আবারও বাড়ছে করোনা : টিকাগ্রহণ ও স্বাস্থ্যবিধিতে নজরের বিকল্প নেই

আবারও বাড়ছে করোনা : টিকাগ্রহণ ও স্বাস্থ্যবিধিতে নজরের বিকল্প নেই
উত্তরদক্ষিণ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ।

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:৩৫

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিম্নমুখী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে করোনা প্রায় শেষ পর্যায়ে, বিশ্ব আগের তুলনায় অনেক স্বস্তিতে আছে। কিন্তু বাংলাদেশে সম্প্রতি নতুন করে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি মাসে যে হারে করোনার ঊর্ধ্বগতি হচ্ছে তা এর আগে ঘটে নি। তারা আবারও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস

জ্যামিতিক হারে বাড়ছে রোগির সংখ্যা: গত আস্ট মাস থেকেই নতুন করে করোনা রোগির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গাণিতিক বিশ্লেষণ করে দেখা যায় আগস্ট মাস ও চলতি সেপ্টেম্বর মাসে জ্যামিতিক হারে করোনার ঊর্ধ্বগতি। বিশেষজ্ঞরা এই নতুন ঢেউকে দেশের ষষ্ঠ ঢেউ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। তারা বলছেন টিকা নিতে গাফিলতি এই ঢেউয়ের অন্যতম প্রধান কারন। এছাড়াও দেশে ওমিক্রণের নতুন দুই ধরণের কারনেও করোনার হার বাড়ছে। গত জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া করোনার পঞ্চম ঢেউয়ের সংক্রমণ কমতে থাকে জুলাইয়ের শেষ দিকে এসে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহের পর থেকেই করোনা শনাক্তের হার ৫-এর নিচে নেমে আসে। এবার পঞ্চম ঢেউ শেষ হওয়ার দিকে জনস্বাস্থ্যবিদেরা আশা করেছিলেন, পরের ঢেউ আসতে হয়তো আরও বেশি সময় লাগবে। আর সেটি এলেও খুব দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ব্যাপক টিকাকরণকে এ ক্ষেত্রে একটি বড় সুরক্ষা বলে বিবেচনা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তবে আগস্টের শেষ দিক থেকে করোনা বাড়ছে। আর বাড়ছে দ্রুত হারে। গত বুধবার করোনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। আট সপ্তাহ পর করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৫-এর ঘরে গেল। চলতি বছর মহামারির ৩৩তম সপ্তাহে অর্থাৎ, ১৫ থেকে ২১ আগস্টে করোনা শনাক্ত এর আগের সপ্তাহের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম হয়েছিল। এর পরের সপ্তাহে অর্থাৎ, ২২ থেকে ২৮ আগস্ট করোনা শনাক্তের হার বেড়ে যায় সাড়ে ২২-এ। এর পরের সপ্তাহে ৭ শতাংশের কিছু বেশি বাড়ে শনাক্তের হার। ৫ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর করোনা বাড়ে ৪৭ শতাংশ। আর সর্বশেষ ১২ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর করোনা শনাক্ত বাড়ে ২৮ শতাংশ।

একদিনে শনাক্তের হার ছাড়িয়েছে ১৫ শতাংশ: দেশে করোনা আক্রান্তের হার বাড়ছেই। গত একদিনে শনাক্তের হার বেড়ে ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ সময় করোনা আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত দেশে করোনায় মোট মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ৩৪৭ জনের। এদিন নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৬২০ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ২০ হাজার ৭৬৮ জন। গত একদিনে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯৭ দশমিক ১০ শতাংশ এবং শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার এক দশমিক ৪৫ শতাংশ। শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো করোনা বিষয়ক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ঢাকা সিটিসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও বাড়িতে উপসর্গ বিহীন রোগীসহ গত একদিনে সুস্থ হয়েছেন ৩৪৫ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ১৯ লাখ ৬২ হাজার ১৬৪ জন। সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৮৮১ টি ল্যাবে ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে চার হাজার ৪০টি এবং মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে চার হাজার ৩১টি। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এক কোটি ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬৫টি।

আইসিডিডিআর,বি

‘ওমিক্রনের নতুন ২ উপধরনের কারণে সংক্রমণ ঊর্ধ্বগতি’: এদিকে, আবারও করোনা ভাইরাসের শনাক্তের হার ঊর্ধ্বমুখি হওয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) জানিয়েছে, ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের নতুন দুটি উপধরনের কারণে সংক্রমণ বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী। সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি’র ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষা পর্যবেক্ষণে এ তথ্য জানা গেছে। সংস্থাটি আরও জানায়, করোনা সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ে গত ২৩ জুলাই থেকে গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইসিডিডিআর,বি ৩৮টি জিনোম সিকোয়েন্স করেছে। এতে রাজধানী ঢাকায় ওমিক্রনের দুটি নতুন সাব ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ঢাকায় পরিচালিত জিনোম সিকোয়েন্সে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, শুধু ওমিক্রন ভেরিয়েন্টগুলোর মাধ্যে ২৬টি অমিক্রন ইঅ.৫ এবং ১২টি অমিক্রন ইঅ.২ পাওয়া গেছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, প্রাথমিকভাবে রাজধানীসহ সারাদেশে ওমিক্রনের ইঅ.৫ সাব-ভ্যারিয়েন্ট সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল। তবে গত তিন সপ্তাহে তা ইঅ.৫ থেকে ইঅ.২-তে স্থানান্তরিত হয়েছে, যা একটি বড় পরিবর্তন। একই সময়ে ইঅ.২.৭৫ (হ=৬) এবং ইঔ.১ (হ=১) (যা মূলত ইঅ.২ থেকে উৎপন্ন) নামে নতুন দুটি সাব-ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সারাদেশে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য নতুন এই সাব-ভ্যারিয়েন্টগুলোই দায়ী জানানো হয়েছে আইসিডিডিআর,বির নমুনা পরীক্ষার পর্যবেক্ষণে। এদিকে, ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভসের (আইডিইএসএইচআই) এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, রাজধানীতে ওমিক্রন ইঅ.২.৭৫ এবং ইঔ.১ উভয় উপধরন শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ওমিক্রনের এই নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্টগুলো এ বছরের মে মাসে সর্বপ্রথম ইন্ডিয়ায় শনাক্ত হয়। বর্তমানে ইঅ.২.৭৫ হলো ইন্ডিয়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী সাব-ভ্যারিয়েন্ট। এটিতে মূল অমিক্রন ভেরিয়েন্টের তুলনায় স্পাইক জিনের বেশি মিউটেশন রয়েছে। করোনার নতুন রূপের আবির্ভাব নতুন নয় এবং ভাইরাস প্রাকৃতিক বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য। এ অবস্থায় করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে সবাইকে করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে আইসিডিডিআর,বি।

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি পাঁচ দফা সুপারিশ: বাংলাদেশে সংক্রমণ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়ে গত শনিবার কোভিড-১৯-সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি পাঁচ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে আছে শতভাগ সঠিকভাবে মাস্ক পরা ও হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজার ব্যবহার নিশ্চিত করাসহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের জন্য জনসাধারণকে উৎসাহিত করা। এর পাশাপাশি প্রথম, দ্বিতীয় এবং বুস্টার ডোজের করোনার টিকা যাঁরা গ্রহণ করেননি, তাঁদের টিকা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করারও সুপারিশ করা হয়। বদ্ধস্থানে সভা করা থেকে বিরত থাকা ও দাপ্তরিক সভাগুলো যথাসম্ভব ভার্চ্যুয়ালি করার সুপারিশ করে কমিটি। অপরিহার্য সামাজিক অনুষ্ঠান বা সভাগুলোতে মাস্ক পরার সুপারিশও করা হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব হেলথ সায়েন্সের সাবেক উপাচার্য, চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী গণমাধ্যমকে বলেন, করোনার যে ধরনটি এখন রয়েছে, এটা বিপজ্জনক মনে হচ্ছে না। এটা একটা দুর্বল ধরন, এতে আক্রান্ত হলে সাধারণ ঠাøা জ্বরের মতোই কিছু উপসর্গ দেখা দেবে। সংক্রমণ কম বেশি ওঠানামা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তারপরেও আমাদের সাবধানে থাকা উচিৎ, নিয়মিত এই ভাইরাসকে সার্ভিলেন্সে রাখা দরকার, বিপজ্জনক কোনো মিউটেশনে এটা মোড় নেয় কিনা? তিনি আরও জানান, করোনা একেবারে নির্মূল হবার সম্ভাবনা খুবই কম। এটা কোথাও বাড়বে, আবার কোথাও কমবে। করোনার পরিপূর্ণ বিহেভিয়ার বুঝতে আমাদের আরও সময় লাগবে। তবে এটা পরিষ্কার যে, যদি না আবার কোনো বিপজ্জনক ধরন তৈরি হয়, যার সম্ভাবনা এখনও তেমন একটা দেখা যায়নি, তবে হতেও পারে। যাদের বিভিন্ন কোমরবিডিটি রয়েছে এবং বয়স্ক যারা আছেন, তাদের অবশ্যই সাবধানে থাকতে হবে। সেই সঙ্গে নিয়মিত জিনোম সিকোন্সিং করে সব সময় নজদারি করতে হবে, খারাপ কোনো ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের চিত্র উল্টো: করোনারভাইরাসে নতুন সংক্রমণের সংখ্যা সারাবিশ্বে নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস সম্প্রতি এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, করোনা মহামারি সমাপ্তির পথে রয়েছে। সম্প্রতি করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও বলেছেন, দেশটিতে করোনা আর মহামারি আকারে নেই। বিশ্বজুড়ে ৬০ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির পর এটি একটি স্বস্তির খবর। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গে স্বস্তির খবর প্রকাশ করা হলেও বাংলাদেশের চিত্র উল্টো। দেশে ফের বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই ঊর্ধমুখী রয়েছে ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা।

উত্তরদক্ষিণ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

‘প্যান্ডেমিক’ নয়, করোনা থাকবে ‘এন্ডেমিক’ হয়ে: বিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে এবং তার ফলে এটি দিনে দিনে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এছাড়াও সারা বিশ্বে লোকজনকে টিকা দেওয়ার কারণে শক্তিশালী হয়েছে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। এসব থেকে ধরে নেওয়া যায় যে ইতোমধ্যে কোভিড মহামারি শেষ হতে শুরু করেছে। করোনাভাইরাসের দুর্বল ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন। এটি আগের যেকোনো ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় অনেক বেশি সংক্রামক হলেও, রোগীকে আগের মতো কাবু করতে পারছে না। এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি কিংবা মৃত্যুর হারও অনেক কম। তবে বৃদ্ধ এবং যাদের বড় রকমের শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে, ‘এন্ডেমিক কোভিডে’ তাদের কারো কারো মৃত্যুও হতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট যত বেশি মানুষের মাঝে ছড়াবে ভাইরাসটি দিনে দিনে ততোই দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে বিপরীত সম্ভাবনাও রয়েছে, যখনই কোনো ভাইরাস ব্যাপকহারে সংক্রমণ ঘটায়, তখন ভাইরাসের আরও বেশি মিউটেশনের সম্ভাবনা থাকে। তখন হয়তো ভাইরাসটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আবার নতুন কোনো মিউটেশনের মাধ্যমে শক্তিশালীও হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনাভাইরাস পৃথিবী থেকে একবারে বিদায় নেবে না, থেকে যাবে। কিন্তু সেটা ‘প্যান্ডেমিক’ হিসেবে নয়, থাকবে ‘এন্ডেমিক’ হিসেবে। বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন ঋতুতে করোনা সাধারণ জ্বর, ফ্লু বা সর্দি কাশির মত ফিরে ফিরে আসবে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading