বুধগ্রহের রহস্য উন্মোচনে কঠিন অভিযান

বুধগ্রহের রহস্য উন্মোচনে কঠিন অভিযান

উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৯:১০

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের দৌলতে আমরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গভীরে উঁকি মারতে পারছি৷ কিন্তু পৃথিবীর কাছেই বুধগ্রহ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত৷ ইউরোপ ও জাপানের এক যৌথ অভিযান সেই অভাব দূর করার চেষ্টা চালাচ্ছে৷

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এসা জাপানের মহাকাশ সংস্থা জেএএক্সএ-র সঙ্গে যৌথভাবে ‘বেপি কলম্বো’ প্রকল্পে একশো কোটি ইউরো বিনিয়োগ করেছে৷ কারণ বুধ গ্রহ পৃথিবী থেকে বেশি দূরে না হলেও সূর্যের সবচেয়ে কাছের এই মহাজাগতিক বস্তুটি পরীক্ষা করা বড় এক চ্যালেঞ্জ৷ বুধ গ্রহ সূর্যের আড়ালে থাকায় পৃথিবী থেকে টেলিস্কোপের মাধ্যমে সেটি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন৷ সেই গ্রহের উদ্দেশ্যে যাত্রাপথে সূর্যের তীব্র অভিকর্ষ বড় বাধা বটে৷

জার্মানির ডার্মস্টাট শহরে সব ইউরোপীয় মহাকাশ অভিযানের উপর নজর রাখা হয়৷ ‘বেপি কলম্বো’ যাতে বুধ গ্রহের কক্ষপথে আদৌ পৌঁছতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে ইঞ্জিনিয়ারদের অত্যন্ত জটিল এক যাত্রাপথ স্থির করতে হয়েছে৷ গন্তব্যে পৌঁছতে প্রায় সাত বছর সময় লাগার কথা৷ অভিযানের ফ্লাইট ডায়রেক্টর আন্দ্রেয়া আকোমাজো বলেন, ‘‘ফ্লাইট ম্যানুভার গণনা অত্যন্ত জটিল কাজ৷ কারণ আমরা সূর্যের দিকে যাচ্ছি, যেখান থেকে তীব্র টান আসছে৷ বুধ গ্রহ একেবারেই কাছে ঘুরছে৷ মহাকাশযানটিকে তিন ধরনের কাইনেটিক এনার্জি সামলাতে হচ্ছে৷ উৎক্ষেপণের সময় ‘আরিয়ানে ৫’ রকেটের ধাক্কা, তারপর মহাকাশে পৌঁছে যানের মধ্যে ইলেকট্রিক প্রপালশনের ধাক্কা, সবশেষে ‘প্ল্যানেট-সুইং বাই ম্যানুভার’ শক্তিও যানটিকে গতিশীল করছে৷”

মার্কারি বা বুধ গ্রহে উড়াল মহাকাশ যাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ‘ব্রেকিং দূরত্ব’ হিসেবে বিবচনা করা হয়৷ ‘বেপি কলম্বো’ ইতোমধ্যে দুই বার শুক্রগ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে গেছে৷ প্রতিবার কিছুটা কাইনেটিক এনার্জির ক্ষয় হয়েছে৷ এভাবে যানটি বুধ গ্রহের কক্ষপথের কাছে যেতে পেরেছে৷ ‘বেপি কলম্বো’ দুই বার বুধ গ্রহের ২০০ কিলোমিটার কাছ দিয়ে উড়ে গেছে৷ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যানটি বুধগ্রহের সঙ্গে এমনকি ‘সেলফি’ ছবিও তুলেছে৷

কিন্তু যানের গতি এখনো অত্যন্ত বেশি৷ বুধগ্রহের মাধ্যাকর্ষণের টান কাজে লাগিয়ে যানটিকে সব মিলিয়ে ছয় বার ‘সুইং বাই ম্যানুভার’ কায়দায় নিজস্ব শক্তি কমাতে হবে৷ সাত বছর উড়ালের পর অবশেষে সেটি বুধগ্রহের কক্ষপথে প্রবেশ করবে এবং দুটি পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট হিসেবে দুই ভাগে বিভক্ত হবে৷

তখনই আসল চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে৷ কারণ, পৃথিবীর তুলনায় বুধগ্রহে সূর্যের বিকিরণের তেজ দশ গুণ বেশি৷ তাছাড়া বুধগ্রহে দিনের বেলার তাপমাত্রা ৪৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ছুঁতে পারে৷ অর্থাৎ দুটি স্যাটেলাইটকেই তীব্র উত্তাপ সহ্য করতে হবে৷

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এবং প্রকল্পের প্রধান এলসা মন্টানিয়নের সামনে এর আগে এত বড় চ্যালেঞ্জ আসে নি৷ এলসা বলেন, ‘‘বেপি কলম্বো অভিযানের শুরুতে আমরা এসার তথ্যভাণ্ডারে শুধু এমন উপকরণের খোঁজ পেয়েছিলাম, যা বড়জোর ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সুরক্ষা দিতে পারে৷ আমাদের যানটিকে ৩৫০ ডিগ্রি মাত্রার উত্তাপ সহ্য করতে হবে৷ তাহলে বুঝতেই পারছেন, আমাদের কী পরিমাণ উন্নতি করতে হয়েছে৷”

এমন তীব্র উত্তাপের হাত থেকে সংবেদনশীল যন্ত্রপাতিগুলি নিরাপদ রাখতে ‘বেপি কলম্বো’-র জন্য সেরামিক ফাইবার ও টাইটেনিয়াম দিয়ে তৈরি বিশেষ চাদর ডিজাইন করে, তারপর হাতে করে সেটি বোনা হয়েছে৷ ২০২৫ সালে সেই আচ্ছাদনের কার্যকারিতা যাচাই করা যাবে৷ তখন ইউরোপীয় স্যাটেলাইটটি মূলত বুধগ্রহের উপরিভাগ পর্যবেক্ষণ করবে৷ পৃথিবী ছাড়া সৌরজগতের একমাত্র গ্রহ হিসেবে কেন মার্কারির চৌম্বক ক্ষেত্র আছে, জাপানের অর্বিটার স্যাটেলাইট তা জানার চেষ্টা করবে৷

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading