাইকে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের আহ্বান জানান।

২০ বছরে বৈশ্বিক খরচের রেকর্ড : গত ২০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে আমেরিকা মহাদেশে। এই সময়কালে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নানা কুফলে মারা যায় ৫ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (পিপিপি-তে) ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে আর এর সরাসরি ফলাফল হিসাবে আবহাওয়া বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে ১১ হাজারটি। ইউএনইপি অ্যাডাপ্টেশন গ্যাপ’-এর রিপোর্টে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বা ফলাফলের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক খরচের পরিমাণ এখনকার চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যাবে আর বর্তমানে যা ধারণা করা হচ্ছে, তার চেয়ে চার থেকে পাঁচগুণ বাড়বে ২০৫০ সাল নাগাদ। অন্যদিকে ওই রিপোর্টটিতে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ার সীমা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে- এতে একদিকে যেমন মানুষের দুর্ভোগ কমবে অন্যদিকে নামতে থাকবে খরচের হারও। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দাবদাহ, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, যা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

উত্তরদক্ষিণ । ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

নাগরিক এবং ভোক্তাদের রাখতে হবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা: যাদের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে তাদের চেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে প্রান্তিক সাধারণ মানুষ। জলবায়ুজনিত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এই মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ার সামর্থ্যও তাদের নেই। বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে নাগরিক এবং ভোক্তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিবেশবিষয়ক আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ করা উচিত। প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন- গ্যাস, কয়লা, তেল ইত্যাদির ব্যবহার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা উচিত, এ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বনায়ন বৈশ্বিক উষ্ণতা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আমাদের সামাজিক বনায়নের ওপর আরও বেশি বেশি জোর দেওয়া উচিত। এর জন্য আমাদের দেশের বিভিন্ন সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। অসচেতনতাও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading