ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস: শিক্ষা কোনও পণ্য নয়, সবার মৌলিক অধিকার

ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস: শিক্ষা কোনও পণ্য নয়, সবার মৌলিক অধিকার

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন । শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৪:১০

আজ শনিবার মহান শিক্ষা দিবস ২০২২। যথাযোগ্য মর্যাদায় সারাদেশে আজ এ দিবসটি পালিত হতে যাচ্ছে। পাকিস্তান সরকারের গণবিরোধী, শিক্ষা সংকোচনমূলক শিক্ষানীতি চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে এবং একটি গণমুখী শিক্ষানীতি প্রবর্তনের দাবিতে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র-জনতার ব্যাপক গণআন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত দিন এই শিক্ষা দিবস।আজ থেকে ৬০ বছর আগে এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসক আইয়ুব খানের চাপিয়ে দেওয়া ‘শরীফ কমিশনে’র শিক্ষানীতি প্রতিহত করতে গড়ে উঠেছিল ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন। ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন ‘অল-পার্টি স্টুডেন্ট অ্যাকশন কমিটি’ দেশব্যাপী হরতাল কর্মসূচির ডাক দেয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দমাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা লেলিয়ে দেয় পুলিশ বাহিনী।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট মোড়ে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে মোস্তফা, বাবুল, ওয়াজীউল্লাহ প্রমুখ শহীদ হন। সেই থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ছাত্র সংগঠন প্রতিবছর দিনটিকে ‘মহান শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। সবাই জানি, যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। শিক্ষা ছাড়া উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণ কল্পনামাত্র। তাই একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিলেই হয়। সেদিন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান গঠিত শিক্ষা কমিশনের শিক্ষানীতির প্রতিবাদে ছাত্রদের আহুত হরতালে পুলিশের দফায় দফায় লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের মাত্র ২ মাস পরেই (৩০ ডিসেম্বর, ১৯৫৮) এই শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। ‘শরীফ কমিশন’ নামে খ্যাত এসএম শরীফের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। এতে শিক্ষা বিষয়ে যেসব প্রস্তাবনা ছিল তা ছিল প্রকারান্তরে শিক্ষা সংকোচনের পক্ষে।

প্রস্তাবিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- সস্তায় শিক্ষা করা যায় বলে যে ভুল ধারণা রয়েছে তা ত্যাগ করতে হবে। এতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ছাত্র বেতন বর্ধিত করার প্রস্তাব ছিল। ২৭ অধ্যায়ে বিভক্ত শরীফ কমিশনের ওই প্রতিবেদনে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত সাধারণ, পেশামূলক শিক্ষা, শিক্ষক প্রসঙ্গ, শিক্ষার মাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, হরফ সমস্যা, প্রশাসন, অর্থবরাদ্দ, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। আইয়ুব সরকার এই রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ এবং তা ১৯৬২ সাল থেকে বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। এই কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার প্রস্তাব করে। শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রম করাতে ১৫ ঘণ্টা কাজের বিধান রাখা হয়েছিল। রিপোর্টে বর্ণমালা সংস্কারেরও প্রস্তাব ছিল। ছাত্ররা আইয়ুবের এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয়। এক পর্যায়ে মিছিলে পুলিশ পেছন থেকে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও গুলি বর্ষণ করে। সরকারি হিসাবে একজন নিহত, ৭৩ জন আহত এবং ৫৯ জনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল- ৩ জন নিহত হয়েছেন। সেদিন সারাদেশেই মিছিলের ওপর পুলিশ হামলা চালায়।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণের বিপুল সমর্থনে সরকার গঠনের পর দেশের সব রাজনৈতিক মতবাদ এবং সমাজের নানা চিন্তার সব অংশের মানুষের মতামত গ্রহণ করে সব চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়ে জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়। জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে তা অনুমোদন করা হয়। এ জন্য সরকারকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। আমাদের দেশে এই প্রথম সরকারি ও বিরোধী দলসহ জাতীয় ঐকমত্যে একটি জাতীয় মৌলিক নীতি, যা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

এই শিক্ষানীতিতে ছাত্রসমাজ ও জাতির ৬০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেছে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সার্বজনীন মতামতের ভিত্তিতে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা, যেখানে শিক্ষা হবে সবার জন্য অবাধ। ‘শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা সবার অধিকার’ এটি সর্বস্তরে প্রতিফলিত হোক মহান শিক্ষা দিবসে। শিক্ষাকে আমরা পণ্য হতে দেব না। সবার জন্য শিক্ষা অবারিত থাকবে। উন্মুক্ত থাকবে সব বয়সের, সব গোত্রের, সর্বজনের জন্য। সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে শিক্ষার আলো।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

ইউডি/সিফাত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading