গুজবের আগ্রাসন ঠেকাতে সচেতনার বিকল্প নেই
ফারহানা ইয়াসমিন । সোমবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৯:৪০
কানের খবর না নিয়েই চিলের পিছে দৌড়ানো মানবজাতির এক অভ্যাস। এই দৌড়ানো যেমন অর্থহীন তেমনি ভিত্তিহীনও। ভিত্তিহীন কোনো কিছুর প্রচার এবং প্রচারোনার নামই হলো গুজব। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘রিউমার’। প্রচারিত প্রমাণহীন-বিকৃত তথ্যই হলো গুজব বা রিউমার।
১৯৪৪ সালে রবার্ট এইচ নাপ তার ‘অ্যা সাইকোলজি অব রিউমার’ বইয়ে গুজব সম্পর্কে আলোচনা করার সময় বলেন- ‘গুজব মূলত ভ্রান্ত আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে’। অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে গুজব এমন বিষয় নিয়ে সৃষ্টি হয়, যা সম্পর্কে মানুষের কোনো পরিষ্কার ধারণা থাকে না। কিন্তু সে ঘটনা বা বিষয় সম্পর্কে থাকে ‘অতি আগ্রহ’। গুজব মূলত অস্পষ্ট প্রচার, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে তোলে। একই বইয়ে তিন প্রকার গুজব চিহ্নিত করেছেন এইচ নাপ। এক. পিপ ড্রিম রিউমার: এখানে গুজব ছড়ানো ব্যক্তি চান গুজবটি সত্য বলে প্রচার করতে, দুই. ভগি বা ফিয়ার রাখা রিউমার: এটির উদ্দেশ্য হলো সমাজে আতঙ্ক ছড়ানো, তিন. ওয়েজ ড্রাইভিং এগ্রেশন রিউমার: এই গুজবের উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা। এরপর ১৯৪৭ সালে গর্ডন অলপোর্ট এবং লিও পোস্টম্যান তাদের ‘দ্য সাইকোলজি অব রিউমার’ বইয়ে গুজব ছড়ানোর মনস্তাত্তি¡ক কারণগুলো আলোচনা করেন। তাদের মতে, অনিশ্চিত পরিস্থিতি, উদ্বেগ, তথ্যের অস্পষ্টতা, নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা ও ভালো লাগা, প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখা এবং দৃঢ় সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি হলো গুজব ছড়ানোর মনস্তাত্তি¡ক কারণ। এগুলো ছাড়াও গুজব প্রচারের শর্ত হিসেবে দুটি বিষয় উল্লেখ করেছেন তারা- তা হলো কোনো বিষয়ের গুরুত্ব এবং দুর্বোধ্যতা ।
সাধারণত যে বিষয়ের প্রতি মানুষের মধ্যে বেশি আগ্রহ বা উৎসাহ থাকে, সে বিষয়কে ঘিরে গুজব ছড়ায় অতি দ্রুত গতিতে। এই গুজব ছড়ানোর রয়েছে নানা রকম মাধ্যম। যদিও এক্ষেত্রে রয়েছে বিরাট পরিবর্তন। আগে মানুষ মুখে মুখে গুজব ছড়াতো; এখন গুজব ছড়ানো হয় বিভিন্ন ইলেকট্রনিকসের মাধ্যমে। সব থেকে জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুবিধা পেতে বাংলাদেশে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানোর দৃশ্য রুটিন হয়ে উঠেছে। গুজব সৃষ্টিকারী ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টুইটারের মতো মাধ্যমগুলোতে এমন সব আকর্ষণীয় কনটেন্ট ও শিরোনাম সংযুক্ত করে লিংক, ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে, যা মানুষ যাচাইবাছাই না করেই শেয়ার করছে নিজের ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যমের টাইমলাইনে। ফলশ্রæতিতে বুলেটের গতির চেয়েও দ্রæতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে ‘গুজব’।
চলতি বছরের জনশুমারির তথ্য মতে, বাংলাদেশে পাঁচ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে যে বিশাল জনসংখ্যা রয়েছে তাদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ৮৬ শতাংশই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের হাতে আছে স্মার্ট ফোন। অর্থাৎ ৬-৭ কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আওতায় রয়েছে এবং এদের মধ্যে কমবেশি প্রায় সবাই গুজবের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে জেনে কিংবা না জেনে। অনেকে যাচাইবাছাই না করেই স্বার্থান্বেষী মহলের ছড়ানো গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার মতো ফাঁদে পা দেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তিশালী উপস্থিতি বাঙালির মনে পুঁতে দিচ্ছে গুজবের বীজ। বিশেষজ্ঞ মত অনুযায়ী, বাঙালি জাতি প্রচন্ড আবেগপ্রবণ ও বিশ্বাসপ্রবণ। শোনা কথা ও কল্পনা-অনুমানপ্রসূত কথা শুনতে এবং বলতে তারা বড্ড পছন্দ করে। মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বেশি সত্য মনে করে তারা। এরূপ পরিস্থিতিতে দেশের সাইবার নিরাপত্তায় নিয়োজিত বিভাগকে বিভিন্ন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশের হাতে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকসেস। কাজেই তাদের সচেতন করার মধ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে গুজবের রেশ টানা সম্ভব। মোটকথা, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগ যেহেতু ভ্রান্ত তথ্য ছড়ানোর সুযোগকে অবারিত করেছে সেক্ষেত্রে গুজবকে রুখতে নিতে হবে কার্যকর ব্যবস্থা। সর্বোপরি, গুজবের আগ্রাসন ঠেকাতে সচেতনার বিকল্প নেই।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সিফাত

