মাদক বিস্তার রোধে কারবারের শেকড় উৎপাটন জরুরি
সেলিম রায়হান । শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:৩০
বাংলাদেশের প্রতিটি আনাচে কানচে আজ মাদকে ছেয়ে গেছে, মাদকের ভয়াল গ্রাস আজ কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ, ধ্বংস করে দিচ্ছে যুব সমাজকে। প্রাণস্পন্দনে ভরা সদাদীপ্ত অনুষঙ্গগুলো ধীরে ধীরে নিষ্প্রভের পথে এগোচ্ছে। তরুণ সমাজের উল্লাস-গতিময়তার সৃজন-মননশীল প্রজ্ঞা ও মেধা ধূসর মেঘের আড়ালে ক্রমান্বয়ে মুখ লুকোচ্ছে। সামগ্রিক পর্যালোচনায় এ সবের মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে ঘৃণ্য মাদক বাণিজ্য। মাদকের বেপরোয়া বিস্তার শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বকে গভীর অন্ধকারে নিপতিত করার কুৎসিত ভূমিকা পালন করছে।
একদিকে বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি-আধুনিক শিক্ষার মোড়কে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী-গবেষক উন্নয়ন অগ্রগতির ধারাকে প্রবল শানিত করছে; অন্যদিকে সমাজের বৃহত্তর অংশ মাদকের বেড়াজালে মনুষ্যত্ব-মানবিকতার চরম বিপর্যয়ে সর্বনিকৃষ্ট অতিমারির ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহে সহায়তা করছে। আগামী দিনের জাতিরাষ্ট্র পরিচালনা ও সুষ্ঠু-স্বাভাবিক-সাবলীল সমাজ পরিক্রমায় সুস্থ দেহ-মনের অধিকারী যথার্থ অর্থে সমাজ প্রকৌশলী হিসাবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে বিকৃত-অসংলগ্ন-অসংযত পরিবেশ সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ করবেই-নিঃসন্দেহে তা বলা যায়। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থা; সর্বোপরি বিরাজমান পরিস্থিতি কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা না হলে মাদকের ভয়ংকর থাবা বিস্তৃত হওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মাদকের মধ্যে ৩২ ধরনের মাদকের সন্ধান পাওয়া যায়। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই দেশি-বিদেশি মদ, দেশি-বিদেশি বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টি.ডি জেসিক ইঞ্জেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইঞ্জেকশন),
বাংলাদেশে মাদকের চাহিদা অনেক বেশি, তাই পাল্লা দিয়ে সরবরাহও অনেক। কিন্তু সরবরাহ যদি আমরা বন্ধ করতে না পারি, তাহলে দিন দিন চাহিদা বেড়েই চলবে। বাংলাদেশকে মাদক পাচারের মাধ্যমও ধরা হয় এবং ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে কোকেন বিষয়ক অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আমাদের ১৬ কোটি মানুষের দেশে এখন মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। আর এসবে মাদকের শীর্ষে রয়েছে ইয়াবা। যেটা উত্তেজক মাদক হিসেবেও ধরা হয়। এছাড়াও হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিলের ব্যবহারও দেখা যায়। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চার বছরে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর উদ্ধার করেছে ৪৮ কেজি হেরোইন, ১৬ হাজার কেজি গাঁজা, দেড় লাখ বোতল ফেনসিডিল এবং ৫০ লাখ পিস ইয়াবা। এর বাইরে পুলিশ বিজিবি ও কোস্টগার্ডরা বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করে। যে পরিমাণ মাদক ধরা পড়ে সেটা বিক্রি হওয়া মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশ মাদক ধরা পড়ে না।
বাংলাদেশেই শুধু ইয়াবা ট্যাবলেটেরই বিক্রি হয় ৪০ কোটির মতো। প্রতি ট্যাবলেটের দাম ২০০ টাকা হিসেবে যার বাজার মূল্য প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের মাদকসেবীদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি নারীও আছে। আমাদের দেশে মাদকের ব্যবহার কেন কমছে না এই প্রশ্নের উত্তর সবার জানা। মাদক দ্রব্যের অবৈধ অর্থনীতির আকার এখন বেশ বড় । যদি বড় ব্যবসায়ী বলা হয়, তাহলে তেমন মাদক ব্যবসায়ী আছে পাঁচ হাজার। নেতা, পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাসহ অনেকেই জড়িত আছেন মাদক ব্যবসার সঙ্গে। বাংলাদেশে শুধু শহরেই নয়, গ্রাম এলাকাতেও দেখা যায় মাদকের ভয়াল থাবা। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে সরকারকে অবশ্যই কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে, মাদকের রুটগুলোতে টহল বাড়াতে হবে এবং যারা মাদকে আসক্ত সেসব যুব সমাজকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। তবেই আমরা জাতি হিসেবে মাদকমুক্ত একটি দেশ গড়তে পারব। যুব সমাজও রক্ষা পাবে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে।
দেশের বিজ্ঞজনের দাবি, মাদক পাচার ও সেবন বন্ধ করতে মাদকের চাহিদা কমানোর পাশাপাশি জোগানও হ্রাস করতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারাগুলো সময়োপযোগী করে এর প্রয়োগ ও অনমনীয় বাস্তবায়ন, মাদক ব্যবহারের ধ্বংসাত্বক প্রভাব সম্পর্কে গণসচেতনতা তৈরি, সীমান্ত এলাকা সুরক্ষিত করে মাদক চোরাচালান কমানো এবং মাদকাসক্তদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ক্রীড়ায় সম্পৃক্তকরণসহ যথাযথ পুনর্বাসন করা গেলে মাদকের বেপরোয়া আগ্রাসন অনেকটা রোধ করা সম্ভব।
লেখক: সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

