মানহীন খাদ্য প্রতিরোধে আইনের সর্বাত্মক পদক্ষেপ কাম্য
মুসাহিদুজ্জামান আহমেদ । সোমবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৯:৩০
খাদ্য গ্রহণ ছাড়া মানুষসহ কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারে না। তবে সে খাবার অবশ্যই হতে হয় বিশুদ্ধ। দূষিত বা ভেজালমিশ্রিত খাদ্য মানুষের জন্য স্বাস্থ্যহানির কারণ হয়ে থাকে। অথচ আজকের বাংলাদেশে সেই বিশুদ্ধ খাবার খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজার থেকে কেনা কোনো খাদ্যই যেন আর বিশুদ্ধ নেই। খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ এই মৌলিক অধিকারটিও আজ চরম ভয়াবহতার শিকার। অতি মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীদের একটি চক্র ভেজাল ও মানহীন খাদ্য বাজারে সরবরাহ করে মানুষের জীবনকে শঙ্কার মধ্যে ফেলছে। তারা কোনো বিধিনিষেধ কিংবা আইনকানুনের তোয়াক্কা করে না।
বিভিন্ন গবেষণায় দেশের অনিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। পোলট্রি ফার্মের ডিমে ট্যানারি বর্জ্যরে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। আটায় মেশানো হচ্ছে চক পাউডার বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট। আনারসে হরমোন প্রয়োগ করে দ্রæত বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলে আসছে বহুকাল ধরে। আম গাছে মুকুল ধরা থেকে শুরু করে আম পাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে রাসায়নিক ব্যবহার এখন ওপেন সিক্রেট। মিষ্টিজাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হয় বিষাক্ত রং, সোডা, স্যাকারিন ও মোম। কাপড়ের বিষাক্ত রং, ইট ও কাঠের গুঁড়া মেশানো হয় খাবারের মশলায়। তেল, আটা, চিনি, কেক, বিস্কুট কিছুই আজ ভেজালমুক্ত নয়। বাজারের ৮৫ শতাংশ মাছে ফরমালিন মিশিয়ে পচন রোধ করা হয়। শাকসবজিতে বিষাক্ত স্প্রে, সব ধরনের ফলমূল দ্রæত পাকিয়ে রঙিন বানাতে সর্বত্র কার্বাইড, ইথোফেন, আর পচন রোধে ফরমালিন প্রয়োগ করা হচ্ছে। নকল ও ভেজাল ওষুধে ছেয়ে গেছে বাজার। এসব প্রতিরোধ করা জরুরি।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ১৪ বছরের কারাদণ্ডেরও বিধান রয়েছে এ আইনে। ২০১৫ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও ভেজাল দানকারী চক্রকে দমন করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আইনের কার্যকারিতা
খুবই কম। দেশে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। এ ব্যাপারে প্রভাবশালী কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না। ভেজালের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। ভেজাল প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে অতি মুনাফালোভী, অসাধু খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে পারলে এ ক্ষেত্রে সুফল মিলতে পারে।
আমরা বলতে চাই, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যারা ব্যবসার নামে মানহীন খাদ্যে বাজার সয়লাব করতে চান, তাদের প্রতি কোনো অনুকম্পা নয় বরং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভেজাল প্রতিরোধে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আমরা মনে করি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা এবং মানুষের সচেতনতার মধ্য দিয়ে দেশে মানহীন খাদ্য উৎপাদনকারীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে।
সর্বোপরি আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, খাদ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া এ সমস্যা থেকে উত্তরণে প্রতিটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ দরকার। দেশে রমজান মাসসহ বিভিন্ন সময়ে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকে। তবে সারা দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। তাছাড়া এসব অভিযানে ভেজাল পণ্য বিক্রির দায়ে যে সাজা দেওয়া হয়, তা মোটেই গুরুদন্ড নয়। ফলে ভেজাল প্রতিরোধে এসব অভিযানের কার্যকারিতা সামান্যই। এ-সংক্রান্ত আদালতের বক্তব্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়েছে, শুধু রমজানে ভেজালবিরোধী অভিযান কাম্য নয়, এটা চলা উচিত সারা বছর।
পরিশেষে আমরা আশা করি, খাদ্য নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যেন শুধু কর্মকর্তা হিসেবে কাজ না করেন, তারা যেন দেশপ্রেমিক হিসেবে জনগণের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। বস্তুত আইনের যথার্থ প্রয়োগ, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা এবং মানুষের সচেতনতাই পারে দেশে মানহীন খাদ্যের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে। ইতোপূর্বে এ ক্ষেত্রে নানা পদক্ষেপেও যেহেতু ফল মেলেনি, তাই ভেজাল ও মানহীন খাদ্যের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ আমাদের কাম্য।
লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক।
ইউডি/সিফাত

