বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি : শিশুদের নিয়েও শঙ্কা, শব্দ দূষণ নিরব ঘাতক
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:০৫
জাতিসংঘের প্রকাশ করা এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শব্দ দূষণে বিশ্বের শীর্ষে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে শব্দ দূষণ রোধে যেসব প্রচারণা চালানো হয়েছে তাতে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাই বেশি বলা হয়েছে। তবে সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যম বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস শরীরের অনেক গুরুতর অসুখের কারণ। যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে মত বিশেষজ্ঞদের। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুল অনিক
শব্দদূষণ বলতে মানুষের বা কোনো প্রাণীর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী কোনো শব্দসৃষ্টির কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বোঝায়। গাড়ির হর্ন, কলকারখানা, মাইকের অসতর্ক ব্যবহার, নির্মাণকাজ থেকে দূষণ সৃষ্টিকারী তীব্র শব্দের উৎপত্তি হয়। পরিবেশের কোলাহল থেকেও মারাত্মক শব্দদূষণের সৃষ্টি হতে পারে। কোলাহল হলো অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ যা বিরক্তির উদ্রেক করে এবং শোনার সময় তা অসংহত ও উচ্চ মনে হয়। শহরের আবাসিক এলাকায় শব্দ বা আওয়াজের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৩৫ থেকে ৪৫ ডেসিবল, আর নগরে-বন্দরে ৪৫-৫০ ডেসিবলের বেশি নয়। কিন্তু আমাদের দেশে শহর, নগর ও বন্দরে শব্দদূষণের মাত্রা ৮০ থেকে ১০০ ডেসিবলেরও বেশি। এ কারণে শব্দদূষণের পরিণাম অবশ্যই ভয়াবহ। শব্দদূষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ চিন্তা ও চেতনায় বাধা সৃষ্টি করে। নগরজীবনে স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে শব্দদূষণ।
উচ্চকিত কোলাহলের ফলে মানুষের ওপর অনুভূতিগত, শারীরিক অথবা মানসিক প্রভাব পড়তে পারে। এতদিন পর্যন্ত ঢাকায় শব্দ দূষণ রোধে যেসব প্রচারণা চালানো হয়েছে তাতে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাই বেশি বলা হয়েছে। কিন্তু মানুষের কানের যতটুকু সহ্য ক্ষমতা তার চেয়ে অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস শরীরের অনেক গুরুতর অসুখের কারণ বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অতিরিক্ত শব্দে মানুষ শ্রবণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার ঝুঁকিতে রয়েছেন, সেই সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শব্দদূষণ দুশ্চিন্তা, অবসাদ, উদ্বিগ্নতা, নিদ্রাহীনতা ইত্যাদি বাড়িয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে ৩০টি কঠিন রোগের অন্যতম কারণ হলো শব্দদূষণ।
নগরবাসীর হার্টের রোগের কারণ অতিরিক্ত শব্দ
অতিরিক্ত শব্দ যে হৃদযন্ত্রের অসুখের উৎস হতে পারে এমনটা অনেকেই চিন্তা করেন না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিও থোরাসিক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিমেল সাহা বলছেন, “উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। বেশি অ্যাড্রেনালিন মানুষের রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দনের হার বৃদ্ধি করে। চারপাশে পরিবেশে যদি উচ্চমাত্রার শব্দ থাকে এবং এমন পরিবেশে অনেক সময় কাটলে অতিরিক্ত অ্যাড্রেনালিন হরমোনের ক্ষরণ হতে থাকবে। তাতে হাইপারটেনশন হবে, প্রেশার বাড়বে আর হাইপারটেনশন, প্রেশার বেশি থাকলেই হৃদরোগের ঝুঁকি অবশ্যই বাড়বে।” অধ্যাপক হিমেল সাহা আরও বলছেন, হাইপারটেনশন ও হৃদরোগ কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করে।

শব্দ দূষণ বাড়াচ্ছে স্ট্রোকের ঝুঁকি
কান শব্দকে গ্রহণ করে কিন্তু তার তরঙ্গ শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কে পৌছায় স্নায়ুর মাধ্যমে। মস্তিষ্কে কানের জন্য নির্ধারিত অংশ আছে। সেই অংশটির মাধ্যমেই আসলে মানুষের শ্রবণ প্রক্রিয়া কাজ করে এবং মানুষ শুনতে পায়। অতিরিক্ত শব্দ তাই অবশ্যই মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলবে। শব্দ উচ্চ রক্তচাপ তৈরি করে আর মস্তিষ্কে স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় কারণই হল উচ্চ রক্তচাপ। জাতীয় নাক কান গলা ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ আবু হানিফ বলছেন, “যখনই উচ্চ মাত্রার শব্দ প্রতিনিয়ত কানের মাধ্যমে আপনার মস্তিষ্কে পৌঁছাবে, মস্তিষ্ক এক পর্যায়ে সেটা আর সহ্য করতে পারবে না। মস্তিষ্কের কোষে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া দেখা দেবে। উচ্চ রক্তচাপে মস্তিষ্কের রক্তনালী বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাতে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়, রক্তনালী ছিঁড়ে যায়। এগুলোই স্ট্রোকের মূল কারণ। তাহলে দেখুন অতিরিক্ত শব্দ দিয়েই কিন্তু এর শুরু হতে পারে।”

মানসিক ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে শিশুরা
শব্দ দূষণে যে শুধু বয়ষ্ক মানুষেরা ক্ষতিগ্রস্থের শিকার এটা একদমই নয়। এর ভয়াবহতার শিকার শিশুরাও। এতে বিশেষ করে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় ও তারা লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমানে ঢাকা নগরীতে শব্দ দূষণ মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে এমনই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে এ শহরের শিশুরা। এক জরিপে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) বলেছে, প্রাপ্ত ফলাফলে শব্দ দূষণ মানুষের মানসিক ও শারীরিক অবস্থার জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। এভাবে শব্দের দূষণ চলতে থাকলে রাজধানীতে শিশুদের মধ্যে বধিরতার হার ক্রমান্বয়ে বাড়বে এবং তারা লেখাপড়ায় অমনোযোগী ও বিকার মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠবে। এ বিষয়ে ন্যাশনাল কলেজ অব হোম ইকনোমিক্সের চাইল্ড ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল রিলেশন বিভাগের প্রধান ফরিদা আকতার বলেন, শব্দ দূষণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণ। তবে এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। প্রতিনিয়ত উচ্চ মাত্রার শব্দের কারণে শিশুরা কানে কম শোনা, লেখাপড়ায় অমনোযোগী ও স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা ভুগতে থাকে। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে এক সময় তারা বধির ও মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পরার ঝুঁকি রয়েছে।
শব্দ যেভাবে বাড়াচ্ছে মানসিক রোগ
অতিরিক্ত শব্দ শুধু বিরক্তিরই উদ্রেক করে না এটি গুরুতর মানসিক রোগেরও উৎস, বলছিলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার। এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মতে, “মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনে অনেক চাপের মধ্যে দিয়ে যায়। সেটি মোকাবেলার একটা ক্ষমতাও তার থাকে। কিন্তু সেজন্য সুস্থ পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু চারপাশের পরিবেশে যদি অসহনীয় কিছু থাকে যেমন অনেক উচ্চ শব্দ যখন মনে প্রতিনিয়ত বিরক্তির উদ্রেক করে, রাগ, চাপা উত্তেজনা তৈরি করে। তখন মানুষের মনের চাপ মোকাবেলায় বাধা তৈরি হয়। উচ্চ শব্দ মনে খারাপ অনুভূতি তৈরি করে। চাপ সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে মানসিক সুস্থতা বাধাগ্রস্ত হয়।”
শব্দ তাই মনে চাপ ও উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। উদ্বেগ নিদ্রাহীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় শব্দের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। এসব কারণে একজন ব্যক্তির মেজাজ খিটখিটে হতে পারে। মনোযোগ দিয়ে কাজ করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। শিশুদের শেখার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। আর শেষমেশ মানসিক চাপ ও নিদ্রাহীনতা শরীরের নানা অঙ্গকে প্রভাবিত করে। এছাড়া একজন মানুষ যদি তার চারপাশের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তাহলে রাগজনিত সমস্যা হতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক সারাক্ষণ সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সংকেত দেয়। অনেক জোরে শব্দ হলে তাই মানুষ ভয় পায়, কেঁপে ওঠে। সর্বক্ষণ চারপাশে উচ্চ শব্দে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার এটিও একটি কারণ।
শুরুতেই কমে শ্রবণশক্তি
শব্দ দূষণকে বলা হয় নীরব ঘাতক। আর বিশেষ করে ঢাকা শহরে শব্দ দূষণের বহু উৎস রয়েছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। শব্দ দূষণে শরীরে যে অঙ্গটি সবচেয়ে প্রথম আক্রান্ত হয় সেটি হল কান এবং শ্রবণশক্তি। মানুষের কান ৭০ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দ সহ্য করতে পারে। কিন্তু এর বেশি হলেই ক্ষতি। দিনের পর দিন যদি লম্বা সময় ধরে কেউ ৭০ ডেসিবলের উপরে শব্দের মধ্যে থাকেন তাহলে শ্রবণশক্তি ক্রমশ কমে যেতে থাকে। যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন তাদের মধ্যে সারাক্ষণ হর্ন বাজানো গাড়িচালক নিজেই রয়েছেন। আরও রয়েছেন ট্রাফিক পুলিশ, সড়কে দীর্ঘ সময় থাকতে হয় এমন কেউ, নির্মাণ কর্মী।

কিন্তু আবাসিক এলাকাতেও যে পরিমাণে গাড়ির হর্ন, নির্মাণ কাজ বা মাইকের শব্দ শুনতে হয় তাতে নিজের বাড়িতে বসে থেকেও একজন মানুষের কান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জাতীয় নাক কান গলা ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ আবু হানিফ বলছেন, “কানের ভেতরে রিসেপ্টর প্রথমে শব্দ তরঙ্গকে ধারণ করে, তারপর ককলিয়ার নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পাঠায়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শব্দ এই রিসেপ্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ক্রমাগত যারা অনেক শব্দের মধ্যে থাকেন তারা ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি হারাতে থাকেন। অনেকে টেরও পান না যে তারা ধীরে ধীরে কানে কম শুনছেন।”
শব্দ নিয়ন্ত্রণের ধারণাটি প্রায়শই পরিবেশ বা কর্মক্ষেত্রে শব্দ হ্রাস করতে ব্যবহৃত হয়। শব্দ নিয়ন্ত্রণ, শব্দ প্রসারণ, হ্রাস করতে এবং ব্যক্তিদের ওভার এক্সপোজার থেকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত হতে পারে। যখন শব্দ নিয়ন্ত্রণগুলো সম্ভবপর বা পর্যাপ্ত না হয়, তখন মানুষ শব্দদূষণের ক্ষতিকারক প্রভাবগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পদক্ষেপ নিতে পারে। যদি মানুষ উচ্চশব্দের আশপাশে থাকে, তবে তারা শ্রবণ সুরক্ষা যেমন কানের প্লাগ বা কানের মাফল দিয়ে তাদের কানের সুরক্ষা দিতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেশাগত শব্দদূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রয়াসে বিভিন্ন প্রোগ্রাম এবং উদ্যোগের উদ্ভব হয়েছে। এই প্রোগ্রামগুলো শব্দ সরঞ্জাম ব্যবহার এবং ক্রয়ের প্রচার করে এবং ডিজাইন করতে উৎসাহ দেয়।
নগর পরিকল্পনা এবং রাস্তার উন্নততর নকশা দ্বারা রোডওয়ে এবং অন্যান্য শহুরে শব্দদূষণ সংক্রান্ত কারণগুলোর হ্রাস করা যায়। যানবাহনের গতি সীমাবদ্ধতা, সড়কপথের পৃষ্ঠের জমিনের পরিবর্তন, ভারী যানবাহনের সীমাবদ্ধতা, ব্রেকিং হ্রাস করতে ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার এবং টায়ার ডিজাইন করে রোডওয়ে শব্দ হ্রাস করা যেতে পারে। এই কৌশলগুলো প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাস্তাঘাটের শব্দের নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কম্পিউটার মডেল, যা স্থানীয় টোপোগ্রাফি, আবহাওয়া, ট্র্যাফিক অপারেশন এবং হাইপোথেটিকাল প্রশমন করতে সক্ষম। শব্দবিহীন জেটইঞ্জিন ব্যবহার করে বিমানের আওয়াজ হ্রাস করা যায়। এ ছাড়া ফ্লাইটের পথ ও রানওয়ের সময় পরিবর্তনের মাধ্যমে বিমানবন্দরগুলোর নিকটবর্তী বাসিন্দাদের শব্দদূষণের হাত থেকে রক্ষা যেতে পারে।
ইউডি/অনিক

